pytheya.blogspot.com Webutation

৪ মার্চ, ২০১২

Omar: বিশর ও এক ইহুদির বিবাদ নিস্পত্তির কাহিনী।


বিশর নামের একজন মুনাফেক মুসলমান ছিল। কোন এক ইহুদির সাথে তার জমি সংক্রান্ত বিবাদ বেঁধে গেল। ইহুদি লোকটি বলল, ‘চল, মুহম্মদের কাছে গিয়ে এর মিমাংসা করিয়ে নেই।’

বিশর ইহুদির এই প্রস্তাবে সম্মত হল না। সে বলল, ‘না, বরং চল, আমরা কাব ইবনে আশরাফের কাছে যাই।’

এই কাব ছিল ইহুদিদের একজন নেতা এবং মুহম্মদ ও মুসলমানদের কঠিন শত্রু। কাজেই বাহ্যিক দৃষ্টিতে বিষয়টি ছিল একান্তই বিস্ময়কর যে, ইহুদি নিজেদের নেতাকে বাদ দিয়ে মুহম্মদের মিমাংসাকে পছন্দ করেছিল, অথচ নিজেকে মুসলমান হিসেবে পরিচয়দানকারী বিশর তার স্থলে ইহুদি নেতার মিমাংসা গ্রহণ করেছিল। যদিও বিশর ও ইহুদি উভয়েই জানত যে, মুহম্মদ যে মিমাংসা করবেন তা একান্তই ন্যায়সঙ্গত হবে- কারও পক্ষপাতিত্বের কোন সংশয় নেই। কিন্তু যেহেতু ইহুদিটি ছিল ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত, তাই তার নিজেদের নেতা অপেক্ষা বেশী বিশ্বাস ছিল মুহম্মদের উপর। পক্ষান্তরে বিশর ছিল অন্যায়ের উপর। তাই সে জানত মুহম্মদের মিমাংসা তার বিরুদ্ধে যাবে, যদিও সে মুসলমান হিসেবে পরিচিত।

তারা কাবের কাছে গেল। সে সবশুনে ইহুদিকে প্রস্তাব করল। বিশর তা মানল না। তখন এতদুভয়ের মধ্যে কথা কাটাকাটির পর বিষয়টি মুহম্মদের মাধ্যমে মিমাংসা করিয়ে নেবার সিদ্ধান্ত হল।

তারা ফয়সালার জন্যে মুহম্মদের কাছে এল। মুহম্মদ মামলার বিষয় অনুসন্ধান করলেন। তাতে ইহুদির অধিকার প্রমাণিত হল। এতে তিনি বিশরকে প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ইহুদির পক্ষে তার ফয়সালা দিলেন।

বিশর এই মিমাংসাও মেনে নিতে অসম্মত হল। সে ইহুদিকে নতুন প্রস্তাব দিল, বলল, ‘চল আমরা ওমর ইবনে খাত্তাবের কাছে যাই। তিনি যা মিমাংসা করবেন আমি তা অবশ্যই মেনে নেব।’
বিশরের ধারণা হল ওমর যেহেতু অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠিন। কাজেই তিনি ইহুদির পক্ষে রায় না দিয়ে তার পক্ষেই দেবেন।

তাদের দু‘জনই ওমরের গৃহে হাযির হল। তিনি গৃহেই ছিলেন। ইহুদি লোকটি সমগ্র ঘটনা বিবৃত করার পর শেষে একথা জানাল যে- ‘এই মামলার ফয়সালা রসূলুল্লাহও করেছেন কিন্তু তাতে এই লোকটি সম্মত নয়। ফলে আপনার কাছে এসেছি।’
ওমর বললেন, ‘হে বিশর, ঘটনাটা কি তাই?’
বিশর স্বীকার করল। ওমর বললেন, ‘তাহলে একটু অপেক্ষা কর, আমি এখুনি আসছি।’

ওমর (Omar) দ্রুতপদে গৃহভ্যান্তরে প্রবেশ করলেন এবং খোলা তরবারী হাতে বেরিয়ে এলেন। এ দেখে দু‘জনের মুখই ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ওমর বললেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর রসূলের ফয়সালা মেনে নিতে রাজী নয় তার ফয়সালা এই।’ -এক আঘাতে তিনি মুনাফেক বিশরকে দ্বিখন্ডিত করে ফেললেন।

এই ঘটনা মদিনায় জানাজানি হয়ে গেলে ইহুদিরা মুসলমানদেরকে ধিক্কার দিতে লাগল। তারা বলতে লাগল, ‘তোমরা কেমন মানুষ! যাকে তোমরা রসূল বলে মান্য কর এবং তার অনুসরণ কর বলেও দাবী কর, অথচ তার মিমাংসা সমূহকে স্বীকার কর না! অথচ আমাদের দেখ, যখন আমাদের কৃতপাপের (সামেরীর তৈরী গো-বৎসের পূজা করার) ক্ষমাকল্পে আমাদের প্রতি নির্দেশ এল একে অপরকে হত্যা করার, তখন ঐ ধরণের কঠিন নির্দেশও আমরা পালন করেছি। আর তাতে আমাদের সত্তুর ব্যক্তি নিহত হয়েছিল। এখন আমরা তো দেখছি এই ধরণের নির্দেশ তোমাদের প্রতি এলে তোমরা তো পিঠটান দেবে।’
একজন মুসলমান তাদের একথা শুনতে পেয়ে বলল, ‘ঐ অবস্থা মুনাফেকদের হতে পারে, খাঁটি মুসলমানদের নয়। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদেরকে এমন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন করেননি।’

এদিকে নিহত বিশরের ওয়ারিশরা ওমরের বিরুদ্ধে মুহম্মদের দরবারে হত্যা মামলা দায়ের করল। তাদের বক্তব্য হল-‘ওমর শরিয়ত সিদ্ধ কোন দলিল ছাড়াই একজন মুসলমানকে হত্যা করেছেন। আর একজন মুসলমানকে হত্যা করা গুরুতর অপরাধ।’ এছাড়া তারা বিশরকে খাঁটি মুসলমান প্রমান করতে তার কথা ও কাজের বিভিন্ন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করল।

মুহম্মদও ওমরের মিমাংসার বিরুদ্ধে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে বললেন, ‘আমার ধারণা ছিল না যে, ওমর কোন মুমিনকে হত্যার সাহস করতে পারবে।’

অতঃপর আল্লাহ ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য এবং ইহুদিদের ঐ ধরণের প্রশ্নের উত্তর এবং নিহত ব্যক্তির মুনাফেক হওয়ার কথা প্রকাশ করে ওমরকে হত্যার অপরাধ থেকে মুক্ত করে দিলেন।

এ সংক্রান্ত কোরআনের আয়াতসমূহ- তারা বলে, আমরা আল্লাহ ও রসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি এবং আনুগত্য করি; কিন্তু অতঃপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তারা বিশ্বাসী নয়। তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে যখন তাদেরকে আল্লাহ ও রসূলের দিকে আহবান করা হয় তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়। সত্য তাদের স্বপক্ষে হলে তারা বিনীতভাবে রসূলের কাছে ছুটে আসে। তাদের অন্তরে কি রোগ আছে, না তারা ধোঁকায় পড়ে আছে; না তারা ভয় করে যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূল অবিচার করবেন? বরং তারাই তো অবিচারকারী। মুমিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ ও তাঁর রসূরের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মান্য করলাম। তারাই সফলকাম।(২৪:৪৭-৫১)

হে ঈমানদারেরা! আল্লাহর নির্দেশ মান্য কর, নির্দেশ মান্য কর রসূলের এবং তোমাদের মধ্যে যারা বিচারক তাদের। তারপর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিবাদে জড়িয়ে পড়, তাহলে তা আল্লাহ ও তার রসূলের প্রতি প্রত্যর্পণ কর- যদি তোমরা আল্লাহ ও কেয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাসী হয়ে থাক। আর এটাই কল্যাণকর এবং পরিণতির দিক দিয়ে উত্তম। তুমি কি তাদের দেখনি, যারা দাবী করে যে- ‘যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আমরা সে বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ হয়েছে।’ তারা বিরোধীয় বিষয়কে শয়তানের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা ওকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদেরকে প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়। 

আর যখন তুমি তাদেরকে বলবে, ‘আল্লাহর নির্দেশের দিকে এস-যা তিনি রসূলের প্রতি নাযিল করেছেন।’-তখন তুমি মুনাফেকদের দেখবে ওরা তোমার কাছ থেকে সম্পূর্ণভাবে সরে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় যদি তাদের কৃতকর্মের দরুণ বিপদ আরোপিত হয়, তবে তাতে কি হল! অতঃপর তারা তোমার কাছে আল্লাহর নামে কসম খেয়ে খেয়ে ফিরে আসবে যে, ‘মঙ্গল ও সম্প্রীতি ছাড়া আমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য ছিল না।’

এরা হল সেই সমস্ত লোক যাদের মনের গোপন বিষয় সম্পর্কেও আল্লাহ অবগত। অতএব, তুমি ওদেরকে উপেক্ষা কর এবং ওদেরকে সদুপোদেশ দিয়ে এমন কথা বল যা তাদের জন্যে কল্যাণকর। বস্তুতঃ আমি একমাত্র এ উদ্দেশ্যেই রসূল প্রেরণ করেছি, যাতে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী তাদের আদেশ-নিষেধ মান্য করা হয়। আর সেই সব লোক যখন নিজেদের অনিষ্ট সাধন করেছিল, তখন যদি তোমার কাছে আসত অতঃপর আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থণা করত এবং রসূলও যদি তাদেরকে ক্ষমা করিয়ে দিত, অবশ্যই তারা আল্লাহকে ক্ষমাকারী মেহেরবাণরূপে পেত। অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সেই লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে ন্যায়বিচারক বলে মনে না করে। অতঃপর তোমার মিমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনরকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা হৃষ্ট চিত্তে কবুল করে নেবে।

আর যদি আমি তাদেরকে নির্দেশ দিতাম যে, নিজেদের প্রাণ ধ্বংস করে দাও কিম্বা নিজেদের নগরী ছেড়ে বেরিয়ে যাও, তবে তারা তা করত না; অবশ্য তাদের মধ্যে অল্প কয়েকজন। যদি তারা তাই করে যা তাদের উপদেশ দেয়া হয়, তবে তা অবশ্যই তাদের জন্যে এবং তাদেরকে নিজের ধর্মের উপর সূদৃঢ় রাখার জন্যে তা উত্তম হবে। আর তখন অবশ্যই আমি তাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে মহান সওয়াব দেব।আর তাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করব।(৪:৫৯-৬৮)

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন