pytheya.blogspot.com Webutation

২ মার্চ, ২০১২

Moses: ফেরাউনের রাজদরবারে মূসা ও হারুণ।

মিসরে পৌঁছে মূসা (Moses) হারুণের সাথে দীর্ঘ আলোচনা করলেন। তারা নিজেদের মধ্যে নেতৃত্বও ঠিক করে ফেলেছিলেন। কিন্তু ফেরাউনের সঙ্গে সাক্ষাতে তারা কালক্ষেপণ করতে লাগলেন। কেননা তাদের আশঙ্কা হল ফেরাউন তাদেরকে হাতের মুঠোয় পাওয়া মাত্র শাস্তি দেবে।

অত:পর আল্লাহ তাদেরকে সাক্ষাতের বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলেন। তিনি বললেন, ‘তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শণ নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাও সে তো সীমালংঘন করে চলেছে। তোমরা তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। হয়তোবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে বা ভয়ও পেতে পারে।’

এসময়ই মূসা তাদের ঐ আশঙ্কার বিষয়টি আল্লাহর কাছে তুলে ধরলেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে আশ্বস্ত করলেন। তিনি বললেন- ‘ভয় কোরও না; আমি তো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি। আমি সবই শুনি সবই দেখি। অতএব, তোমরা তার কাছে যাও ও বল, ‘আমরা দু‘জন প্রতিপালকের রসূল, সুতরাং আমাদের সাথে বনি ইস্রায়েলীদেরকে যেতে দাও, আর তাদেরকে কষ্ট দিও না। আমরা তো তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে নিদর্শণ এনেছি, আর যারা সৎপথ অনুসরণ করবে তাদের জন্যে শান্তি। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি মিথ্যে আরোপ করবে বা মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্যে তো রয়েছে শাস্তি।’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-তুমি ও তোমার ভাই আমার নিদর্শণ নিয়ে যাও, আর আমাকে স্মরণ করতে আলস্য কোরও না; তোমরা দু‘জন ফেরাউনের কাছে যাও সে তো সীমালংঘন করে চলেছে। তোমরা তার সাথে নম্রভাবে কথা বলবে। হয়তোবা সে উপদেশ গ্রহণ করবে, বা ভয়ও পেতে পারে।’(২০:৪২-৪৪)
তারা (মূসা ও হারুণ) বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের আশঙ্কা হয় সে আমাদের যাওয়া মাত্রই আমাদেরকে শাস্তি দেবে বা অন্যায় ব্যাবহার করে সীমালংঘন করবে।’ 

তিনি (আল্লাহ) বললেন, ‘ভয় কোরও না; আমি তো তোমাদের সঙ্গেই রয়েছি। আমি সবই শুনি সবই দেখি। অতএব, তোমরা তার কাছে যাও ও বল, ‘আমরা দু‘জন প্রতিপালকের রসূল, সুতরাং আমাদের সাথে বনি ইস্রায়েলদের যেতে দাও, আর তাদের কষ্ট দিও না। আমরা তো তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে নিদর্শণ এনেছি, আর যারা সৎপথ অনুসরণ করবে তাদের জন্যে শান্তি। নিশ্চয়ই আমাদের প্রতি প্রত্যাদেশ প্রেরণ করা হয়েছে। যে ব্যক্তি মিথ্যে আরোপ করবে বা মুখ ফিরিয়ে নেবে তার জন্যে তো রয়েছে শাস্তি।’(২০:৪৫-৪৮) 

ইস্রায়েলীদেরকে নিয়ে মিসর ত্যাগের অনুমতি পেতে এক কাক ডাকা ভোরে মূসা ও হারুণ ফেরাউনের প্রাসাদ অভিমুখে রওনা হলেন। অতঃপর তারা যখন প্রাসাদের দ্বার সম্মুখে উপনীত হলেন, প্রহরী তাদেরকে অন্দরে প্রবেশে বাঁধা দিল, বলল, ‘তোমরা তোমাদের পরিচয় দাও।’
মূসা বললেন, ‘আমরা আল্লাহ প্রেরিত রসূল।’

দ্বার রক্ষীরা অবাক হল। তারা তো এতদিন পর্যন্ত ফেরউনকেই ইলাহ জেনে তার উপাসনা করে আসছে। তাহলে এই ইলাহটা কে? সুতরাং তারা গম্ভীরস্বরে বলল, ‘ফেরউনই আমাদের রব। তিনি ব্যতিত অন্য ইলাহর খবর আমরা জানি না।’

মিসরীয়রা ফেরউনকে উপাস্য হিসেবে মান্য করত। এটা এই কারণে নয় যে ফেরাউন নিজেকে উপাস্য হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন, আর তার শাস্তির ভয়ে লোকেরা তাকে দেবতা হিসেবে মান্য করত। এটা এই কারণে যে, তাদের বিশ্বাসই ছিল এমন। তাদের বিশ্বাস ছিল ফেরাউনের মত অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়া কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব না, দেবতাদের পক্ষেই সম্ভব। এ কারণে তারা নিজেরাই ফেরাউনকে বলত ‘দেবশ্রেষ্ঠ’। তার গুণকীর্তণ করত তারা এই বলে-‘তিনিই সূর্য্য, নিজ আলোকে সব আলোকিত করেছেন।’ মন্দিরে দেবমূর্ত্তির পাশাপাশি ফেরাউনের মূর্ত্তি থাকত। শুধু সাধারণ মানুষই নয় উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা পর্যন্ত ফেরাউনকে সাষ্টাঙ্গে সিজদা করত। 

অবশ্য ফেরাউনকে দেবতা হিসেবে মান্য করার পিছনে পুরোহিতদের অবদানও কম ছিল না। তারা ফেরাউনের প্রতি জনগণের আজ্ঞানুবর্তিতা দাবী করত। তারা বলত: 'বাধ্য হলে পাবে দেবতার আশীর্বাদ, অন্যথায় দেবতারা দেবেন অভিশাপ।’ ফেরাউনের ইচ্ছেকে যারা অমান্য করবে তাদের ভাগ্যে থাকবে অনাবৃষ্টি, প্লেগ, শত্রুর আক্রমণ আর দেবতা ওসিরিসের শাসন দন্ড। মিসরীয়রা মনে করত পুরোহিতরা দেবদেবীদের সেবা করে, তাদের মূর্ত্তির সামনে আহার্য নিয়ে রাখে- খেতে দেয়, সুতরাং তারা দেবদেবীদের সাক্ষাৎ পায়। আর তারা শুধু উৎসর্গীত দ্রব্যই দেবদেবীকে পৌঁছে দেয় না, লোকজনের প্রার্থণাও তাদের কাছে নিবেদন করতে পারে। এই কারণে তাদের কথা মানে দেবতাদের কথা; দেবতারা তাদের মাধ্যমেই জনগণকে নির্দেশ দেয়। তাই লোকেরা তাদের কথা নির্বিবাদে মেনে নিত।

মূসা প্রহরীদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর কথা বললেন। কিন্তু রক্ষীরা তার বা হারুণের কোন কথাই আর শুনতে রাজী হল না। অগত্যা তারা প্রাসাদের সম্মুখেই অবস্থান নিলেন।

এক সূদীর্ঘ সময় মূসা ও হারুণকে প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান করতে হয়েছিল। প্রতিদিন ভোরে তারা প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান নিতেন এবং সন্ধ্যায় ফিরে যেতেন। একদিন এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী দীর্ঘদিন ধরে দু‘যুবককে প্রাসাদের সম্মুখে অবস্থান নিতে দেখে নিতান্ত কৌতুহলবশতঃ তাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন। মূসা বললেন, ‘আমরা আল্লাহ প্রেরিত রসূল। তাঁর নির্দেশে আমরা ফেরাউনের কাছে এসেছি, বনি ইস্রায়েলীদেরকে এদেশ থেকে মুক্ত করে নিয়ে যেতে তার অনুমতির জন্যে।’

মূসার বক্তব্যের দৃঢ়তা দেখে কর্মচারীটি বিষ্মিত হলেন। তিনি দ্রুত এ বিষয়ে ফেরাউনকে অবহিত করলেন যে- ‘মূসা ও হারুণ নামের দু‘ব্যক্তি এমন এক বিষয় নিয়ে এখানে এসেছে, যা রীতিমত বিষ্ময়কর। আর তারা আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ প্রাসাদের সম্মুখে অপেক্ষমান।’

 ফেরাউনের রাজদরবারে মূসা ও হারুণ।
ফেরাউন কৌতুহলী হলেন। সুতরাং ত্বরিৎ মূসা ও হারুণকে দরবারে হাজির করা হল। মূসার পায়ে চপ্পল, হাতে লাঠি আর গায়ে বিদেশী পোষাক। ফেরাউন মারনেপতাহ তাদের দু’জনকে খুঁটিয়ে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের আগমণের উদ্দেশ্য কি?’
তারা বললেন, ‘আমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক পাঠিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে ইব্রীয়দের এদেশ থেকে বের করে নিয়ে যেতে বলেছেন। সুতরাং তাদেরকে আমাদের সাথে এদেশ ছেড়ে চলে যেতে দাও।’

ফেরাউন তৎক্ষণাৎ ইস্রায়েলীদের মিসর ছাড়তে অনুমতি দিলেন না, যদিও তাদের সংখ্যা বৃদ্ধি তার উদ্বেগের কারণ ছিল এবং সেইসময় তিনি তাদের সংখ্যা কমানোর জন্যে ব্যস্ত ছিলেন। কারণ, তারা ছিল দাস এবং শত সহস্র ভূমি দাস ছিল তার কাছে একটি অর্থকরী সম্পদ।
অবশ্য ফেরাউন এটা চাননি যে, এই লোকেরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে জয়ী হোক, আবার এটাও চাননি এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তিনি স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেবেন, যারা বিনামূল্যে তার দাসত্ব করে। তাই তিনি ও তার পরিষদবর্গ মূসার বক্তব্য শুনে তাদেরকে নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগলেন। 

ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গ বললেন, ‘আমাদের মতই যারা এমন দু‘জনের উপর আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে, তাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক পাঠিয়েছেন? আর বিশেষ করে যাদের সম্প্রদায় আমাদের দাসত্ব করে?’ 

মূসা মদিয়ানে থাকা অবস্থায় ফেরাউন ২য় রামেসিস মারা গিয়েছিলেন। অতঃপর তার এক পুত্র মারনেপতাহ তার স্থলাভিষিক্ত হন। তিনি মূসাকে চিনতেন কিন্তু দীর্ঘদিন তার অনুপস্থিতি এবং অপরিচিত বেশভূষার কারণেই প্রথম দেখায় তাকে চিনতে পারেননি। অতঃপর তাকে চিনতে পেরে ধূর্ত ফেরাউন তার ব্যক্তিত্বকে খাট করে তাকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে ফেলতে, তার গোষ্ঠি ও ব্যক্তিজীবন সম্পর্কে অভিযোগ উত্থাপন করলেন। বললেন, ‘যখন তুমি ছোট ছিলে আমরা কি তোমাকে আমাদের মধ্যে রেখে লালন-পালন করিনি? তুমি কি তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটাওনি? আর তোমার সেই কাজটা যা তুমি করেছিলে! তুমি তো অকৃতজ্ঞ হে।’ 

এই উক্তি দ্বারা ফেরাউন ইঙ্গিতে তাকে একথা বোঝাতে চেষ্টা করলেন যে, যে সম্প্রদায়ের স্নেহে লালিত-পালিত ও যৌবনে পদার্পণ-তাদেরই একজনকে অহেতুক হত্যা যেমন জুলুম তেমনি নিমকহারামী ও কৃতঘ্নতা। 

মূসা ফেরাউনের ইঙ্গিত ঠিকই ধরতে পারলেন, বুঝতে পারলেন কোন ঘটনার কথা তিনি বলতে চাইছেন। তিনি মনে মনে বললেন, ‘একজন মিসরীয়কে হত্যার অপরাধে কোন সাক্ষ্য প্রমান ছাড়াই তোমরা আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছিলে। অথচ দীর্ঘদিন ধরে তোমরা অসংখ্য ইস্রায়েলী নারী, পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে চলেছ, আর তা তোমাদের দৃষ্টিতে অপরাধ বলে বিবেচিত হচ্ছে না।’

ফেরাউনের এসব কূট তর্ক এবং অভিযোগ সম্বলিত প্রতিবন্ধকতার সমাধান প্রক্রিয়ার জ্ঞান আল্লাহ মূসাকে দিয়েছিলেন। তাই তার কথার উত্তরে তিনি বললেন, ‘যখন পথভ্রষ্ট ছিলাম তখন আমি ঐ কাজটি করেছি। তারপর যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন তোমাদের কাছ থেকে পালিয়ে গেলাম। তারপর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করেছেন। আর আমাকে রসূলদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এই তো তোমার সেই অনুগ্রহ যে, বনি ইস্রায়েলকে তুমি দাসে পরিণত করেছ!
-হে ফেরাউন! আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রেরিত রসূল। ‘রাব্বুল আলামিন’ আল্লাহ সম্পর্কে সত্য বলা ছাড়া আমার কোন অধিকার নেই। আমি তোমাদের কাছে এনেছি তোমাদের প্রতিপালকের স্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং বনি ইস্রায়েল সম্প্রদায়কে আমার সাথে যেতে দাও।’

ফেরাউন বললেন, ‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক? ‘রাব্বুল আলামিন’ সে আবার কে?’ 
উত্তরে মূসা আল্লাহর পরিচিতি তুলে ধরলেন তাঁর ঐ সকল কাজের কথা বলে যা সমগ্র সৃষ্টি জগতে পরিব্যপ্ত এবং কেউ ঐ সকল কাজ নিজে অথবা কোন মানব করেছে বলে দাবী করতে পারে না। তিনি বললেন, ‘তিনি আকাশ ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বিশ্বাস করতে পার।’ 
এসময় ফেরাউন তার পার্শ্ববর্গদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমরা শুনছ তো?’ 
মূসা বললেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যথাযোগ্য আকৃতি ও প্রকৃতি দান করেছেন এবং পথ প্রদর্শণ করেছেন।’ 
ফেরাউন বললেন, ‘তাহলে আগের আমলের লোকেদের কি হাল হবে?’ 

ফেরাউন আশা করছিলেন মূসা হয়তঃ এর উত্তরে বলবেন, ‘তারা সবাই পাপী এবং জাহান্নামী।’-এতে তিনি মিসরীয়দের বলবেন, ‘দেখ, সে কেমন বেওকূফ! সে তোমাদের সকল পিতৃপুরুষ, সকল মিসরীয়দেরকে জাহান্নামী মনে করে।’ এতে নিশ্চয়ই সকলে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপে যাবে। কিন্তু মূসা বিজ্ঞজনোচিত উত্তর দিলেন, বললেন, ‘এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে এক কিতাবে রয়েছে। আমার প্রতিপালক ভুল করেন না বা ভুলেও যান না, যিনি তোমাদের জন্যে প্রসারিত করেছেন পৃথিবীকে আর তাতে তোমাদের জন্যে দিয়েছেন চলার পথ। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামান আর তা দিয়ে জোড়ায় জোড়ায় উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন, যার একটার সাথে আরেকটার মিল নেই। তোমরা খাও আর তোমাদের পশুদের চরাও; নিশ্চয়ই এসবের মধ্যে নিদর্শণ রয়েছে বিবেক সম্পন্নদের জন্যে।’

পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে ফেরাউন বললেন, ‘তোমাদের কাছে এই যে রসূল পাঠান হয়েছে এ তো এক বদ্ধপাগল!’
মূসা বললেন, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিম এবং এ দু‘য়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক যদি তোমরা তা বুঝতে!’ 
ফেরাউন কঠিনস্বরে বললেন, ‘তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারে আটক রাখব।’ 
মূসা বললেন, ‘আমি তোমার কাছে স্পষ্ট নিদর্শণ আনলেও?’ 
ফেরাউন বললেন, ‘যদি তুমি কোন নিদর্শণ এনে থাক সত্যবাদী হলে তা হাযির কর।’ 

 ফেরাউনের রাজদরবারে মূসা ও হারুণ।
তখন মূসা তার লাঠি মাটিতে ছুঁড়ে ফেললেন। সাথে সাথে সেটি সাক্ষাৎ এক অজগর সাপ হয়ে গেল। পরিষদবর্গ উৎকন্ঠিত হলেন। মূসা সাপের লেজের দিকটা ধরলেন- তৎক্ষণাৎ সেটি আবার লাঠি হয়ে গেল। পরিষদবর্গ বললেন, ‘এ তো যাদু!’

এই নিদর্শণকে যাদু বলে উড়িয়ে দেয়াতে মূসা তার ২য় নিদর্শণ উপস্থাপন করতে তার হাত বগলের নীচে কাপড়ের ভাঁজের মধ্যে রাখলেন। আর যখন তিনি তার তা বের করলেন তৎক্ষণাৎ দর্শকদের সামনে তা উজ্জ্বল শুভ্র মনে হল। তারা বললেন, ‘দুই-ই যাদু একটি অপরটির মত। আমরা একটিকেও মানিনে।’

ফেরাউন এতক্ষণ মূসার কার্যকলাপ মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করছিলেন। তার মন মূসার আনীত নিদর্শনাবলীকে সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু তিনি অন্যায় ও অহঙ্কার করে পরিষদবর্গের ন্যায় নিদর্শণসমূহ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং সম্প্রদায়ের প্রধানদেরকে বললেন, ‘আমি তো দেখছি এ একজন ওস্তাদ যাদুকর! এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়। এখন তোমরা কি বুদ্ধিপরামর্শ দাও?’

মূসা বললেন, ‘সত্য যখন তোমাদের সামনে এসেছে তখন সে সম্পর্কে তোমরা কেন এমন বলছ? এ-কি যাদু? যাদুকররা তো সফল হয় না।’ 
পরিষদবর্গ বললেন, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যে মতে পেয়েছি তুমি কি তার থেকে সরিয়ে নেবার জন্যে আমাদের কাছে এসেছ? এবং যেন দেশে তোমাদের দু’জনের প্রতিপত্তি হয়, সেইজন্যে? তোমাদের দু’জনকে আমরা বিশ্বাস করিনে।’
তারা ফেরাউনকে বললেন, ‘তাকে ও তার ভাইকে কিছু সময় দেন। আর শহরে শহরে যোগানদারকে পাঠান। তারা আপনার সামনে সকল ওস্তাদ যাদুকরদেরকে হাযির করুক।’ 

 মূসা দেখালেন সাইন অব গড।
ফেরাউন বললেন, ‘হে মূসা! তুমি কি যাদুবলে আমাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়িত করার মানসে আমাদের কাছে এসেছ? বেশ, তোমার যাদুর মতই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সুতরাং আমাদের ও তোমার মধ্যে মোকাবেলার জন্যে স্থান-কাল নির্ধারণ কর, আমরা কেউই তার খেলাফ করতে পারব না, আর তুমিও করবে না।’ 
মূসা বললেন, ‘তোমাদের নির্ধারিত দিন হল উৎসবের দিন, আর সেদিন লোকজন জমায়েত হবে বেলা এক প্রহরের সময়।’
ফেরাউন তার কর্মচারীদের (যোগানদার) ডেকে বললেন, ‘তোমরা আমার কাছে ঝানু যাদুকরদেরকে নিয়ে এস।’
ফেরাউন দরবার ছেড়ে চলে গেলেন।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘মূসাকে তো আমি নিদর্শণ দিয়ে ফেরাউন ও তার পরিষদবর্গের কাছে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল, ‘আমাকে বিশ্বজগতের প্রতিপালক পাঠিয়েছেন।’ 
আমার নিদর্শণগুলো নিয়ে তাদের কাছে যাওয়া মাত্র ওরা তা নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করতে লাগল।(৪৩:৪৬-৪৭)

ওরা বলল, ‘আমাদের মতই যারা এমন দু‘জনের ওপর আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব? আর বিশেষ করে যাদের সম্প্রদায় আমাদের দাসত্ব করে?’(২৩:৪৭) 
ফেরাউন (মূসাকে) বলল, ‘যখন তুমি ছোট ছিলে আমি কি তোমাকে আমাদের মধ্যে (রেখে) লালন পালন করিনি? তুমি কি তোমার জীবনের বহু বৎসর আমাদের মধ্যে কাটাওনি? আর তোমার সেই কাজটা যা তুমি করেছিলে! তুমি তো অকৃতজ্ঞ।’ 

মূসা বলল, ‘যখন আমি পথভ্রষ্ট ছিলাম তখন আমি ঐ কাজটি করেছি। তারপর যখন তোমাদের ভয়ে ভীত হলাম, তখন তোমাদের কাছ থেকে পালিয়ে গেলাম। তারপর আমার প্রতিপালক আমাকে জ্ঞান দান করেছেন। আর আমাকে রসূলদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত করেছেন। এ তো তোমার সেই অনুগ্রহ যে, বনি ইস্রায়েলীদেরকে তুমি দাসে পরিণত করেছ।’(২৬:১৮-২২) 
মূসা বলল, ‘হে ফেরাউন! আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের প্রেরিত রসূল। আল্লাহ সম্পর্কে সত্যি বলা ছাড়া আমার কোন অধিকার নেই। আমি তোমাদের কাছে এনেছি তোমাদের প্রতি পালকের স্পষ্ট প্রমাণ। সুতরাং বনি ইস্রায়েলী সম্প্রদায়কে আমার সাথে যেতে দাও।’(৭:১০৩-১০৫)

ফেরাউন বলল, ‘হে মূসা! কে তোমাদের প্রতিপালক?(২০:৪৯) ‘রাব্বুল আলামিন’ সে আবার কি? 
মূসা বলল, ‘তিনি আকাশ ও পৃথিবী এবং উভয়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক, যদি তোমরা বিশ্বাস করতে পার।’
ফেরাউন তার পার্শ্ববর্গদের লক্ষ্য করে বলল, ‘তোমরা শুনছ তো?’(২৬:২৩-২৫) 
মূসা বলল, ‘তোমাদের প্রতিপালক তিনি যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যথাযোগ্য আকৃতি ও প্রকৃতি দান করেছেন এবং পথ প্রদর্শণ করেছেন।’ 

ফেরাউন তখন বলল, ‘তাহলে আগের আমলের লোকেদের কি হাল হবে?’ 
মূসা বলল, ‘এর জ্ঞান আমার প্রতিপালকের কাছে এক কিতাবে রয়েছে। আমার প্রতিপালক ভুল করেন না বা ভুলেও যান না, যিনি তোমাদের জন্যে প্রসারিত করেছেন পৃথিবীকে আর তাতে তোমাদের জন্যে দিয়েছেন চলার পথ। তিনি আকাশ থেকে বৃষ্টি নামান আর তাদিয়ে জোড়ায় জোড়ায় উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন, যার একটার সাথে আরেকটার মিল নেই। তোমরা খাও আর তোমাদের পশুদের চরাও; নিশ্চয়ই এসবের মধ্যে নিদর্শণ রয়েছে বিবেক সম্পন্নদের জন্যে।’(২০:৫০-৫৪)

(পরিষদবর্গকে লক্ষ্য করে) ফেরাউন বলল, ‘তোমাদের কাছে এই যে রসূল পাঠান হয়েছে এ তো এক বদ্ধ পাগল!’
মূসা বলল, ‘তিনি পূর্ব ও পশ্চিম এবং এ দু‘য়ের মধ্যেকার সবকিছুর প্রতিপালক যদি তোমরা তা বুঝতে!’ 
ফেরাউন বলল, ‘তুমি যদি আমার পরিবর্তে অন্য কাউকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর, আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারে আটক রাখব।’ 
মূসা বলল, ‘আমি তোমার কাছে স্পষ্ট নিদর্শণ আনলেও?’(২৬:২৭-৩০) 
ফেরাউন বলল, ‘যদি তুমি কোন নিদর্শণ এনে থাক সত্যিবাদী হলে তা হাযির কর।’ 

তারপর মূসা তার লাঠি ছুঁড়ে ফেলল আর সাথে সাথে সেটি এক সাক্ষাৎ অজগর সাপ হয়ে গেল। আর যখন সে তার হাত বের করল তা তৎক্ষণাৎ দর্শকদের সামনে উজ্জ্বল শুভ্র মনে হল।(৭:১০৬-১১০) ওরা বলেছিল, ‘দুই-ই যাদু একটি অপরটির মত। বলেছিল, ‘আমরা একটিকেও মানিনে।’(২৮:৪৮)

তারা অন্যায় ও অহঙ্কার করে নিদর্শণাবলীকে প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলো সত্য বলে বিশ্বাস করেছিল।(২৭:১৪)
ফেরাউন, সম্প্রদায়ের প্রধানরাকে বলল, ‘এ তো একজন ওস্তাদ যাদুকর! এ তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিতে চায়। এখন তোমরা কি বুদ্ধিপরামর্শ দাও?’
মূসা বলল, ‘সত্য যখন তোমাদের সামনে এসেছে তখন সে সম্পর্কে তোমরা কেন এমন বলছ? একি যাদু? যাদুকররা তো সফল হয় না।’ 

ওরা বলল, ‘আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যেমতে পেয়েছি তুমি কি তার থেকে সরিয়ে নেবার জন্যে আমাদের কাছে এসেছ? এবং যেন দেশে তোমাদের দু’জনের প্রতিপত্তি হয়, সেইজন্যে? তোমাদের দু’জনকে আমরা বিশ্বাস করিনে।’(১০:৭৭-৭৮)
তারা (পরিষদবর্গ) ফেরাউনকে বলল, ‘তাকে ও তার ভাইকে কিছু সময় দেন। আর শহরে শহরে যোগানদারকে পাঠান। তারা আপনার সামনে সকল ওস্তাদ যাদুকরকে হাযির করুক।’

সে (ফেরাউন) বলল, ‘হে মূসা! তুমি কি যাদুবলে আমাদেরকে দেশ থেকে বের করে দেবার জন্যে আমাদের কাছে এসেছ? বেশ, তোমার যাদুর মতই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। সুতরাং আমাদের ও তোমার মধ্যে মোকাবেলার জন্যে স্থান-কাল ঠিক কর, আমরা কেউই তার খেলাফ করতে পারব না, আর তুমিও করবে না।’ 

মূসা বলল, ‘তোমাদের নির্ধারিত দিন উৎসবের দিন, আর সেদিন লোকজন জমায়েত হবে বেলা এক প্রহরের সময়।’(২০:৫৭-৫৯)
ফেরাউন বলল, ‘তোমরা (যোগানদাররা) আমার কাছে ঝানু যাদুকরদেরকে নিয়ে এস।’(১০:৭৯) তারপর ফেরাউন চলে গেল। (২০:৬০)

সমাপ্ত।
ছবি: biblebios, workersforjesus, mimaryvee.blogspot.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন