pytheya.blogspot.com Webutation

৭ মার্চ, ২০১২

Kaba: কা'বা প্রতিমা মুক্ত হল।


মুহম্মদ শান্তভাবে ও শান্তির সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করলেন; কোন গৃহ লুন্ঠিত হল না কোন নারী লাঞ্ছিত হল না। বিজয় অভিযানের ইতিহাসে এ ছিল অনন্য। অতঃপর ইসলামের ধারক ও বাহক, বহু পয়গম্বরের স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন উপাসনালয় কা'বা (kaba) তে এলেন মুহম্মদ। একক উপাস্য আল্লাহর উপাসনার জন্যে প্রতিষ্ঠিত এই গৃহ এখন বহ উপাস্যওয়ালাদের দেবতাসমূহের আখড়া। কুরাইশ পৌত্তলিকদের ৩৬০টি (চান্দ্র বৎসরের ৩৬০ দিনের প্রত্যেক দিনের উপাসনার জন্যে একটি) জাতীয় দেবমূর্ত্তি স্থাপিত রয়েছে কা‘বার অভ্যন্তরে- চারিপাশে। 

এসব দেবমূর্ত্তি বহ মানুষকে বিপথগামী করেছে। সুতরাং আর কালক্ষেপন নয়, মুহম্মদের নির্দেশে তৎক্ষণাৎ নির্দয়ভাবে ধূলিসাৎ করা হল মুর্ত্তিগুলো। যিশু কোলে মেরীর একটি চিত্র কা’বার একটা দেয়ালে বিদ্যমান ছিল, এই চিত্রখানির ব্যাপারে মুহম্মদের সিদ্ধান্ত জানতে চওয়া হল। একজন প্রস্তাব করলেন খুঁদে ছবিটা বিনষ্ট করে দিতে। মহান এই নারীর ছবিটি আঘাতে বিনষ্ট করে দেবার প্রস্তাবে তিনি ইতস্তত: বোধ করলেন। অত:পর তার নির্দেশে ছবিটি জাফরানী পানি দিয়ে ঢেকে দেয়া হল। 

ভয়ে-বিস্ময়ে, ক্ষোভে-অভিমানে এবং অপমানে-অনুতাপে একেবারে অভিভূত হয়ে নিতান্ত দুঃখের সঙ্গে পৌত্তলিকরা চারিদিকে দাঁড়িয়ে তাদের উপাস্য দেবতাদের অধঃপতন নিরীক্ষণ করছিল। তাদের কাছে সত্য প্রতিভাত হল, তারা অভ্যস্ত কন্ঠের সেই পুরাতন ধ্বনি শুনতে পেল, যা তারা একদিন ব্যঙ্গ করত, যখন মুহম্মদের নির্দেশে ওমর মূর্ত্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলছিলেন- ‘সত্য সমাগত, মিথ্যে অপসৃত, মিথ্যের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী; (১৭:৮১) তাদের দেবদেবী কতই না শক্তিহীন!’

এভাবে আল্লাহ ইব্রাহিমের নিকট যে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন তা এখন পূর্ণ হল-"Behold, in your seed I will bless all the tribes of the earth; and as you have broken in pieces the idols, O Abraham;, even so shall your seed do."-(Gospel of Barnabas, CH-43)
এসময় বেলাল যাকে মুহম্মদ মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছিলেন, তাকে দেখে মক্কার একজন কুরাইশ বলল, ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ যে, আমার পিতা পূর্বেই মারা গিয়েছেন। তাকে এ কূ-দিন দেখতে হয়নি।’
উপস্থিত হারেস ইবনে হেশাম বলল, ‘মুহম্মদ মসজিদে হারামে আযান দেবার জন্যে এক কাল কাক ব্যতিত অন্য কোন মানুষ খুঁজে পেল না?’
আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমি কিছুই বলব না; কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি কিছু বললেই আকাশের মালিক তার কাছে তা পৌঁছিয়ে দেবেন।’

আবু সুফিয়ানকে হিশামের সাথে কথাবার্তা বলতে দেখে মুহম্মদ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি বলাবলি করছেন?’
তারা নিরুত্তর রইলেন।
এসময় এই আয়াত নাযিল হল- নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।(৪৯:১৩)

এসব প্রাচীন মূর্ত্তি ধ্বংস শেষে ও পৌত্তলিক বিধি দূরীভূত করে মুহম্মদ সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দিলেন। পূর্ব হতেই মুহম্মদ কি বলেন বা করেন তা শোনার বা দেখার জন্যে কুরাইশদের ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্যের অবধি ছিল না। সুতরাং তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।
 
মুহম্মদ দন্ডায়মান হয়ে সমবেত লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন-

-‘আল্লাহর শোকর যিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, যিনি নিজের দাসকে সাহায্য করেছেন এবং একাকী যিনি সংঘসমূহকে পরাভূত করেছেন। 
--হে কুরাইশ জাতি! মূর্খতা যুগের অহমিকা এবং কৌলিণ্যের গর্ব আল্লাহ তোমাদের কাছ  থেকে দূর করে দিয়েছেন।
--অন্ধকার যুগের সমস্ত অহঙ্কার-তা অর্থগত হোক আর শোণিতগত হোক-সমস্তই আমার এই যুগল পদতলে দলিত, মথিত ও চিরকালের তরে রহিত হয়ে গেল।
--অতঃপর যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছেপূর্বক হত্যা করে, তাহলে এটা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং সেজন্যে তাকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা হবে।’ 

মুহম্মদ কোরআনের এই আয়াত আবৃতি করলেন- ‘হে মানব! আমি তোমাদের সকলকেই (একই উপকরণে) স্ত্রী-পুরুষ হতে সমুৎপন্ন করেছি-এবং তোমাদেরকে একমাত্র এ জন্যে বিভিন্ন শাখা ও বিভিন্ন গোত্রে (বিভক্ত) করেছি যে, এ দ্বারা তোমরা পরষ্পরের কাছে পরিচিত হতে পারবে (অহঙ্কার ও অত্যাচার করার জন্যে নয়)। নিশ্চয় জানিও যে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক সংযমশীল (পরহেজগার), আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মহৎ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী।’(৪৯:১৩)

অতঃপর মুহম্মদ সমবেত কুরাইশদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে কুরাইশগণ, আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করব বলে তোমরা মনে কর?’ 
তারা উত্তর দিল, ‘হে দয়ালু ভ্রাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র, আমরা তোমার কাছ থেকে করুণা ও সহানুভূতি চাই।’ -এ কথা শুনে তার নয়নযুগল দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামল এবং তিনি বললেন, ‘ইউসূফ তার ভ্রাতাদের যেরূপ বলেছিলেন আমিও তোমাদের তেমনিভাবে বলব, ‘আমি আজ তোমাদের তিরস্কার করব না; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু ও সহানুভূতিশীল।’
মুহম্মদের অভয় ঘোষণার পরও যারা খালিদের সৈন্যদলকে আক্রমণ করে দু‘জনকে হত্যা করেছিল, তাদেরই একদল মুহম্মদকে অতর্কিতভাবে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। এদেরই একজন ছিল ফোজালা, ফোজালা ইবনে ওমের।

মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিবসে মুহম্মদ যখন নিবিষ্ট মনে কা’বা তাওয়াফ করছেন, এসময় ফোজালা অতি সন্তর্পণে হত্যার উদ্দেশ্যে তার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। হঠাৎ মুহম্মদের দৃষ্টি তার উপর পতিত হল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কে? ফোজালা না-কি?
সে বলল, ‘জ্বি- হ্যাঁ, আমি।’
তিনি বললেন, ‘কি মতলব আঁটছ?’
সে বলল, ‘জ্বি, কিছু না। এই আল্লাহ, আল্লাহ করছি।’
তিনি হাস্য সহকারে বললেন, ‘বেশ কথা ফোজালা! সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।’

অতঃপর মদ ও বেশ্যা নারীতে আসক্ত ফোজালা যখন জীবন সাগরে স্নাত হয়ে পবিত্র দেহে ও শুদ্ধ-বুদ্ধ হৃদয়ে গৃহপানে ফিরে চলেছে, সেইসময় তার বড় আদরের ও বড় গৌরবের রক্ষিতা তার গৃহ থেকে গমনরত ফোজালার ভাবান্তর দর্শণে বিচলিত হয়ে চিৎকার করে বলল, ‘প্রাণেশ্বর! একবার এদিকে এস, দু‘টো কথা শুনে যাও।’
ফোজালা লজ্জায় ও ঘৃণায় অধোবদনে তাকে বলল, ‘আল্লাহ ও ইসলাম আমাকে তোমা হতে বারিত করেছে।’

সে অতঃপর দ্রুতপদে সেখান থেকে চলে যেতে যেতে মনে মনে বলতে লাগল, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের সকলের প্রাণেশ্বর, তাঁকেই প্রেম কর, শান্তিলাভ করতে পারবে।’

মক্কা বিজয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হল। দলে দলে সবাই মুহম্মদের ধর্ম গ্রহণ করতে লাগল। এভাবে কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী পরিপূর্ণতা লাভ করল। ‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। আর তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর ধর্ম গ্রহণ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসায় তার পবিত্র মহিমা ঘোষণা কর ও তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি তওবা মঞ্জুরকারী।’(৩৫:১-৩)- এখন মুহম্মদ দেখলেন যে তিনি যে মহান পরিকল্পণা কার্যকরী করার জন্যে প্রেরিত হয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন লাভ করেছে। 

সমাপ্ত।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন