pytheya.blogspot.com Webutation

৯ মার্চ, ২০১২

Kaba: ভিত্তিস্থাপন ও হজ্জ্বের আদেশ।

ইব্রাহিম পুনঃরায় মক্কাতে এলেন। একদা যেখানে ধূ-ধূ মরুভূমি ছিল সেখানে এখন এক ক্ষুদ্র জনপদ গড়ে উঠেছে। আল্লাহকে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! এ শহরকে নিরাপদ কর এবং আমাকে ও আমার পুত্রদের প্রতিমাপূজা থেকে দূরে রাখ। হে আমার প্রতিপালক! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সেই আমার দলভূক্ত হবে; কিন্তু আমার অবাধ্য হলে তুমি নিশ্চয়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।-(১২:৩৫-৩৬) প্রশংসা আল্লাহরই প্রাপ্য, যে আমাকে আমার বৃদ্ধবয়সে ইসমাইল ও ইসহাককে দান করেছে। নিশ্চয় আমার প্রতিপালক প্রার্থনা শুনে থাকেন।’-(১২:৩৯)
এসময় আল্লাহ তাকে তাদের উপাসনার জন্যে একটা উপাসনালয়ের ভিত্তি স্থাপন করতে বললেন। 

ইব্রাহিম যখন পল্লীর কাছাকাছি হলেন, তখন দূর থেকে তিনি দেখতে পেলেন ইসমাইল জমজম কূপের ধারে এক গাছের নীচে বসে তীরের শলাকার অগ্রভাগ ধারাল করছে। ইব্রাহিম আরও নিকটবর্তী হলে পিতাপুত্রের সাক্ষাৎ হল। কূশলাদি বিনিময়ের পর একসময় ইব্রাহিম বললেন, ‘হে আমার পুত্র, আল্লাহ আমাকে এক আদেশ দান করেছেন।’
ইসমাইল বললেন, ‘আল্লাহ আপনাকে যা করতে বলেছেন তা অবশ্যই করবেন।’
ইব্রাহিম- ‘তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?’
ইসমাইল-‘অবশ্যই, আর আমি তাতে নিজেকে ধন্য মনে করব। কিন্তু কাজটা কি?’
ইব্রাহিম-‘তিনি আমাকে এই স্থানে তার জন্যে এক গৃহ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন।’

আল্লাহ উপাসনাগৃহের (বায়তুল্লাহর) স্থান নির্দিষ্ট করে দিলেন। তিনি জানালেন, ‘তুমি তোমার দাঁড়ানোর জায়গাকেই (স্ত্রী-পুত্রকে নির্বাসনে দিতে এসে যেস্থানে তিনি দাঁড়িয়ে শেষবারের মত হাজেরার সাথে কথোপকথন করেছিলেন) নামাযের জায়গারূপে গ্রহণ কর।’

একই সাথে তিনি তাদেরকে আদেশ করলেন, ‘আমার সাথে কাউকে শরীক কোরও না এবং আমার গৃহকে পবিত্র রাখ তাওয়াফকারীদের জন্যে, নামাজে দন্ডায়মান কারীদের জন্যে এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্যে এবং মানুষের মাধ্যে হজ্জ্বের জন্যে ঘোষনা প্রচার কর। তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটের পিঠে সওয়ার হয়ে দূর-দুরান্ত থেকে। যাতে তারা তাদের কল্যানের স্থান পর্যন্ত পৌঁছে এবং নির্দিষ্ট দিনগুলোতে (যিলহজ্জ্ব মাসের ১০,১১ ও ১২ তারিখ) আল্লাহর নাম স্মরণ করে তাঁর দেয়া চতুষ্পদ জন্তু জবেহ করার সময়। অতঃপর তোমরা তা থেকে আহার কর এবং দুস্থ ও অভাবগ্রস্থকে আহার করাও। এরপর তারা যেন দৈহিক ময়লা দূর করে দেয়, তাদের মানত পূর্ণ করে এবং এ সুসংরক্ষিত গৃহের তাওয়াফ করে। এটা শ্রবণযোগ্য। আর কেউ আল্লাহর সম্মান যোগ্য বিধানাবলীর প্রতি সম্মান প্রদর্শণ করলে পালনকর্তার কাছে তা তার জন্যে উত্তম। উল্লেখিত ব্যাতিক্রমগুলো ছাড়া তোমাদের জন্যে চতুষ্পদ জন্তু হালাল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা মূর্ত্তিদের অপবিত্রতা থেকে বেঁচে থাক এবং মিথ্যে কথন থেকে দূরে সরে থাক।’-(২২:২৬-৩০)

আল্লাহর আদেশ অনুসারে পিতাপুত্র নির্দিষ্ট স্থানে উপাসনালয়ের ভিত্তি স্থাপন করা শুরু করলেন। এই স্থানেই আদমের অনুরোধে ফেরেস্তাগণ প্রথম উপাসনালয় কা’বা (Kaba) নির্মাণ করে দিয়েছিলেন যার ভিত্তি তখনও বালুর নীচে বিদ্যমান ছিল। ফলে স্থানটি আশেপাশের ভূমি থেকে কিছুটা উঁচু ছিল।

কা’বা গৃহ।
উপাসনালয়ের ভিত্তি স্থাপন করার কাজের শুরুতে পিতাপুত্র আল্লাহর কাছে এই প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের এ কাজ গ্রহণ কর। তুমি তো সব শোন আর সব জান। 


হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের দু‘জনকে তোমার একান্ত অনুগত কর ও আমাদের বংশধর হতে তোমার অনুগত এক উম্মত (সমাজ) তৈরী কর। আমাদেরকে উপাসনার নিয়ম পদ্ধতি দেখিয়ে দাও, আর আমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হও! তুমি তো অত্যন্ত ক্ষমাপরবশ পরম দয়ালু। 

--হে আমার প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের কাছে এক রসূল প্রেরণ কোরও যে তোমার আয়াত তাদের কাছে আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, তত্ত্বজ্ঞানী।-(২:১২৫-১২৭)

ইব্রাহিম ও ইসমাইলের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর একসময় উপাসনালয় কা’বা তৈরী হল। এই কা’বা গৃহের দ্বার ছিল দু‘টি-একটি প্রবেশের জন্যে অপরটি পশ্চাৎমুখী হয়ে বের হবার জন্যে। পরবর্তীতে কুরাইশগণ কর্তৃক কা’বা পুনঃনির্মিত হওয়ার সময় তারা পূর্বদিকে একটি মাত্র দ্বার রাখে-যা তারা সমতল ভূমি থেকে অনেক উঁচুতে নির্মাণ করেছিল; সম্ভবতঃ এ কারণে যে, যাতে অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতিত কেউ যেন ভিতরে প্রবেশ করতে না পারে। বর্তমান কা’বাতেও এই একটি দ্বারই বিদ্যমান রয়েছে। 

কা’বাগৃহ নির্মিত হল। ইতিপূর্বে আল্লাহ কাবাগৃহের স্থান সনাক্ত করে দেবার সময় ইব্রাহিমকে নির্দেশ দিয়েছিলেন মানুষের মধ্যে হজ্জ্বের ঘোষণা প্রচার করার জন্যে। সুতরাং তিনি আল্লাহর ঐ আদেশ পালন করার জন্যে তৎপর হলেন। কিন্তু তিনি যখন ঘোষণা প্রচার করবেন, সেইসময় তার মনে হল এই জনমানবহীন প্রান্তরে তার এই ঘোষণা মানুষের কানে পৌঁছুবে না। তাই তিনি এ ব্যপারটা আল্লাহর কাছে তুলে ধরলেন। তিনি বিনীতভাবে আরজ করলেন, ‘হে আল্লাহ! এটা তো জনমানবহীন বন্যপ্রান্তর ঘোষণা শোনার মত কেউই নেই। দূরে যেখানে জনবসতি আছে সেখানে আমার আওয়াজ কিভাবে পৌঁছিবে?’
তিনি বললেন, ‘তোমার দায়িত্ব শুধু ঘোষণা করা, বিশ্বে পৌঁছানোর দায়িত্ব আমার।’
অতঃপর আল্লাহর নির্দেশ মত ইব্রাহিম ‘মকামে ইব্রাহিম’-এ দাঁড়িয়ে দু‘কর্ণে অঙ্গুলি রেখে দক্ষিণে-উত্তরে এবং পূর্ব-পশ্চিমে মুখ করে বললেন, ‘হে মানবজাতি! তোমাদের পালনকর্তা নিজের গৃহ নির্মাণ করেছেন এবং তোমাদের উপর এই গৃহের হজ্জ্ব ফরজ করেছেন। তোমরা সকলে তাঁর আদেশ পালন কর।’

মকামে ইব্রাহিম
-একটি প্রস্তরখন্ডের উপর দাঁড়িয়ে ইব্রাহিম কা’বাগৃহের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করেছিলেন। এই প্রস্তরটিই ‘মকামে ইব্রাহিম’ নামে খ্যাত। প্রস্তরখন্ডটি ইব্রাহিমের পদচিহ্ন গ্রহণ করেছিল এবং তাতে এই গভীর পদচিহ্ন অদ্যাবধি বিদ্যমান। প্রথমদিকে এটি কা’বাগৃহের দ্বার সংলগ্ন স্থানে ছিল। বর্তমানে এটিকে ঐস্থান থেকে সরিয়ে একটি কাঁচপাত্রে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। 

ইব্রাহিমের এই আওয়াজ আল্লাহ বিশ্বের কোনে কোনে পৌঁছে দেন। শুধু তাই নয় তিনি তা কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী মানুষের কান পর্যন্ত পৌঁছে দেন। যার যার ভাগ্যে আল্লাহ হজ্জ্ব লিখে দিয়েছেন তাদের প্রত্যেকেই এই আওয়াজের জবাবে বলেছে, ‘লাব্বায়েক, আল্লাহুমা লাব্বায়েক।’
অর্থাৎ ইব্রাহিমী আওয়াজের জবাবই হচ্ছে হজ্জ্বে ‘লাব্বায়েক’ বলার আসল ভিত্তি। 

আল্লাহ ইব্রাহিম ও ইসমাইলকে আদেশ করলেন, 'তোমরা আমার গৃহকে পবিত্র রাখবে তাদের জন্যে যারা এ প্রদক্ষিণ করবে, এখানে বসে এতেকাফ করবে এবং এখানে রুকু ও সিজদা করবে।..’
ইব্রাহিম বললেন, ‘এর অধিবাসীদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করবে তাদেরকে খাবার জন্যে দাও ফলাহার।’  
তিনি বললেন, ‘যে-কেউ অবিশ্বাস করবে তাকেও কিছুকালের জন্যে জীবন উপভোগ করতে দেব। তারপর তাকে দোজখের শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য করব, আর সেকি খারাপ পরিণতি।’-(২:১২৮-১২৯)

মকামে ইব্রাহিম
দোযখের শাস্তির কথা শুনে ইব্রাহিম তার পিতামাতা ও বংশধরদের কথা ভেবে ভীত হয়ে পড়লেন। তিনি তখন একান্তভাবে আল্লাহর কাছে মিনতি জানালেন, হে আমার প্রতিপালক, আমি আমার বংশধরদের কতককে তোমার পবিত্র গৃহের কাছে এক অনুর্বর উপত্যকায় বসবাস করালাম। 


--হে আমাদের প্রতিপালক! যেন ওরা নামাজ কায়েম করে। এখন তুমি কিছু লোকের মন ওদের অনুরাগী করে দাও।-(১২:৩৭) 
হে আমার প্রতিপালক! যেদিন হিসেব হবে সেদিন আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে ও বিশ্বাসীদেরকে ক্ষমা কোরও।’-(১২:৪১)

(নবী ও মুমিনের উচিৎ নয় মুশরেকদের মাগফেরাত কামনা করে, যদিও তারা আত্মীয় হোক-একথা সুস্পষ্ট হওয়ার পর যে তারা জাহান্নামী। আর ইব্রাহিম কর্তৃক স্বীয় পিতার মাগফেরাত কামনা ছিল কেবল সেই প্রতিশ্রুতির কারণে, যা তিনি তার সাথে করেছিলেন। অতঃপর যখন তার কাছে একথা প্রকাশ পেল যে, সে আল্লাহর শত্রু, তখন তার সাথে সম্পর্ক ছিন্নকরে নিল। নিঃসন্দেহে ইব্রাহিম ছিল বড় কোমল হৃদয়, সহনশীল।-(৯:১১৩-১১৪))  

কা’বা এবং ‘মকামে ইব্রাহিম’ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ-নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম গৃহ যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ গৃহ, যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্যে হেদায়েত ও বরকতময়। এতে রয়েছে ‘মকামে ইব্রাহিমএর মত প্রকৃষ্ট নিদর্শণ। আর যে লোক এর ভিতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এ গৃহের হজ্জ্ব করা হল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।-(৩:৯৬-৯৭)  

সমাপ্ত।

ছবি: khudi, volker-doormann.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন