pytheya.blogspot.com Webutation

২ মার্চ, ২০১২

Abd-Allah ibn Ubayy: কুরাইশদের পত্র- উবাই এর ভূমিকা এবং অত:পর।


মদিনা নগরী মক্কার উত্তরে হাঁটা পথে প্রায় এগার দিনের দুরত্বে অবস্থিত। এই শহরটি ছিল সম্পূর্ণরূপে অরক্ষিত। একজন অমালিকা প্রধান ইয়াসরিব এই শহর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। মুহম্মদের আগমনের পূর্বপর্যন্ত এই শহর প্রতিষ্ঠাতার নামেই পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালে ইয়াসরিব ও তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে অমালিকারা বাস করত। তারা পরপর ইহুদি উপনিবেশিকদের দ্বারা পর্যুদস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ব্যাবিলনীয়, গ্রীক ও রোমান অত্যাচারীদের আগমণের পূর্বে তারা আরবে প্রবেশ করেছিল এবং হিজাজের দক্ষিণ অংশে নিজেদের দখল কায়েমে আনে।

৬০০ সনে আরব ও গোত্রসমূহের আবাস।
এই উপনিবেশিকদের মধ্যে খায়বরে বনি নাজির, ফিদাকে বনি কুরাইজা ও মদিনার নিকটবর্তী বনি কাইনুকা-এই তিনটি গোত্র সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সুরক্ষিত দূর্গে অবস্থান করে তারা প্রতিবেশী আরব গোত্রদের উপর আধিপত্য বিস্তার করে এবং ইয়াসরিবে আওস ও খাজরাজ, এই দু’টি কাহতান গোত্রের উত্থানের পূর্বপর্যন্ত তারা এই আধিপত্য বজায় রাখে। এই দু’টি গোত্র প্রথমে ইহুদিদের কাছে বিশেষ ধরণের বশ্যতা স্বীকার করলেও পরে তাদেরকে আশ্রিত করে রাখতে সমর্থ হয়।

বহুপূর্ব থেকেই আওস ও খাজরাজ গোত্রের মধ্যে কোন্দল চলে আসছিল। মাঝে মাঝে যুদ্ধও বাঁধত। আওস গোত্রের প্রতিবেশী ও মিত্র ছিল বনি কুরাইজা এবং খাজরাজের বনি নাজির। 

আওস ও খাজরাজের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে মিত্রতার ভিত্তিতে বনি কুরাইজা আওসের এবং বনি নাজির খাজরাজের পক্ষ অবলম্বণ করত। বনি কুরাইজাকে হত্যা ও বহিঃস্কারের ব্যাপারে শত্রুপক্ষের মিত্র বনি নাজিরেরও হাত থাকত। তেমনি নাজিরের হত্যা ও বাস্তুভিটা থেকে উৎখাতে শত্রুপক্ষের মিত্র কুরাইজারও হাত থাকত। তবে তাদের একটি আচরণ ছিল অদ্ভূত। ইহুদিদের দু‘দলের মধ্যে কেউ আওস বা খাজরাজের হাতে বন্দী হয়ে গেলে প্রতিপক্ষ দলের ইহুদি স্বীয় মিত্রদের অর্থে বন্দীকে মুক্ত করে দিত। কেউ এর কারণ জিজ্ঞেস করলে বলত-‘কি করব, মিত্রদের সাহায্যে এগিয়ে না আসা লজ্জার ব্যাপার।’

তাদের এই আচরণের নিন্দা করেছে কোরআন এভাবে -যখন আমি তোমাদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিলাম যে, তোমরা পরস্পর খুনোখুনি করবে না এবং নিজদিগকে দেশ থেকে  বহিঃস্কার করবে না, তখন তোমরা তা স্বীকার করেছিলে এবং তোমরা তার স্বাক্ষ্য দিচ্ছিলে। অতঃপর তোমরাই পরস্পর খুনোখুনি করছ এবং তোমাদেরই একদলকে বহিঃস্কার করছ। তাদের বিরুদ্ধে পাপ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ করছ। আর যদি তারাই কারও বন্দী হয়ে তোমাদের কাছে আসে, তবে বিনিময় নিয়ে তাদের মুক্ত করছ। অথচ তাদের বহিঃস্কার করাও তোমাদের জন্যে অবৈধ। তবে কি তোমরা গ্রন্থের কিয়দাংশ বিশ্বাস কর এবং কিয়দাংশ অবিশ্বাস কর? যারা এরূপ করে পার্থিব জীবনে দুর্গতি ছাড়া তাদের আর কোনই পথ নেই। কেয়ামতের দিন তাদেরকে কঠোরতম শাস্তির দিকে পৌঁছে দেয়া হবে। আল্লাহ তোমাদের কাজ-কর্ম সম্পর্কে বে-খবর নন।(২:৮৪-৮৫) । 

শেষ আয়াতে যে পার্থিব জীবনে দূর্গতির কথা উল্লেখ রয়েছে তা তারা মুহম্মদের আমলেই লাভ করেছিল। মুসলমানদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিভঙ্গের অপরাধে বনি কুরাইজা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত ও বন্দী হয়েছে এবং বনি নাজিরকে চরম অপমান ও লাঞ্ছনার সাথে সিরিয়ায় নির্বাসিত করা হয়েছিল । 

এই বনি নাজির ও বনি কুরাইজার একটি মোকদ্দমা মুহম্মদের দরবারে একসময় উত্থাপিত হয়। বনি নাজির গায়ের জোরে বনি কুরাইজাকে বাধ্য করে রেখেছিল যে, বনি নাজিরের কোন ব্যক্তি যদি তাদের কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে, তবে প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ নেয়া হবে এবং রক্ত বিনিময়ও গ্রহণ করা হবে। পক্ষান্তরে যদি বনি নাজিরের কোন ব্যক্তি বনি কুরাইজার কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে, তবে কেসাস নয়, রক্ত বিনিময় দেয়া হবে তবে তা বনি নাজিরের রক্ত বিনিময়ের অর্ধেক। 

এরই পরিপ্রেক্ষিতে নিম্নের আয়াত নাযিল হল- তারা যদি তোমার কাছে আসে, তবে হয় তাদের মধ্যে ফয়সালা করে দিও, না হয় তাদের ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাক। তবে তাদের সাধ্য নেই যে, তোমার বিন্দুমাত্র ক্ষতি করতে পারে। যদি ফয়সালা কর, তবে ন্যায়ভাবে ফয়সালা করবে। নিশ্চয় আল্লাহ সুবিচারকারীদের ভালবাসেন। 
তারা তোমাকে কেমন করে বিচারক নিয়োগ করবে, অথচ তাদের কাছে তাওরাত রয়েছে। তাতে আল্লাহর নির্দেশ আছে। অতঃপর এরা পিছনদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। তারা কখনও বিশ্বাসী নয়। 

আমি তাওরাত অবতীর্ণ করেছি। এতে হেদায়েত ও আলো রয়েছে। আল্লাহর আজ্ঞাবহ পয়গম্বর, দরবেশ ও আলেমরা এর মাধ্যমে ইহুদিদেরকে ফয়সালা দিত। কেননা তাদেরকে এই খোদায়ী গ্রন্থের দেখাশোনা করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল এবং তারা এর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত ছিল। 

অতএব তোমরা মানুষকে ভয় কোরও না এবং আমাকে ভয় কর এবং আমার আয়াতসমূহের বিনিময়ে স্বল্পমূল্য গ্রহণ কোরও না।যেসব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই অবিশ্বাসী। আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চক্ষুর বিনিময়ে চক্ষু, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত এবং জখমসমূহের বিনিময়ে সমান জখম। অতঃপর যে ক্ষমা করে, সে গোনাহ থেকে পাক হয়ে যায়। যে সব লোক আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তদানুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।(৫:৪২-৪৫) 

এখন কুরাইশদের পত্রের প্রসঙ্গে আসি। মুসলমান নরনারীরা মদিনায় পৌঁছে শান্তি ও স্বস্তি সহকারে নিজেদের ধর্মকর্ম পালন করছেন, মুহম্মদ তার শিষ্যবর্গকে সঙ্গে করে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা ও আল্লাহর উপাসনায় লিপ্ত রয়েছেন, আর তার ধর্ম মদিনায় প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার লাভ করেছে দেখে এবং সর্বোপরি মুহম্মদ ইহুদি, খ্রীষ্টান ও পৌত্তলিকদের নিয়ে এক সাধারণতন্ত্র গঠন করেছেন শুনে কুরাইশরা ক্ষোভে ও ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে পড়ল। অতঃপর তারা মুহম্মদ ও তার সহচরদের সমূলে বিনাশ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। 

মুহম্মদের আগমনের পূর্বে ধনী ও প্রতিপত্তিশালী আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই (Abd-Allah ibn Ubayy)-কে মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায় নিজেদের অধিপতি করার জন্যে প্রস্তুত হয়েছিল। তার জন্যে শাহী টুপিও তৈরী করা হয়েছিল। কিন্তু মুহম্মদের আগমনের পর সকলেই তার প্রতি আকৃষ্ট হল। ফলে উবাই তার প্রতি ঈর্ষান্বিত ও অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন। তিনি মুহম্মদকে মনে-প্রাণে মেনে নিতে পারলেন না। বরং তাকে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিলেন।

কুরাইশ দলপতিগণ উবাইয়ের নেতৃত্ব খর্বিত হওয়ার খবর জানতে পেরেছিলেন। সুতরাং তারা উবাই ও তার দলস্থ পৌত্তলিকদের কাছে এই পত্র দিলেন- 

‘হে মদিনাবাসী!
(তোমরা আমাদের স্বধর্মাবলম্বী হয়েও) আমাদের সেই পরমশত্রু মুহম্মদকে নিজের দেশে আশ্রয় দিয়েছ। হয় তোমরা যুদ্ধ করে তাকে ধ্বংস করে ফেল, না হয় নিজেদের দেশ হতে তাকে বের করে দাও। আমরা এ বিষয়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞাত যে, যদি এ দু‘টি শর্তের কোন একটি তোমরা অবলম্বন না কর, তাহলে আমরা সমস্ত শক্তি নিয়ে তোমাদেরকে আক্রমণ করব, তোমাদের যুবকদলকে হত্যা করব এবং তোমাদের স্ত্রীলোকদেরকে বাঁদী বানিয়ে নেব।’
আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই ও তার দলস্থ পৌত্তলিকরা কুরাইশদের কাছ থেকে পত্র পাওয়ার পর ইহুদিদের সাথে যোগাযোগ করলেন। আর মদিনার ইহুদিদের মুহম্মদের পক্ষ থেকে দয়া বা উদারতা, কোনটাই পরিতৃপ্ত করত না; তারা মুহম্মদের মাধ্যমে সমগ্র আরবকে ইহুদিবাদে রূপান্তরিত করতে সমর্থ না হওয়ায় এবং তার শরীয়ত তালমুদীয় পুরাণের চেয়ে সরলতর হওয়ায় ক্রোধান্বিত হয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল এবং ইসলামের শত্রুদের পক্ষ অবলম্বন করল। তাদের সমর্থণ পেয়ে আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই সমবেতভাবে মুহম্মদ ও মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে প্রস্তুত হলেন। 

কিন্তু কুরাইশদের প্রেরিত পত্রের কথা মদিনায় জানাজানি হল এবং তাতে ভীষণ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হল। অতঃপর মুহম্মদের কাছে এই সংবাদ পৌঁছিল যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাকে এবং মোহাজিরদেরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করছেন। তিনি এই সংবাদ অবগত হয়ে উবাই এবং তার অনুসারী আওস ও খাজরাজ গোত্রের অন্যান্যদের কাছে গিয়ে বললেন, ‘তোমরা যদি মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাক তাতে যে সকলদিক দিয়ে তোমাদেরই অধিকতর ক্ষতি হবে, তা একবার ভেবে দেখেছ কি? কুরাইশরা যদি আক্রমণ করে, তাহলে তোমাদের যুদ্ধ হবে অত্যাচারী বহিরাগতদের বিরুদ্ধে। কিন্তু এখন তোমরা যা করার জন্যে প্রস্তুত হয়েছ, তাতে, তোমরা জয়যুক্ত হলেও, নিজহাতে নিজেদের পুত্র ও ভ্রাতাদেরকে হত্যা করে নিজেরাই নিজ গোত্রের জনশক্তিকে ধ্বংস করে ফেলবে।’

মুহম্মদের এই যুক্তিপূর্ণ উক্তির প্রভাবে আওস ও খাজরাজ গোত্রের লোকদের মত পরিবর্তনের লক্ষণ দেখে আব্দুল্লাহ আর কিছুই বললেন না। অতঃপর তার সাথে মুহম্মদের একটা সন্ধি চুক্তিও হয়ে গেল। এরফলে মুসলমানদের আক্রমণ করার জন্যে যে সৈন্যদল সংগৃহীত হয়েছিল, তা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল।  

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন