pytheya.blogspot.com Webutation

১২ মার্চ, ২০১২

Muhammad: শেব গিরিসংকটে অবরুদ্ধ জীবন।


আবিসিনিয়া থেকে প্রতিনিধিদের প্রত্যাবর্তন এবং তাদের ব্যর্থতার সংবাদ কুরাইশদের উন্মাদ করে তুলল। অবশেষে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল যে, তারা এক আঘাতেই সমগ্র হাশিম ও মুত্তালিব গোত্রের মুলোৎপাটন করবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে তারা নব্যুয়তের সপ্তম বর্ষে ৬১৬ খ্রীষ্টাব্দের শেষ দিকে হাশিম ও মুত্তালিবের বংশধরদের বিরুদ্ধে একটি সংঘ গঠন করল। তারা একটি দলিল (প্রতিজ্ঞা পত্র) দ্বারা অঙ্গীকারাবদ্ধ হল যে, তাদের সঙ্গে তারা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবে না; তাদের সঙ্গে কোনরূপ পণ্য-দ্রব্যের বেচাকেনা করবে না। যে পর্যন্ত না তারা হত্যা করার জন্যে মুহম্মদ (Muhammad) কে তাদের হাতে সমর্পন করবেন এই প্রতিজ্ঞা পত্রটি ততদিন বলবৎ থাকবে। এটি মুনসুর ইবনে ইকরামা লিখেছিলেন এবং তা সাধারণ্যে প্রচারের জন্যে দেব-দেবীকে স্বাক্ষী করে কা’বার দেয়ালে লটকিয়ে দেয়া হয়েছিল। 

হাশিম ও মুত্তালিব পরিবার এতে সন্ত্রস্ত হলেন এবং এটাকে কোন ভাবী আক্রমণের পূর্বাভাস হিসেবে ধরে নিলেন। তারা শহরের মধ্যে বিক্ষিপ্তভাবে বসবাস না করে এক জায়গায় সমবেত ভাবে বাসকরা নিরাপদ ভাবলেন। সেই অনুসারে তারা শেব গিরি সংকটে আবু তালিবের একটি বাসগৃহকে উপযুক্ত স্থান বিবেচনা করলেন। 

শেব গিরি সংকট। 
এই গিরি সংকটটি মক্কা নগরী থেকে একটি ছোট পাহাড় বা প্রাচীর দ্বারা বিচ্ছিন্ন এবং সেখানে প্রবেশের একটি মাত্র পথ ছিল। আবু লাহাব এই দলে ছিলেন না। তিনি শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন। 

কুরাইশদের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে রক্ষণাত্মক অবস্থায় সর্বপ্রকার অভাব অনটনের মধ্যে এই দুই পরিবার মুহম্মদকে নিয়ে প্রায় তিন বৎসরকাল অতিবাহিত করেছিলেন। যে খাদ্য-দ্রব্য মজুদ করা হয়েছিল তা অচিরেই নিঃশেষ হয়েছিল। শেষদিকে সকলে গাছের পাতা, শুস্ক চর্ম ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারণ করছিলেন। অনাহার ক্লিষ্ট শিশুদের ক্রন্দন বাইরে থেকে শোনা যেত। 

এই অবরোধের সময় কি হয়েছিল তা আমরা কোরআন থেকেও জানতে পারি। ‘আমি তোমাদের ভীতি দ্বারা, ক্ষুধার দ্বারা, ধন-প্রাণ শস্যাদির ক্ষতি দ্বারা একটু পরীক্ষা করব। অপিচ (হে রসূল) তুমি, সেই ধৈর্য্যশীল (কর্মী)দেরকে সুসংবাদ দাও, যারা-যখন তাদের উপর বিপদ আপতিত হয়-তখন বলে থাকে যে, আমরা তো আল্লাহরই সম্পত্তি এবং আমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তন করব। এরাই তারা, যাদের উপর আল্লাহর অশেষ আশীর্বাদ (বর্ষিত হয়) এবং এরাই সৎপথ প্রাপ্ত।’(২:২-৩)

তোমরা কি মনে করেছ যে (এমনই কেবল মুখের কথায়) স্বর্গে গমন করবে? অথচ এখনও তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীদের (নবী ও তার সহচরবর্গের) অবস্থায় উপনীত হওনি। বিপদের উপর বিপদ এবং আঘাতের উপর আঘাত তাদেরকে স্পর্শ করেছিল, (এমন কি তাদের অস্তিত্ব পর্যন্ত সমূলে) প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল।(২:২-১০)

‘আলিফ-লাম-মীম। লোকে কি এ মনে করে নিয়েছে যে, আমরা ঈমান এনেছি এই বললেই বিনা পরীক্ষায় তাদেরকে ছেড়ে দেয়া হবে? (না-কখনই নহে,) তাদের পূর্ববর্তী (মুসলিম) দেরকে আমি পরীক্ষা করেছি, অপিচ আল্লাহ নিশ্চয়ই জেনে নেবেন যে, (মুসলিম হয়েছি-এ উক্তিতে) কারা সত্যবাদী আর মিথ্যাবাদী কারা?(২৯:১-৩)    
গিরি সংকটে মুহম্মদ ও তার আত্মীয়বর্গের নিদারুণ কষ্টের সময়ও কুরাইশরা ছিল নির্বিকার। অতঃপর কোন কোন গোত্র প্রধান তাদের অন্যায় অবরোধের জন্যে লজ্জাবোধ করতে লাগলেন। আমরের পুত্র হিশাম কুরাইশদের এবং হাশিম ও মুত্তালিব পরিবারদ্বয়ের মধ্যে একটা আপোষ রফার চেষ্টা চালাতে লাগলেন। আবু উমাইয়ার পুত্র জোবায়েরও তাকে এই কাজে সমর্থন করলেন। এরপর তারা আবু বখতারী, মোতাইম, জামায়া, কায়েস ও জোহেরকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে এলেন। অতঃপর তারা কুরাইশ দলপতিদের মজলিসে তাদের মনোভাব ও অবস্থান পরিস্কারভাবে উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলেন।

পরদিন প্রাতে সকলে মজলিসে উপস্থিত হলেন এবং জোহের উপস্থিত সকলকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘হে মক্কাবাসীরা! আমরা উদর পূর্ণ করে আহার করব, উত্তম পোষাক পরিধান করব আর বনি হাশেমেরা ধ্বংস হয়ে যাবে এ কেমন বিচার? এখনও কি তোমাদের নৃশংসতা চরিতার্থ হয়নি? তোমাদের যা ইচ্ছে হয় করতে পার, কিন্তু আমি তোমাদের সাথে নেই। এই অমানুষিক অত্যাচারের সমর্থন আমি করব না, আর এই বর্বর প্রতিজ্ঞাপত্র ছিন্ন না করে আমি ক্ষান্ত হব না।’

আবু জেহেল লম্ফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বললেন, ‘কখনই না, এ কখনও হতে পারবে না। মিথ্যেবাদী, এই প্রতিজ্ঞা কখনও নষ্ট করা হবে না।’ 
তার কথা শেষ না হতেই জামায়া উত্তেজিত কন্ঠে বললেন, ‘আসল মিথ্যেবাদী তুমি, জোহের তো সত্যি কথাই বলেছে।’ 
এসময় বখতারী উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘খুবই সঙ্গত কথা আমরা ঐ প্রতিজ্ঞায় সম্মত ছিলাম না; আর এখন তা মানতে আমরা বাধ্য নই।’ 
হিশামও এই সকল বক্তাদের কথা সমর্থন করলেন। আবু জেহেল এসময় ক্রোধান্বিত হয়ে বলে উঠলেন, ‘আজ এটা অন্যায় প্রতিজ্ঞাপত্র বলে কথিত হচ্ছে! অথচ যে রাতে কা’বায় বসে এটা রচনা করা হয়, আবু তালিবও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।’ 

আবু জেহেলের কথা শেষ না হতেই মোতাইম ছুটে গিয়ে প্রতিজ্ঞা পত্রখানা ছিঁড়ে আনলেন, তখন তা পোকায় ক্ষত-বিক্ষত ছিল। এরপর তা ছিঁড়ে টকুরো টুকরো করে ফেলা হল আর সমর্থনকারীরা তরবারী হাতে গিরিসংকটে গমনপূর্বক দু’বৎসর কয়েক মাস যাবৎ অবরুদ্ধ নরনারীদেরকে মুক্ত করে মক্কায় ফিরিয়ে নিয়ে এলেন। পরিবারদ্বয় পুনঃরায় সামাজিক অধিকার ভোগের এবং মক্কায় বাস করার অধিকার প্রাপ্ত হলেন।

যে সময়ে মুহম্মদ তার জ্ঞাতিবর্গসহ শেব গিরিসংকটে অবরুদ্ধ ছিলেন, তখন ইসলামের প্রগতি সাধিত হয়নি। পবিত্র মাসগুলিতে যখন বিবাদ ও রক্তপাত নিষিদ্ধ ছিল তখন তিনি অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতেন এবং তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ঐশীবাণী শোনাবার জন্যে লোকের সন্ধান করতেন, তখন বক্রদৃষ্টিতে আবু লাহাব তার গতিবিধির উপর নজর রাখতেন এবং তিনি কাউকে কিছু বললেই তিনি বলে উঠতেন, ‘সে একজন মিথ্যেবাদী ও একজন সেবীয়। তোমরা জেনে শুনে কেন তার কবলে পড়?’ 

সমাপ্ত।
ছবি: usf.edu

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন