pytheya.blogspot.com Webutation

১৩ মার্চ, ২০১২

Urwah: ওয়ারওয়ার মৃত্যু ও তায়েফীদের ইসলামে দীক্ষা।


যে তায়েফবাসী তাদের মধ্যে থেকে অপমান ও অত্যাচার করে মুহম্মদকে একসময় তাড়িয়ে দিয়েছিল তাদের নেতা ওয়ারওয়া (Urwah), ওয়ারওয়া ইবনে মাসুদ হুদাইবিয়ার সন্ধির পর কুরাইশদের দূত হিসেবে মদিনায় গিয়েছিলেন। তিনি মুহম্মদের কথাবার্তা ও তার দয়ায় মুগ্ধ হয়ে তার দায়িত্ব পালনের অল্পকাল পরে (তায়েফ অবরোধ শেষে মুহম্মদ যখন প্রত্যাবর্তণ করেছিলেন, তখন তিনি তার পিছনে পিছনে মদিনায় এসেছিলেন) মুহম্মদের কাছে এসে ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। বিপদ সম্পর্কে মুহম্মদের বারবার হুসিয়ারী সত্ত্বেও তিনি তার শহরের ধর্মান্ধতার মধ্যে ছুটে গেলেন এবং তার পৌত্তলিকতা বর্জনের কথা ঘোষণা করলেন ও ইসলাম ধর্ম প্রদত্ত কল্যাণে শরীক হবার জন্যে স্বগোত্রীয়দের আহবান জানালেন।

তায়েফ
অতঃপর পরদিন সকালে ওয়ারওয়া পুনরায় তার স্বগোত্রীয়দের প্রতি ভাষণ দিলেন। তার ভাষণ দেবতা উজ্জার পুরোহিত ও উপাসকদের মধ্যে উন্মত্ততা সৃষ্টি করল এবং তারা তাকে প্রস্তর নিক্ষেপে হত্যা করে ফেলল। মৃত্যুকালে ওয়ারওয়া বলে গেলেন যে, তিনি তার জাতির কল্যাণের জন্যে তার প্রভুর সমীপে তার রক্ত উৎসর্গ করলেন। তিনি আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন এবং অসিয়ত করে গেলেন যে, হুনায়েনের যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের কবরের পাশে যেন তাকে কবর দেয়া হয়।

জীবিত অবস্থায় ওয়ারওয়ার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও মৃত্যুকালে তিনি যা বলেছিলেন তার প্রভাব তার জাতির উপর প্রচন্ড হল। হত্যাকারীরা আকস্মিক অনুশোচনায় বিদ্ধ হয়ে ক্ষমা ও ইসলাম গ্রহণের জন্যে অনুমতি চেয়ে মুহম্মদের কাছে প্রতিনিধিদল প্রেরণ করল। এই প্রতিনিধিরা অবশ্য তাদের মূর্ত্তিগুলোর জন্যে কিছুটা সময় প্রার্থনা করেছিল।

তায়েফ
এই প্রতিনিধিবৃন্দের মসজিদে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এতে কিছু সাহাবী আপত্তি তুলেছিলেন-‘ইয়া রসূলুল্লাহ! এরা তো অপবিত্র।’
মুহম্মদ বলেছিলেন, ‘মসজিদের মাটি এদের অপবিত্রতায় প্রভাবিত হবে না।’
প্রথমে দু‘বৎসর, পরে এক বৎসর, পরে ছয় মাস; কিন্তু তায়েফবাসীদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হল না। শেষ আবেদনে তারা একমাস সময়ের জন্যে যুক্তি দেখাল, যা মঞ্জুর হবে বলে তারা আশা করেছিল। কিন্তু এবার মুহম্মদ ছিলেন অনমনীয়। তিনি বললেন, ‘ইসলাম ও মূর্ত্তিপূজা একসঙ্গে অবস্থান করতে পারে না।’
এতে তারা বলল, ‘তবে আমাদেরকে প্রত্যাহিক প্রার্থনা বা নামাজ কায়েম করা থেকে অব্যহতি দেওয়া হোক।’
মুহম্মদ উত্তর দিলেন, ‘প্রার্থনা ছাড়া ধর্ম অর্থহীন।’ তখন অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তারা সব প্রয়োজনীয় বিষয় মেনে নিল।

দেবী আল লাত।
তায়েফবাসীদেরকে তাদের নিজ হাতে মূর্ত্তিভাঙ্গা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। মুহম্মদের নির্দেশে হার্বের পুত্র আবু সুফিয়ান, বিখ্যাত মুয়াবিয়ার পিতা, যাকে নামমাত্র বিশ্বাসী (মুলাফাতুল কুলুব) হিসেবে নিন্দিত করা হয়েছে, তিনি এবং ওয়ারওয়ার ভাগ্নে মুগিরা বিন শোবা -এই দু‘জন তায়েফীদের দেবী- আল-লাতের মূর্ত্তি ভাঙ্গার কাজে এলেন।

ইসলামপূর্বকাল থেকেই আরবে অত্যন্ত সম্মানিত দেবীর আসনে ছিলেন আল-লাত, আল-মানাত ও আল-উজ্জা- যারা ‘আল্লাহর দুহিতা’ (বানাতাল্লাহ) হিসেবেই আরববাসীর কাছে অধিক পরিচিত ছিল। আল লাত (al-Lat) -তায়েফের সকিফ গোত্রের, আল উজ্জা (al-Uzza)-কুরাইশ গোত্রের এবং আল মানাত (al-Manat)-বনি হেলালদের দেবতা ছিল। আরবি ভাষাভাষী নাবাতিয়েনরা আল-লাতকে যুদ্ধের দেবী হিসেবে পূজা করত। আল-উজ্জা ছিলেন আরবের প্রেমের দেবী, পশু ও মানুষ বলি দেয়া তার আরাধনার অঙ্গবিশেষ। আর আল-মানাত ছিলেন ভাগ্যের দেবী।


আরবদের কাছে আল-লাত চন্দ্রের, আল-মানাত শুক্র গ্রহের এবং আল-উজ্জা ছিলেন লব্ধক (সাইরিয়াস) নক্ষত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবেও বিবেচিত হত। কা’বাগৃহে তাওয়াফ করতে তাই পৌত্তলিক কুরাইশগণ এইসব দেব-দেবীদের নাম উচ্চারণ করত। মক্কা থেকে চল্লিশ মাইল দূরে দক্ষিণ-পূর্বে তায়েফে আল-লাত দেবীর পূজা হত; মক্কার পূর্বদিকে নাখলাতে আল-উজ্জা দেবীর এবং মক্কার অনতিদূরে মদিনার পথে খুদাইল নামক জায়গায় মানাত দেবীর পূজা চলত। 


তায়েফে পৌঁছে আবু সুফিয়ান আর অগ্রসর না হলে মুগীরা তার আত্মীয়র্গ নিয়ে দেবী লাতের কাছে গেলেন এবং নিজে কুঠার হাতে মূর্ত্তিতে চড়লেন। আর তার সঙ্গীরা তাকে ঘিরে থাকল যেন ওয়ারওয়ার মত কেউ তাকে হত্যা করে না ফেলে। এ সময় শফিক গোত্রের নারীরা, নিদারূণ সর্বনাশে যেভাবে ছুটে আসে, তেমনি করে এলোকেশে ছুটে এল। তারা তাদের এতদিনের রক্ষক দেবীকে জড়িয়ে বিলাপ শুরু করে দিল। তারা চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল- 'ওহ!, ওরে আমাদের রক্ষাকারী দেবীর জন্যে কাঁদো। কূলাঙ্গাররা তাকে পরিত্যাগ করেছে, তারা তো তরবারী হাতে ধরার যোগ্য না।'

তায়েফীদের হতাশা, দুঃখ ও উচ্চনাদী চিৎকারের মধ্যে মুগীরা দেবী আল-তাগুদ (al-Taghiyyah) বা আল-লাতের মস্তক কূঠারের আঘাতে বিচ্ছিন্ন করে ফেললেন। তারপর দেবীর শরীরে জড়ানো যে অলংকার (যা মূলত: সোনা ও মূল্যবান পাথর দিয়ে তৈরী) ছিল, তা সংগ্রহ করে নিলেন। পরবর্তীতে এই অলংকার মুহম্মদের নির্দেশে ওয়ারওয়া ও আল আসওয়াদের রক্ত ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হয়েছিল।


সমাপ্ত।


ছবি: Wikipedia, arabnews, forums.popphoto.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন