pytheya.blogspot.com Webutation

২৯ মার্চ, ২০১২

Rome: রোমক সভ্যতার উৎপত্তি ও বিকাশ।

রোম (Rome) নগরী, কিম্বদন্তী অনুযায়ী এটি ৭৫৩ খ্রীঃপূঃ ইটালীর তিবর (টাইবার) নদীর তীরস্থ বাম পার্শ্ববর্তী টিলাগুলোর উপরে, মোহনা থেকে ২৫ কিমি দূরে সৃষ্টি হয়েছিল এবং পরবর্তীতে এটির সাম্রাজ্য ভূ-মধ্য সাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়ে উত্তর দিকে ইউরোপ পর্যন্ত দূর-প্রাচ্যে বিস্তারলাভ করেছিল। আর শতাব্দীর পর শতাব্দী এটি সভ্য জগতের উপর প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

নেকড়ে মাতার দুধপানরত রোমলুস ও রেমুস।
কিম্বদন্তী রয়েছে, ল্যাটিন ভাষাভাষী রাজ্যের কোন একটির রাজা নিজের এক আত্মীয়ার দু‘ই শিশু পুত্র সন্তান রোমলুস ও রেমুসকে তিবর নদী গর্ভে বিসর্জন দেবার হুকুম জারী করেন। কেননা, তার ভয় ছিল এরা বড় হয়ে তার সিংহাসন কেড়ে নেবে। বিসর্জন দেবার পরে তিবর নদীতে বন্যা আসায় যে ঝুড়িতে করে শিশু দু‘টিকে পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়, তা বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে এক গাছের ডালে আঁটকে যায়। এভাবে শিশু দু‘টির প্রাণ বাঁচে। তারপর তারা একটি নেকড়ে বাঘের হাতে পড়ে এবং নেকড়ে মায়ের দুধ খেয়েই তারা বড় হচ্ছিল। পরে এক রাখাল তাদের দেখতে পেয়ে স্বগৃহে নিয়ে এসে দু‘ভাইকে মানুষ করতে থাকে। ভ্রাতৃদ্বয় যথারীতি (গল্প কাহিনীতে যেমন হয়) অমিত বিক্রম যোদ্ধারূপে বড় হয়ে ওঠে। তারপর ঐ রাজার বিরুদ্ধে তারা বিদ্রোহ পরিচালনা করে রাজাকে হত্যা করে। অত:পর তারা উভয়ে নগর পত্তন করতে চায়, কিন্তু কোথায় নগর গড়া হবে এবং কে তার পরিচালনার ভার নেবে তাই নিয়ে দু‘ভাইয়ের মধ্যে বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদে রোমলুস রেমুসকে হত্যা করে।

প্রাচীন রোম নগরী।
যে স্থানে রাখাল দু‘শিশু পুত্রকে খুঁজে পেয়েছিল তার নিকটে পত্তন হয় রোম নগরী, ল্যাটিন ভাষায় যাকে বলা হয় রোমা। যতদূর জানা যায়, খ্রী:পূ: ৭৫৩ অব্দে রোম নগরীর পত্তন হয়েছিল এবং এদিন থেকেই রোমকগণ বৎসর গণনা শুরু করেছিল। রোমের ক্যাপিটালিজম টিলার উপরে নেকড়ে জননীর মূর্ত্তি তৈরী করে রাখা হয়েছিল, এখন সেটি জাদুঘরে সংরক্ষিত হচ্ছে।

যা হোক, রোম নগরী মোট সাতটি টিলার উপরে ছড়িয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। এ নগরীর অবস্থান নানান দিক থেকে সুবিধাজনক ছিল। নগরের চতুষ্পার্শ্বে ছিল উর্বর শস্যক্ষেত; তিবর নদীর মোহনায় ছিল বন্দর; সেখান থেকে রোমের ভিতর দিয়ে রাস্তা চলে গিয়েছিল ইতালীর গভীরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে। সওদাগর ও কারিগরেরা এসে ধীরে ধীরে বসত করতে শুরু করল রোমে। 

খ্রী:পূ: ৬ষ্ঠ শতকের শেষভাগে এক নিষ্ঠুর রাজা শাসন করত রোম। একসময় রোমবাসী তাকে দেশ থেকে বিতাড়িত করে। এরপরে প্রতি বৎসর অনুষ্ঠিত একটি জনসভায় পাত্রিৎসিউ তথা পিতৃবংশীয়দের মধ্য থেকে দু‘জন শাসক- এদের বলা হত কন্সুল- নির্বাচন করা হত। এক বৎসরের জন্যে এই কন্সুলদ্বয় রোমের শাসনভার পরিচালনা করতেন। বিচার কার্য চালানোর ভারও ছিল তাদের উপরে এবং যুদ্ধবিগ্রহের সময় তারা সেনাপতি হতেন। অন্যান্য পদস্থ ব্যাক্তিরা অবশ্য এসব কাজে তাদেরকে সাহায্য করত, এই লোকজনও আবার প্রতি বৎসর অনুরূপ এক জনসভায় পাত্রিৎসিউদের মধ্য থেকেই নির্বাচিত হত এক বৎসর মেয়াদী কাজ করার জন্যে। এই এক বৎসর সর্বাপেক্ষা উচ্চ পদস্থ ব্যক্তি রূপে গণ্য হতেন সিনেটের সভ্যগণ যাদের তারা ডাকত সিনেটর বলে।

রোমের ৭টি টিলা।

সিনেটের ক্ষমতা ছিল অসীম। যুদ্ধবিগ্রহ যখন নেই অর্থাৎ শান্তির সময়ে সমস্ত প্রকার কাজকর্ম কন্সুলেরা সিনেটের পরামর্শ নিতে বাধ্য থাকত। কোষাগার, যুদ্ধ ও দেশের শান্তি রক্ষা ইত্যাদি সমস্ত দায়িত্ব সিনেটই বহন করত। কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হলে জনসভা আহবান করে তা জনগণকে জানিয়ে দেয়া হত এবং জনগণ তা মান্য করত।

উত্তর ইতালীতে বসবাসকারী গল উপজাতি খ্রী:পূ: ৪র্থ শতাব্দীর প্রারম্ভে রোম আক্রমণ করল। লম্বা, ঝাঁকড়া চুলো এবং প্রকান্ড তরবারী এবং বিরাটাকার ঢাল দ্বারা সুসজ্জ্বিত বিশাল দেহের অধিকারী গলরা দেখতে ছিল ভয়াল দর্শণ। তাদের প্রচন্ড আক্রমণে রোমক সেনাবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। রোম দখল করে তারা নগর লুন্ঠন করে এবং আগুন দিয়ে পুড়িয়ে নগর ধ্বংস করে দেয়।

রোমবাসীদের কিছূ দূর্গে আশ্রয় নিয়েছিল। তখন গলরা দূর্গ অবরোধ করল। এই অবরোধের একপর্যায়ে তারা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দূর্গে প্রবেশ করতে চাইল। কিন্তু যখন প্রবেশে ব্যর্থ হল, তখন তারা শর্ত দিল, যদি ৩০০ কিলোগ্রামের বেশী স্বর্ণ মুক্তিপণ হিসেবে দেয়া হয়, তবে তারা নগর ছেড়ে চলে যাবে। যখন সোনা ওজন করা হচ্ছে, সে সময় গলদের নেতা পশুরি সমেত পাল্লার উপরে নিজের ভারী তরবারীটি চাপিয়ে দেয়। রোমবাসীরা এর প্রতিবাদ করে উঠলে সে উত্তর দিয়েছিল: ‘পরাজিতদের কপালে দুঃখই থাকে।’

গলদের রোম আক্রমণ।

খ্রী:পূ: ৩য় শতকে রোম প্রজাতন্ত্র অত্যন্ত শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও যুদ্ধ বিদ্যায় পারদর্শী সেনাবাহিনী গঠন করল। এই সেনাবাহিনী মূলত: কৃষকদের নিয়েই গঠিত হয়েছিল, কেননা সামরিক বাহিনীতে কেবল সেইসব লোকজনদেরই নেয়া হত, যাদের নিজেদের চাষের জমি আছে।

রোমক সেনাবাহিনীতে নিয়মানুবর্তিতা ছিল অত্যন্ত কড়া। অস্ত্র হারিয়ে ফেললে, কিম্বা প্রহরারত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়লে তার শাস্তি ছিল মৃত্যূদন্ড। তাছাড়া উচ্চপদস্থ ব্যক্তির হুকুম তার অধীনস্থ সৈনিককে বিনা প্রশ্নে পালন করতে হত।

যুদ্ধের সময় সৈন্যদলের প্রথম সারিতে থাকত হালকা অস্ত্রে সজ্জ্বিত যোদ্ধারা। সম্মুখবর্ত্তী শত্রুবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করার জন্যে তারা ধনুর্বাণ, পাথর এবং ছোট ছোট আকারের বল্লম ছুঁড়ে মারত। তারপরেই তারা পিছনে হটে গিয়ে সামনে যাবার জন্যে জায়গা করে দিত ভারী অস্ত্রে সজ্জ্বিত পদাতিকদের। বিপক্ষীয়দের উপর বল্লম নিক্ষেপ করে এই পদাতিকেরা উন্মুক্ত তরবারী হাতে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ত। অশ্বারোহী দল পদাতিকদের রক্ষা করত উভয় পার্শ্বে- ডান ও বাম দিকে। যুদ্ধে জয়ী হলে এরা পরাজিত শত্রুদের পিছন পিছন তাড়া করে ছুটে যেত।

পিরুসের ইটালী অভিযানের রুট ম্যাপ।
খ্রী:পূ: ৩য় শতকের প্রথমার্ধে ইটালীর দক্ষিণে অবস্থিত গ্রীক শহরগুলো রোম দখল করে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র অ্যাপেনাইন উপদ্বীপ দখল করে। অ্যাপেনাইন উপদ্বীপে কমপক্ষে ১২টি জাতি বাস করত এবং তাদের নিজেদের মধ্যে প্রায়ই শত্রুতা লেগে ছিল। তাদের সাথে রোমের সংগ্রাম চলেছিল ২০০ বৎসরেরও বেশী সময় ধরে। রোমের সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধবিদ্যার জ্ঞান ও নিয়ম শৃঙ্খলার দিক থেকে শত্রু অপেক্ষা উন্নততর ছিল; প্রতিবেশী উপজাতিগুলোর বাহিনী সুশৃঙ্খলাবদ্ধ না হওয়ায় রোমের যুদ্ধাভিযান তারা প্রতিহত করতে পারেনি।

বিজিত অঞ্চলে রোম উপনিবেশ গড়ে তোলে। পরবর্তীতে এই উপনিবেশগুলো তাদের আধিপত্যের খুঁটি হিসেবে কাজ করতে থাকে। তাছাড়া সিনেট ‘Divide and Rule’ -এই নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে বিজিত জাতিগুলোর মধ্যে ঝগড়া বিবাদ জিইয়ে রাখত, যাতে করে তারা সম্মিলিতভাবে রোমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে না পারে।  

পিরুস তার সেনাবাহিনী নিয়ে ইটালীতে।
রোম যখন ইটালীর দক্ষিণে গ্রীক শহরগুলোর সাথে সংগ্রামে লিপ্ত ছিল, তখন বলকান উপদ্বীপের ছোট একটি রাজ্যের রাজা পিরুস গ্রীকদের সাহায্য করার জন্যে সেখানে উপস্থিত হন। পিরুসের সৈন্যবাহিনীতে ২২ হাজার পদাতিক, ৩ হাজার অশ্বারোহী এবং ২০টি হাতি ছিল। যুদ্ধে হস্তীযুথ রোম সেনাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং পায়ের তলায় পিষে তাদের বহু সৈন্য হত্যা করে ফেলে। আর হাতির পিঠে চড়ে তাদের সৈন্যরা রোমকদের উপর শর ও বল্লম নিক্ষেপ করে মহাত্রাস সৃষ্টি করে। রোমক বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়।

পিরুসের বাহিনী পরপর কয়েকটি যুদ্ধে জয়ী হয় ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধে যে বিপুল পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তাতে পিরুস আর্ত্তনাদ করে উঠেছিল: ‘আর একটি মাত্র যুদ্ধের পরই দেখছি আমার আর কোন বাহিনীই থাকবে না!’ -তার এই আক্ষেপ থেকেই ‘Pyrrhic Victory’ -এই প্রবচনটি এসেছে, যার অন্তর্নিহিত অর্থ হল: বিপুল ক্ষতির বিনিময়ে অর্জিত জয়, যখন জয়ের আনন্দ বা অর্থ থাকে না।

পরপর কয়েকটি যুদ্ধে পরাজয়ের পরও রোমকরা দুর্বল হয়নি, তারা  নতুন করে আরও সৈন্য সমাবেশ করেছিল। এই কারণে লোকে রোমের সাথে তুলনা করত হিদ্রার- যার একটি মাথা কেটে নিলে সেইস্থানে দু‘টো করে মাথা গজিয়ে উঠত। সর্বশেষ যুদ্ধে রোমকরা হাতির পায়ের নীচে বড় বড় পেরেক পোতা তক্তা ফেলে এবং জলন্ত ফেঁসো বাঁধা তীর দিয়ে হাতিগুলোকে এমন তাড়া করেছিল যে, ভয় পেয়ে ঐ দৈত্যাকার জন্তুগুলো নিজের সৈন্যদের পদতলে পিষ্ট করে দৌঁড়ে পালায়। এভাবে পিরুসের বাহিনী তছনছ হয়ে গেল। এই যুদ্ধের পর কিছু গ্রীক শহর বিনা যুদ্ধে রোমক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। অন্যগুলো রোমানরা প্রচন্ড আক্রমণে দখল করে নেয়।

কার্থেজ নগরী।
আফ্রিকা মহাদেশের উত্তরাংশে সমুদ্রোপকূলে ফিনিসীয়রা কার্থেজ (Carthage) নগরীর পত্তন করেছিল। সমুদ্রের মধ্যে অনেকদূর পর্যন্ত প্রসারিত প্রস্তরময় অন্তরীপে এই নগরী অবস্থিত ছিল। উঁচু উঁচু মিনার সমেত পাথরের তৈরী দুর্ভেদ্য দূর্গপ্রাকার শহরটিকে বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করত।

সমুদ্রপথে বাণিজ্যের জন্যে কার্থেজের খ্যাতি ছিল। গভীর সমুদ্রের উপর নির্মিত তার বন্দরে সর্বদা জাহাজের ভীড় লেগে থাকত, আর সমুদ্রতীরের দোকান পসারীতে জিনিসপত্রের প্রাচুর্য ছিল দেখবার মত। জাহাজের মাঝিমাল্লা এবং বন্দরের খালাসীরা ছিল দাস। অত্যন্ত শক্তিশালী নৌবাহিনী ও বিশাল সৈন্যদল ছিল কার্থেজের। সৈন্যরা প্রধানত: ছিল ভাড়াটে যোদ্ধা। কার্থেজবাসীরা সমুদ্রোপকূলবর্তী বহু এলাকা ও দ্বীপ নিজেদের অধিকারে এনেছিল। সমগ্র পশ্চিম ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চলে প্রভূত্ব স্থাপনের চেষ্টা করেছিল তারা।

খ্রী:পূ: ২৬৮ অব্দে রোম সিসিলি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করলে কার্থেজ ও রোমের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। এই যুদ্ধকে বলা হয় পুনিক যুদ্ধ। যুদ্ধ চলেছিল বিশ বৎসরেরও অধিক এবং পরিশেষে রোম জয়লাভ করে। সিসিলি, সার্দিনিয়া ও কোর্সিকো দ্বীপগুলো রোমের অধীনে চলে আসে। পশ্চিম ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করল কার্থেজ। স্পেনকে কব্জা করে নিল তারা। সেখানে এই অভিযান পরিচালনা করলেন তরুণ সেনাপতি হানিবল। হানিবলের সৈন্য পরিচালনার কৌশল এবং অসাধারণ শৈর্য্যবীর্যের কাহিনী ছড়িয়ে পড়ল সর্বত্র। 

হানিবলের সেনাবাহিনী আল্পস পবর্তমালা পার হচ্ছে।
স্পেনে অভিযানের কারণে খ্রী:পূ: ২১৮ অব্দে, রোম কার্থেজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে ২য় পুনিক যুদ্ধ শুরু হয়। তখন হানিবল তার বাহিনী নিয়ে তুষারাবৃত পার্বত্যপথ দিয়ে আল্পস পর্বত অতিক্রম করে ইটালীতে গিয়ে পৌঁছুলেন; রোমকদের জন্যে এ ছিল একেবারে কল্পনার বাইরে। কার্থেজ বাহিনীর অর্ধেকই পর্বত অতিক্রম করার পথেই প্রচন্ড ঠান্ডায় মৃত্যূমুখে পতিত হয়েছিল। যারা বেঁচে ছিল তাদের নিয়ে হানিবল ইটালীর পো নদীর অববাহিকায় উপস্থিত হলেন। সেখানে উত্তর ইটালীর অধিবাসী দুর্ধর্ষ গল উপজাতী হানিবলের সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগ দিল। হারান শক্তি ফিরে পাবার পর হানিবল ধীরে ধীরে উত্তর থেকে দক্ষিণ ইটালী অভিমুখে অভিযান শুরু করলেন। পথিমধ্যে তিনি ছোট খাট বাঁধা অতিক্রম করে কানে এসে পৌঁছুলেন, সেখানে সম্মিলিত রোমান বাহিনী অপেক্ষা করছিল। 

কানে অপেক্ষারত রোমান বাহিনীতে ছিল ৮০ হাজার পদাতিক ও ছয় হাজার অশ্বারোহী সেনা। অন্যদিকে হানিবলের সাথে ছিল চল্লিশ হাজার পদাতিক ও দশ হাজার অশ্বারোহী সৈন্য। রোমানরা তাদের পদাতিক বাহিনীকে চতুর্ভুজ আকারে সারিবদ্ধভাবে বিন্যস্ত করেছিল। আর অশ্বারোহী সেনা পদাতিক বাহিনীর দু‘পাশে পার্শ্ববাহিনী হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিল। হানিবল যখন দেখলেন যে, রোমান পদাতিকের সংখ্যা তার দ্বিগুন, তখন তিনি এক দু:সাহসিক পরিকল্পণা গ্রহণ করলেন। নিজের বাহিনীকে তিনি এমনভাবে অর্ধাচন্দ্রাকারে বিন্যাস করলেন যে, পিঠের দিকটা রইল রোমানদের মুখোমুখি, আর দু‘পাশে রাখলেন শ্রেষ্ঠ কিছু পদাতিক ও অশ্বারোহী বাহিনী।

হানিবলের সমরাভিযানের রুট ম্যাপ।
রোমান পদাতিক বাহিনী সামনে এসে আঘাত করল। কার্থেজ বাহিনীর মধ্যভাগে আঘাত করে রোম বাহিনী অগ্রসর হয়ে ঢুকে পড়ার ফলে তাদের উভয় পার্শ্ব অরক্ষিত হয়ে গেল। আর ঠিক সেই সময় হানিবলের পার্শ্ববাহিনীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনারা দু‘পাশ থেকে শত্রুর উপর ঝাপিয়ে পড়ল। কার্থেজের অশ্বারোহী বাহিনী রোমের অশ্বারোহী বাহিনীকে পিছন দিক থেকে আক্রমণ করল। রোমের পদাতিক বাহিনীর বিন্যাস এতে ভেঙ্গে গিয়ে সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। ওদিকে হানিবলের সেনারা সেসময় রোমান বাহিনীকে চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। রোমানরা পরাজিত হল। হানিবল ৭০ হাজারের মত রোমান সৈন্য বন্দী করল।

রোম পরাজিত হওয়ায় ইটালীর বহু শহর হানিবলের পক্ষে চলে আসে। রোমের অবস্থা তখন সঙ্কটজনক হয়ে দাঁড়ায়। এতদসত্ত্বেও রোমান সিনেট হানিবলের কাছে কোন সন্ধির প্রস্তাব পেশ করেনি। সুতরাং কার্থেজ বাহিনী নিয়ে হানিবল রোমের একদম কাছে চলে এলেন। হানিবল দেখলেন, কান যুদ্ধ শেষে তার বাহিনীর যে শক্তি অবশিষ্ট আছে, তা দিয়ে বিশাল দুর্ভেদ্য এই নগরীকে দখল করা একেবারেই অসম্ভব। সুতরাং তিনি ইটালীর দক্ষিণ দিকে সরে গেলেন।

কানের যুদ্ধ শেষ হবার ১২ বৎসর পর রোমানরা সিসিলি থেকে আফ্রিকার দিকে অভিযান শুরু করল। এই অভিযানে রোমান সেনাপতি ছিলেন সসিপিও। এই সময় হানিবল ছিলেন ইটালীতে। তিনি দেখলেন কার্থেজকে রক্ষা করতে হলে তার এখন ইটালী ছেড়ে যাওয়া অপরিহার্য। 

খ্রী:পূ: ২০২ অব্দে কার্থেজের অনতিদূরে জাম্মা শহরের কাছে রোমান ও কার্থেজ বাহিনী একে অপরের মুখোমুখি হল। এবারের যুদ্ধে রোমানদের অশ্বারোহী বাহিনী কার্থেজের চেয়ে অনেক বেশী ছিল। রোমান ও কার্থেজীয় পদাতিক বাহিনীর মধ্যে যখন সূদীর্ঘ ও প্রচন্ড যুদ্ধ চলছিল, সেইসময় (খ্রী:পূ: ২০১ অব্দে) হানিবলের বাহিনীকে পিছন থেকে আক্রমণ করল রোমান অশ্বারোহী বাহিনী এবং তাদেরকে ছিন্নভিন্ন করে দিল। 

এই পরাজয়ের ফলে রোমের কাছে কার্থেজ তার যুদ্ধ জাহাজ সমর্পণ ছাড়াও বিশাল অঙ্কের যুদ্ধপণ দিতে বাধ্য হল; কার্থেজের আধিপত্য প্রায় আর কোথাও রইল না। অন্যদিকে এই বিজয়ের ফলে রোমানদের সামনে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আরও নতুন নতুন অঞ্চল দখলের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। যুদ্ধ শেষে রোমান সিনেট হানিবলকে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়। হানিবল রোমানদের হাতে ধরা দিতে চাননি; তিনি মধ্যপ্রাচ্যের কোথাও আশ্রয় নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি, নিজ গৃহের চতুর্দিক রোমান সেনা পরিবেষ্টিত দেখে তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন।

নৌবাহিনী ও পদাতিক বাহিনী হারানোর পর কার্থেজ আর রোমের কাছে বিপদজনক ছিল না। কিন্তু কার্থেজরা তাদের নৌবাণিজ্য আগের মতই চালু রেখেছিল এবং পুন:রায় সমৃদ্ধশালী হয়ে উঠছিল, যা রোমান অভিজাত ও বণিক সম্প্রদায়ের হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তারা কার্থেজকে ধ্বংস করে তাদের নৌবাণিজ্য দখলে নিতে চাইল। সুতরাং কার্থেজকে ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রোমক বাহিনী খ্রী:পূ: ২য় শতকের মধ্যভাগে পুন:রায় আফ্রিকার মাটিতে পা রাখল এবং অবরোধ করল কার্থেজ। শুরু হল ৩য় পুনিক যুদ্ধ।

ধ্বংসের পর কার্থেজ নগরী।
এ ছিল একটা অসম শক্তির যুদ্ধ। তবুও কার্থেজীয়রা নিজেদের মাতৃভূমি রক্ষার জন্যে ৩ বৎসর যাবৎ দূর্গ মধ্যে অবরুদ্ধ থেকে বীরত্বের সাথে লড়াই করে গেল। যখন তাদের রসদ ফুরিয়ে গেল এবং আর দূর্গ মধ্য থেকে নিক্ষেপের কোন অস্ত্রপাতি রইল না, তখন সমস্ত কার্থেজীয় মেয়েরা তাদের লম্বা চুল কেটে ফেলে সেই চুল দিয়ে পাথর নিক্ষেপের জন্যে দড়ি তৈরী করে দিয়েছিল যোদ্ধাদের।

দীর্ঘ ৩ বৎসর অবরোধের কারণে অনাহারে দুর্বল হয়ে গেল কার্থেজীয়রা। এই সময় সুযোগ বুঝে রোমানরা অভিযান চালাল। রোমান বাহিনী নগরীতে ঢুকে পড়ে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে দিল। একসপ্তাহ ধরে তারা এই লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল; এমনকি রাত্রেও তারা সংযোগকৃত অগ্নির ঐ অশুভ আলোয়ও তা করেছিল।

রোমের সিনেটের আদেশে কার্থেজকে পৃথিবীর বুক থেকে নিচিহ্ন করে দেয়ার পর, বন্দী ৫০ হাজার কার্থেজবাসীকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া হল।

এদিকে ভূমধ্য সাগরের পশ্চিম উপকূলবর্তী অঞ্চলে নিজেদের অধিকার বিস্তার করে ক্ষান্ত হল না রোমানরা। তারা বলকান উপদ্বীপ ও এশিয়া মাইনরেও অভিযান চালায়। প্রাচ্য অভিমুখে রোমের অগ্রসরণের ফলে পূর্ব ভূমধ্য সাগরীয় অঞ্চলের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও বিশাল সাম্রাজ্যের সাথে তাদের যুদ্ধ বাঁধে। সিরিয়া সম্রাটের ছিল বিরাটায়তনের সেনাদল, হস্তী বাহিনী, তীক্ষ্ণ অস্ত্রযুক্ত রথচক্র এবং উষ্ট্র বাহিনী। বহুজাতির লোক নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়েছিল। এশিয়া মাইনরে রোমক বাহিনীর সাথে যুদ্ধে সিরীয় সম্রাট পরাজিত হন ফলে তার সাম্রাজ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বহু রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস।
বলকান উপদ্বীপে রোম তার ‘Divide and Rule’ পলিসি সঠিকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। মেসিডোনিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের সময় রোম, গ্রীকদেরকে স্বপক্ষে টেনে এনেছিল এই আশ্বাস দিয়ে যে, তারা তাদেরকে স্বাধীনতা দিয়ে দেবে।

শক্তি পরীক্ষায় মেসিডোনিয় ফালাঙ্গোস ও রোমান লেগিও মুখোমুখি হল। দীর্ঘ বল্লম সজ্জিত ফালাঙ্গোস ছিল অজেয়। রোমক বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিহত করে তারা পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং রোমীয়দের পিছু হটিয়ে দিতে শুরু করে। কিন্তু এর ফলে তারা নিজেরা কিছুটা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, আর সেই সুযোগে রোমের ক্ষিপ্রগতির সৈন্যরা মেসিডোনিয় বাহিনীর বুহ্য ভেদ করে ভিতরে ঢুকে পড়ে। সুদীর্ঘ বল্লম তখন আর কোন কাজে দেয়নি এবং মেসিডোনিয়রা পরাজয় বরণ করে।

মেসিডোনিয় সাম্রাজ্যের পতনের পর গ্রীকেরা নিজের স্বাধীনতা ফিরে পাবার চেষ্টা করল। তখন রোম তাদের বাঁধা অগ্রাহ্য করে খ্রীঃপূঃ ১৪৬ অব্দে গ্রীসের উপর নিজের প্রভূত্ব স্থাপন করল। রোমকদের ইচ্ছের বিরুদ্ধতা করার শাস্তিস্বরূপ রোম, গ্রীক সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র কোরিন্থ নগরী একেবারে ধ্বংস করে দেয়।

 ত্রিউম্ফুস।
রোমের বিজয়ী সেনাপতিরা সংবর্ধিত হত ত্রিউম্ফুসের মাধ্যমে। মেসিডোনিয়া বিজয়ী রোমান সেনাপতির জন্যেও ত্রিউম্ফুসের আয়োজন হল। এই ত্রিউম্ফুস দেখার জন্যে সব রাস্তাতেই যেখান থেকে শোভাযাত্রা দেখা সম্ভব, সেখানেই জনতা সমবেত হয়েছিল।


প্রথমদিন ভোরবেলা অন্ধকার থাকতেই লুন্ঠিত প্রস্তরমূর্ত্তি ও ছবিভর্ত্তি ২৫০টি গাড়ি আসতে শুরু করল।পরের দিন নগরের পথে পথে সবচেয়ে সুন্দর ও মূল্যবান মেসিডোনিয় অস্ত্র-শস্ত্র বোঝাই করা গাড়ি দেখা গেল। তামা ও লোহার তৈরী অস্ত্রগুলো ঝকঝক করছিল। সেগুলোর মাঝখানে তরবারী ও বল্লমের খোঁচা খোঁচা মাথা দেখা যাচ্ছিল। এর পিছু পিছূ সাড়ে সাতশ' ঘট ভর্তি রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। চারজন করে লোক একেকটা ঘড়া বইছিল। তারও পিছনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছির রৌপ্যনির্মিত বিশালাকার ভারি ভারি পেয়ালা ও পাত্র।

৩য় দিন নিয়ে আসা হল বলিদানের জন্য ১২০টি মোটাসোটা বৃহদাকার ষাঁড়, তাদের শিং সোনালী রঙে রঞ্জিত। দূরে দেখা গেল, নিয়ে আসছে স্বর্ণমুদ্রা ভর্ত্তি ৭৭টি ঘড়া, আগেরগুলো যেমন ছিল সেরকমই আকারে বৃহৎ। এসবের পিছনে পিছনে আসছিল লোকজন, তাদের মাথার উপরে মূল্যবান প্রস্তর খঁচিত খাঁটি সোনার তৈরী বিরাটাকার পাত্র আর থালাগুলো তারা উর্দ্ধে তুলে ধরেছিল। এসবেরও পিছনে আসছিল মেসিডোনিয় সম্রাটের রাজশকট, তাতে রাজার অস্ত্রশস্ত্র ভর্তি, আর তার উপরে শোভা পাচ্ছিল তার রাজমুকুট।

এই রথের পিছনে নিয়ে আসা হচ্ছিল রাজার সন্তানদের -দুই রাজকুমার ও এক রাজকুমারীকে। তাদের বয়স এত কম যে, কি দু:খের দিন শুরু হয়েছে তাদের জন্যে সেকথা বূঝতে পারার কথা নয়। তাদের পিছুপিছু আসছিলেন কাল পোষাক পরিহিত সম্রাট। এই সর্বনাশে তিনি যেন বোধশক্তি রহিত হয়ে গেছেন।

অত্যন্ত অলংকৃত জাঁকজমকপূর্ণ শকটে চড়ে চলেছিলেন স্বর্ণখঁচিত লাল পোষাক পরিহিত রোমান সেনাপতি। আর তাঁর পশ্চাতে চলেছিল তার সৈন্যদল, হাতে তাদের তেজপাতা গাছের ডাল, মুখে গান।

সমাপ্ত।


ছবি: Wikipedia, livius, mclaughlinbibleministries, daviddarling.
উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। হিস্ট্রি অব গ্রীস -গ্রোট। এন্সিয়েন্ট মনার্কী -শিলথন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন