pytheya.blogspot.com Webutation

৪ মার্চ, ২০১২

Arabs: আরব জাতির ইতিহাস ও মুহম্মদের জন্ম।

আরবদেশ জগতের বৃহৎ জাতিসমূহ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, ছিল তাদের যুদ্ধ-বিগ্রহ ও শাসন ব্যবস্থার প্রভাব মুক্ত। প্যালেস্টাইন থেকে সুয়েজ খালের দিকে যে পর্বতমালা নেমে গেছে তা আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ প্রান্তসীমা পর্যন্ত লোহিত সাগর বরাবর প্রায় সমান্তরালভাবে চলে গেছে. যা হিজাজ বা পর্বত প্রাচীর হিসেবে অভিহিত। অার ইয়েমেন প্রদেশের সীমারেখা পর্যন্ত এই ভূ-খন্ড এই নামেই পরিচিত।

হিজাজে কোথাও পর্বতমালা সাগরের খুব কাছাকাছি, কোথাও বা উপকূলভাগ থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। সাময়িক বৃষ্টিপাতের ফলে মাঝে মাঝে সবুজ উপত্যকা ও উর্বর মরুদ্যান ছাড়াও এতে রয়েছে দীর্ঘ অনুর্বর, জনবসতিশুণ্য নিম্নভূমি। এই সীমা অতিক্রম করে পূর্বদিকে বিস্তৃত হয়েছে বৃষ্টিহীন নজদ- আরব দেশের উচ্চভূমি-মরুভূমি, গিরিখাদ ও স্থানে স্থানে নয়নাভিরাম আবাদী জমিসহ বিশাল মালভূমি। হিজাজের এই পার্বত্য অঞ্চলে নবী মুহম্মদের জন্মস্থান ও লালনভূমি মক্কা ও মদিনা নগরী অবস্থিত। 


হিজাজের এই বিশাল ভূ-খন্ড মোটামুটি চারটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত। উত্তরে প্রাচীন ইদোমীয় ও মেদিনীয়দের দেশসহ আরব পেট্রিয়া। তারপর হিজাজ প্রদেশের মধ্যে অবস্থিত প্রসিদ্ধ শহর ইয়াসরিব-এই শহর পরবর্তীকালে মদিনা নামে পরিচিত হয়। হিজাজের দক্ষিণে তিহামা প্রদেশ, এখানে মক্কা এবং জেদ্দা বিমান বন্দর অবস্থিত। সর্ব দক্ষিণে আছির, ইয়েমেনের প্রান্তসীমায় শেষ হয়েছে।

 হেজাজের পর্বতমালা।
ইয়েমেন- আরব উপদ্বীপের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তসীমা, পশ্চিমে লোহিত সাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, উত্তরে হিজাজ ও পূর্বে হাদ্রামাউত দ্বারা পরিবেষ্টিত। হাদ্রামাউত ও তার পূর্বের মাহুরা জেলা এর অন্তর্ভূক্ত ছিল। উপদ্বীপের দক্ষিণ পূর্ব কোনে মাহুরার পরে ওমান এবং তার উত্তরে পারস্য উপসাগরের উপর বাহরাইন বা আল-আহসা। তার প্রধান প্রদেশের নাম থেকে এই দেশ হিজর বলেও অভিহিত হয়। 

উচ্চভূমি নজদ বৃহৎ মালভূমি। এ পূর্বদিকে হিজাজের পর্বতসমূহ থেকে আরম্ভ হয়ে পশ্চিম দিকে চলে গেছে এবং মধ্য-আরব ভূমি গঠন করেছে। নজদের উত্তরাংশ সিরিয়ার মরুভূমিতে বিস্তৃত হয়েছে-এখানে আরবের বিভিন্ন গোত্র স্বাধীন ও দুর্বারভাবে ঘোরাফেরা করে, তাদের পূর্বপুরুষ প্রাচীন অরামীয়দের মত জীবন-যাপন করে। উত্তর-পূর্ব অংশ হল ইরাকের মরুভূমি, তা ইউফ্রেটিসের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত কলদীয়র উর্বর ভূ-খন্ডে গিয়ে শেষ হয়েছে এবং আরব দেশের আবাদী অঞ্চলকে পৃথক করেছে। 

পূর্বদিকে নজদের আরবরা নাফুদ দ্বারা আল-আহসা থেকে পৃথকীকৃত। দক্ষিণের দিকে দাহনার বিশাল মরুভূমি তা হাদ্রামাউত ও মাহুরা থেকে নজদকে পৃথক করেছে। এই বিরাট ভূ-খন্ড বেদুইন বা মরুবাসী ও শহরবাসী এই দু’স্থানীয় শ্রেণীর অধিবাসী দ্বারা অধ্যুষিত। বেদুইনদের নিজ গোত্রের উপর অবিচল ভক্তি এবং নিজস্ব আত্মসম্মানবোধ থাকলেও তারা খুবই হটকারী, মনুষ্য জীবনের প্রতি অবজ্ঞাশীল এবং প্রতিহিংসা পরায়ণ। বেদুইন ও শহরবাসীর মধ্যে পার্থক্য যাই থাকুক মূলতঃ তারা সবাই মরুসন্তান এবং তারা গোত্র ও জাতিতে ভিন্ন। এই ভিন্নতার প্রধান কারণ তাদের উৎপত্তির বিভিন্নতা। বিভিন্ন বংশের লোক বিভিন্ন সময়ে এই উপদ্বীপে বাস করেছে। অনেক বংশই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু তাদের দুস্কৃতি বা তাদের পরাক্রম পরবর্তী বংশধরদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে এবং এই ঐতিহ্যই জাতিসমূহের ইতিহাস গঠন করেছে। 

দাহনার মরুভূমি (স্যাটেলাইট ভিউ)।
আরব উপদ্বীপে যারা বাস করত তাদেরকে তিনটি প্রধান উপদলে ভাগ করা যায়।
 
আরাবুল বায়দা: এরা হল ধ্বংসপ্রাপ্ত আরব আধিবাসী, এদের অন্তর্ভূক্ত হল হেমিটিক উপনিবেশসমূহ (কুশাইটরা)-তারা উপনিবেশিকতার ক্ষেত্রে সেমিটিকদের পূর্ববর্তী ছিল, এমন কি সিরিয়া, ফিনিসিয়া ও অন্যন্য অঞ্চলের আরামিয়ান জনগণের মত। 

আরাবুল আরিবা বা মুত্বারিবা: এরা হল মূল আরব অধিবাসী-প্রকৃত সেমিটিকরা, যাদেরকে খাতান বা খোকতান থেকে এসেছে বলে ধরা হয় এবং এরা দক্ষিণে অগ্রসর হওয়ার সময় আদিম অধিবাসীদের ধ্বংস করেছিল। খোকতান বংশোদ্ভূত আরবরা প্রকৃতিতে যাযাবর; তারা অধ্যুষিত দেশসমূহের আদিম অধিবাসীদের, হেমিটিক আকাশ পূজারীদের উপর প্রভুত্ব বিস্তার করেছিল। তাদের আদি বাসস্থান ছিল সেই এলাকা, যেখান থেকে ইব্রাহিম বংশোদ্ভূত লোকদের আগমন হয়েছিল। 

ইউফ্রেটিস নদী, দক্ষিণ তীরবর্তী ব্যাবিলন বা ইরাক আরাবী নামে বর্তমানে যে জেলা কথিত হয়ে থাকে তার পরিপ্রেক্ষিতে খোকতানের দু’জন প্রত্যক্ষ পূর্বপুরুষের দু’টি অর্থবহ নাম আরফাজাদ, ‘কলদীয়দের সীমান্ত’ এবং এবার-‘(নদীর) অপর তীরবর্তী লোক’ দ্বারা সঠিকভাবে নির্দেশিত হয়ে থাকে।

আরাবুল মুস্তারিবা বা দেশীকৃত আরব : এরা হল ইব্রাহিম বংশোদ্ভূত সেমিটিক। তারা শান্তিপূর্ণ আগন্তক বা সামরিক উপনিবেশিক হিসেবে এই উপদ্বীপে প্রবেশ করেছিল এবং খোকতান বংশোদ্ভূত আরবদের সাথে পারস্পরিক বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে বসতি স্থাপন করেছিল।

আরাবুল আরিবা শ্রেণীর মধ্যে যে বংশগুলি বিশেষ উল্লেখ্যের দাবী রাখে সেগুলি হল-বনি আ’দ, অমালিকা, বনি সামুদ এবং বনি যুরহুম। 

বনি আ’দঃ এরা উৎপত্তির দিক দিয়ে হেমিটিক বংশোদ্ভূত। তারা আরব উপদ্বীপের প্রথম আগন্তক ও উপনিবেশিক। তারা মধ্য আরবে প্রধানভাবে বসতি স্থাপন করেছিল- অঞ্চলটি ইয়েমেন হাদ্রামাউত ও ওমানের সন্নিকটবর্তী। তাদের অস্তিত্বের একসময় তারা শক্তিশালী ও বিজেতা জাতিতে পরিণত হয়েছিল। এই বংশেরই একজন নৃপতি ছিলেন শাদ্দাদ।

শাদ্দাদ। এই যাযাবর অভিজেতা ও তার জাতি আল্লাহর গজবে নিপতিত হয়েছিল। অল্প সংখ্যক যারা রক্ষা পেয়েছিল তারাই দ্বিতীয় আ‘দ জাতি। এরা পরবর্তীতে থেবাইড ও ইথোপিয়া বা কুসাইট প্রতিবেশীদের যুগ্ম সহযোগিতায় দক্ষিণ দিকে চুড়ান্তভাবে বহিস্কৃত হয়েছিল। একসময় তাদের অবশিষ্টের একাংশ আরব উপদ্বীপে গমন করে এবং সেখানে (ইয়েমেনে) যথেষ্ট সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল এবং ক্রমে তারা খোকতান প্রবাহের মধ্যে মিশে গিয়েছিল। 

বনি অমালিকা: এরা ছিল অরামীয় বংশোদ্ভূত যারা প্রাথমিক অ্যাসিরীয় নৃপতিদের দ্বারা বিতাড়িত হয়ে আরবে প্রবেশ করেছিল এবং ক্রমে ইয়েমেন, হিজাজ, প্যালেষ্টাইন ও সিরিয়ায় বিস্তৃত হয়েছিল। তারা মিসরে প্রবেশ করেছিল এবং বেশ কয়েকজন ফেরাউন তাদের মধ্যে থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন। হিজাজের অমালিকারা বনি কাহতানদের একটি শাখা বনি যুরহুমদের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত বা বিতাড়িত হয়েছিল। বনি যুরহুম মূলতঃ দক্ষিণ আরবে বসতি স্থাপন করেছিল এবং পরবর্তীকালে উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে অমালিকাদের পর্যুদস্ত করেছিল। 

সামুদদের বাসগৃহ।
বনি সামুদ: এরা আ’দদের মত কুশাইট বা হেমিটিক বংশের অন্তর্ভূক্ত। তারা প্রথমে ইদম সীমান্ত এবং পরে আরব পেট্রিয়ার পূর্বে অবস্থিত হিজাজ ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী হিজর নামক প্রদেশে বসতি স্থাপন করেছিল। তারা ছিল গুহাবাসী, পাহাড়ের পার্শ¦ কেটে বাড়ী তৈরী করত। সিরিয়া এবং নজদ বা হিজাজের মধ্যে বাণিজ্যের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সামুদরা একসময় সমৃদ্ধির চুড়ান্ত পর্যায়ে উন্নীত হয়েছিল। অতঃপর একসময় তারা সিরিয়া ও আরবে অভিযান চালনাকারী চেদরলাওমার (খুজার আল-আহমার) কর্তৃক অভিযানের সময় বহুলাংশে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। এর পরবর্তীতে তাদের উপর ঐশী গজব নিপতিত হয়েছিল। এই প্রাচীন গুহাবাসী তাদের শক্ত বাসস্থানকে ঐশী গজব থেকে নিরাপদ বলে ভাবত। কিন্তু ঐশী গজবের সময় পাথুরে বাসস্থান তাদের কোন কাজে আসেনি। তাদের অধিকাংশই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। 

ঐশী গজবের পরে জীবিত বনি সামুদরা ইলামাইটিক উপসাগরের উত্তরে সোর পর্বতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল এবং সেখানে তারা ইসহাক ও ইয়াকুবের সময়ে বাস করত, কিন্তু তারা শীঘ্রই তিরোহিত হয়েছিল, নিঃসন্দেহে প্রতিবেশী বংশসমূহের মধ্যে মিশে গিয়েছিল এবং তাদের স্থান অধিকার করেছিল ইদোমবাসীরা যারা কিছুকালের জন্যে সোরপর্বত অধিকার করেছিল। এই ইদোমবাসীদের উত্তরাধিকার লাভ করেছিল সেই আরবরা, যারা বনি কাহতান কর্তৃক ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত হয়েছিল।

বনি যুরহুম: এরা আরাবুল আরিবা শ্রেনীর অন্তর্ভূক্ত এবং তারা হিজাজে অমালিকা বংশকে পরাভূত ও স্থানচ্যূত করেছিল। এই যুরহুমদের একটি শাখা সুপ্রাচীন আ’দদের সমসাময়িক এবং তারা কুশাইট শ্রেনীর অন্তর্ভূক্ত। অন্যটি কাহতানের বংশধর যারা এক ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় ইয়েমেনের উপত্যকা থেকে বেরিয়ে পড়ে এবং হিজাজের অমালিকাদের বিতাড়িত করে সেখানে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে। এদের আগমন এমন সময়ে হয়েছিল যখন ইসমাইলীয় আরবরা বনি অমালিকাদের মধ্যে প্রাধান্য অর্জন করেছিল- যেখানে বহুদিন পূর্বে তারা বসতি স্থাপন করেছিল। ইসমাইলীরা আক্রমণকারীদের সাথে সম্প্রীতির সম্পর্ক স্থাপন করেছিল এবং একসময় পাশাপাশি বাস করত। ইসমাইলের বংশধরদের অগ্রসরমান প্রবাহের সামনে যুরহুম গোত্রের লোকেরা উপত্যকায় তাদের শক্তি হারাচ্ছিল এবং এক শতাব্দী পার হতে না হতেই হিজাজ ও তিহামা, ইব্রাহিমীয় আরবদের করতলগত হল। 

এই সকল বংশ ছাড়াও এ অঞ্চলে তাসম, যাদিস ও অন্যান্য কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোত্র ছিল। তারা উল্লেখযোগ্য কোন ভূমিকা রাখেনি।

আরাবুল মুস্তারিবা, ইবারের পুত্র কাহতান থেকে উদ্ভূত গোত্রসমূহ। তারা প্রধানতঃ ইয়েমেনে কেন্দ্রীভূত হয়েছিল। তাদের ক্রমঃবিকাশ একসময় ব্যাবিলনীয় নৃপতির আক্রমণে বিপর্যস্ত হলেও পরবর্তীতে তারা প্রাধান্য বিস্তার করেছিল এবং ক্রমে হিজাজ, নজদ, ইরাক ও মেসোপটেমিয়ার মরুভূমিতে বিস্তৃত হয়েছিল। সেখানে তারা তাদের পূর্বসুরী কাহতানদের চুড়ান্তভাবে আত্মসাৎ করেছিল। এই কাহতানের বংশধরেরা উত্তর-পূর্ব দিক হতে আরবে প্রবেশ করেছিল এবং দক্ষিণ দিক পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এখানে তারা কিছুকালের জন্যে কুশ বংশের আ’দ গোত্রের সাথে তাদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের অধীনে বাস করেছিল এবং পরিশেষে নিয়ামক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। কাহতান বংশের লোকেরা শুধু দক্ষিণ আরবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তাদের আবাস ছিল মেসোপটেমিয়াতেও। সেখান থেকে দক্ষিণাভিমুখে ইয়েমেনে গমনকালে তারা সমগ্র আরব উপদ্বীপ পরিভ্রমন করেছিল এবং নিঃসন্দেহে তাদের যাত্রাপথের ধারে বসতির চিহ্ন রেখে গিয়েছিল। ঐসময় আরব উপদ্বীপে যে জনপ্রবাহ চলেছিল তার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবার বা হোবারের পুত্র কাহতান ও ইয়াকতান ভ্রাতৃদ্বয়। কাহতান পুত্র ইয়ারেব তার নামানুসারে তার বংশধরদের এবং সমগ্র দ্বীপটির নামকরণ করেছিলেন।

ইয়ারেবের পুত্র ইয়েশহাদ তার পিতার উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। তিনি রাজ্যের প্রাচীন রাজধানী মা’রেবের প্রতিষ্ঠাতা এবং আব্দুস শামস ওরফে ‘সাবা’র পিতা। সাবার পরবর্তী বংশধর বিভিন্ন কাহতান গোত্রের পূর্বপুরুষ। 

সাবা দুই পুত্র রেখে যান-হিমার ও কুহলান। হিমার তার পিতার উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তার নামানুসারে সাবা রাজবংশ হিমাইরী বলে অভিহিত হয়। হিমার এবং তার ভ্রাতা কুহলানের বংশধরেরা পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে রাজ্যের শাসনকার্য পরিচালনা করেছিলেন। এই বংশেই জন্মেছিলেন জুলকারনাইন ও রানী বিলকিস (-যিনি শলোমনের রাজত্বকালে জেরুজালেমে গিয়েছিলেন)।

আদি ইসমাইলীয় বসতির শুরু যখন ইব্রাহিম কলদীয়া থেকে নির্বাসিত হন এবং আরবে বসবাস আরম্ভ করেন। ব্যাবিলনের নৃপতি নেবু চাঁদ নেজ্জার কর্তৃক পর্যুদস্ত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার পূর্বপর্যন্ত যুরহুম গোত্রসমূহ, ইসমাইলের বংশধররা হিজাজে বিস্তারলাভ করেছিল ও সমৃদ্ধশালী হয়েছিল। 

মক্কা নগরীর পত্তন আরব উপদ্বীপে ইব্রাহিমের বংশধরদের প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক। যুরহুম বংশের প্রধান মেগহাস-বিন-আমরের কন্যা সাঈদাকে মুস্তারিবা আরবদের প্রতিষ্ঠাতা ইসমাইলের সাথে বিবাহ দেয়া হয়েছিল। এই ইসমাইল মক্কা নগরীর প্রতিষ্ঠাতা। প্রায় একই সময়ে কা’বাগৃহ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই কা’বাগৃহের জন্যেই মক্কা আরবের অন্যান্য নগরীর উপর প্রাধান্য বিস্তার করে।

গোত্রসমূহের বিশুদ্ধ পিতা ইব্রাহিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কা’বাগৃহ জাতির সর্বাপেক্ষা পবিত্র এবাদতখানা হিসেবে সমাদৃত ছিল। এই পবিত্র গৃহে আকিক পাথরে নির্মিত তিন’শ ষাটটি মূর্ত্তি; দু’টি গজল, স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত দ্রুতগামী মৃগ, ইব্রাহিম ও তদীয় পুত্রের প্রতিমূর্ত্তি শোভিত ছিল। এখানে প্রত্যেক বৎসর আদমের সময়ে স্বর্গ থেকে পতিত কাল পাথর ‘হজরে আসওয়াদ’ চুম্বন করতে এবং নগ্ন অবস্থায় কা’বাগৃহ সাতবার প্রদক্ষিণ করতে বিভিন্ন গোত্রের লোক আগমন করত। এ কারণে মক্কা শুধু আরবদের ধর্মীয় যোগাযোগের কেন্দ্র ছিল না, বাণিজ্যিক কর্মকান্ডেরও কেন্দ্র ছিল। 

জাবল আল নূর থেকে দৃশ্যমান মক্কা নগরী, বর্তমানে।
মক্কা বাণিজ্যিক রাজপথে অধিষ্ঠিত হওয়ায় প্রতিবেশী দেশসমূহ থেকে সম্পদ ও সংস্কৃতি সংগ্রহ করতে সমর্থ হয়েছিল। অবস্থানের অপরিহার্যতার ফলে হিজাজের আরবরা বিশ্বের জাতি সমূহের পরিবাহক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। 

মক্কা বাণিজ্যিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র ছিল। ফলে প্রাচ্যের অন্যান্য জাতিসমূহ থেকে আরবরা সবসময়ে স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত হয়েছিল। মক্কা থেকে কারাভার যাত্রা শুরু হত। তারা ইয়েমেন ও ভারতের পণ্যসম্ভার বাইজান্টাইন রাজ্যসমূহ ও পারস্যে নিয়ে যেত এবং সিরিয়া থেকে পারস্যের সিল্ক ও অন্যান্য দ্রব্য আমদানী করত। বাণিজ্যিক দ্রব্য ছাড়াও অনেক কিছুই এই আমদানী তালিকায় থাকত। এসব কারাভার সাথে এসেছিল বিলাসী জীবনের অভ্যাস ও পাপ। সিরিয়া ও ইরাক থেকে আমদানীকৃত গ্রীক ও পারস্যিক দাসীরা তাদের নৃত্যগীতের মাধ্যমে ধনীদের অলস মূহুর্তগুলিকে আনন্দে ভরে দিত কিংবা তাদের পাপের ইন্ধন যোগাত। এসব জাতির ইন্দ্রিয়পরায়ণতাকে উদ্দীপ্ত করত, কেউই আগামী দিনের কথা ভাবত না। 

আরবরা, বিশেষতঃ মক্কাবাসীরা মদ্যপান, জুয়া ও সঙ্গীতের প্রতি গভীরভাবে আসক্ত ছিল। যে সকল দাসী-রমনী নৃত্যগীত করত তাদেরকে কীয়ান বলা হত। তারা ছিল চরম নীতিহীন। তথাপি তারা সর্বোচ্চ সম্মানে অধিষ্ঠিত ছিল এবং বড় বড় দলপতিরা তাদের প্রতি প্রণয় নিবেদন করত। বহুবিবাহ অবাধে অনুশীলিত হত। মাতা ছাড়া অন্য বিধবা মৃত ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হত এবং পুত্রের উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তিতে পর্যবসিত হত। নারী ও শিশু বিক্রয়ের মত নিষ্ঠুর ও অমানবিক ব্যবসা ছিল সার্বজনীন। 

পরপর অ্যাসিরীয়, গ্রীক ও রোমকদের দ্বারা জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে ইহুদিরা আরবদের মধ্যে তাদের নিরাপত্তা ও আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু তারা তাদের জন্মভূমি থেকে ধর্ম বিশ্বাসের সাথে সংঘাতের সেই সুতীব্র মনোভাব বহন করে এনেছিল যা তাদের অধিকাংশ দুর্গতির মূলে ছিল।

যাহোক, তারা আরবে পর্যাপ্ত সংখ্যক লোককে ধর্মান্তরিত করতে সমর্থ হয়েছিল। মুহম্মদের সময়ে ইয়েমেনে কুহলানের পুত্র, হিমাইরার ও কিন্দার বংশধরদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ মূসার শরীয়ত পালন করত। খায়বর ও ইয়াসরিবে ইসমাইলী বংশোদ্ভূত বনি কুরাইজা ও বনি নাজির গোত্রও মূসার শরীয়ত পালন করত কিন্তু বহুপূর্ব থেকেই তারা আরবদের মত স্বদেশী হয়ে গিয়েছিল। নেস্তোরিয়ান ও জ্যাকোবাইট খ্রীষ্টানরাও আরবে উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। ঈসার শরীয়ত মেসোপটেমিয়ায় প্রতিষ্ঠিত তাগলিবাইত ও বাহরাইনে বসতি স্থাপনকারী বনি আব্দুল কায়েস গোত্রসমূহের বিভিন্ন শাখার মধ্যে প্রবেশ করতে শুরু করেছিল এবং নযরানে-বনি হারিস, বিন কাব-ইরাকে, বনি ইবাদ- সিরিয়ার গানাসাইড ও কতিপয় খুজাইত পরিবারে এবং লুমাতুল জান্দালে, সাকোনী-বনি কালেবদের মধ্যে সমৃদ্ধিশালী হয়েছিল। যে সমস্ত গোত্র প্যালেষ্টাইন ও মিসরের মধ্যবর্তী মরুভূমিতে ঘুরে বেড়াত তাদের কিছুও ছিল ঈসার শরীয়তের অনুসারী। 

মক্কা নগরী যোগাযোগ ও অবস্থান- উভয়দিক থেকে আরব জনপদসমূহের মধ্যে প্রভূত গুরুত্ব ও খ্যাতির অধিকারী ছিল। উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত ঢালু উপত্যকার উপর অবস্থিত এই শহর পশ্চিমে পর্বতশ্রেণী ও পূর্বে উচ্চ গ্রানাইট পাহাড় দ্বারা বেষ্টিত। কেন্দ্রস্থলে প্রাঙ্গনমুখী গণমিলনায়তনসহ কা’বাগৃহ, নিয়মিত পাকা রাস্তাসমূহ, সুরক্ষিত গৃহসমূহ নিয়ে শহরটি সমৃদ্ধি ও শক্তির কেন্দ্র ছিল। 

কা’বাগৃহের তত্ত্বাবধানের ভার মূলতঃ ইসমাইলের বংশধরদের উপর ন্যস্ত ছিল; বাবিলীয়দের আক্রমণের ফলে তা যুরহুম গোত্রের লোকদের হাতে চলে যায় এবং তারা পার্থিব ও ধর্মীয় ক্ষমতার সমন্বয়ে মালিক উপাধি ধারণ করে। 

কা‘বা গৃহের অভ্যন্তরে একটি গর্ত বা কূপ ছিল। এর নাম ছিল খাজিনা। কা‘বার হাদিয়া স্বরূপ যেসব মূল্যবান সামগ্রী আসত সেগুলি এই কূপে সংরক্ষিত রাখা হত। এতে দু‘টি স্বর্ণের হরিণ, তরবারী, বর্ম ও অন্যান্য বহুমূল্যবান অলঙ্কার সংরক্ষিত ছিল। যুরহুম গোত্রের এক প্রধান- ওমর বিন হারেস সংরক্ষিত মূল্যবান সম্পদ লুন্ঠিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সেগুলি কোন এক রাতের আঁধারে জমজম কূপের কাছে নিয়ে যান। জমজম কূপটি ঐসময় শুকিয়ে গিয়েছিল। ওমর কূপটি খনন করে সমস্ত সম্পদ সেখানে লুকিয়ে রাখেন। ডি হার্বেলট বলেন-

Zamzam - the renown well, was formed from the source which God made appear in favor of Ismail and Hagar, his mother, whom Abraham drove from his house, and obliged to retire to Arabia. When afterwards the patriarch came to visit his son Ismail, and built the square temple, called Kaba, he bestowed upon him the possession of it and the surrounding area since called Mecca. This place became an object of contest between Ismail's posterity and the Arabian tribe of Jorhamides. The latter, after having possessed themselves of it, were attacked by the former, but before yielding it, they threw the sacred black stone, with the two gazelles of massive gold which an Arabian king had presented to the temple, into the well, and then completely filled it up. 

So it remained until the time of an ancestor of Muhammad, called Abdul Muttalib,- he was admonished by an heavenly voice to clear the well, the situation of which was at the same time indicated to him. This was near the idols Assat and Neilah, which were first to be removed, in spite of their adorers, the Koraishites. The latter, having ceded the well, claimed to share the treasure which Abdal Muttalib had found in it. 


The new contest was. to be decided by Ebn Said, a pious man, who lived on the confines of Syria. Upon the way to him, through desert, when both parties were dying of thirst, a fountain which sprung up beneath the foot of Abdal Muttalib's camel brought about a reconciliation between them; the well was cleared; the treasure found was consecrated to the temple, which in after times gained so much celebrity.-[Herbelot after Khondemir.]

৬০০ খৃষ্টাব্দে আরবের বিভিন্ন গোত্রসমূহ।
খ্রীষ্টপূর্ব তৃতীয় শতকে যুরহুম গোত্রীয়রা বনি খোজা নামীয় একটি কাহতান গোত্রের দ্বারা পর্যুদস্ত হয়। এই বনি খোজারা ইয়েমেন থেকে বেরিয়ে মক্কা ও হিজাজের দক্ষিণাঞ্চলসমূহ অধিকার করে নিয়েছিল। ইতিমধ্যে ইসমাইলী বংশীয়রা যারা বাবিলীয় নৃপতিদের অধীনে ভয়ানকভাবে দুর্দশাগ্রস্থ হয়েছিল তারা ধীরে ধীরে তাদের পূর্বশক্তি ফিরিয়ে এনেছিল এবং হযরত ঈসার জন্মের প্রায় শতাব্দীকাল পূর্বে ইসমাইলের অন্যতম বংশধর আদনান ইসমাইলের মত যুবহুম বংশের এক প্রধানের কন্যাকে বিবাহ করে মক্কায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন। তার পুত্র মা’আদ হিজাজ ও নজদের ইসমাইল বংশোদ্ভূতদের যথার্থ আদিপুরুষ। মা’আদের এক বংশধর ফিহর, গোত্র নাম কুরাইশ তার আবির্ভাবকাল খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতক। এই গোত্রই আরবকে দিয়েছিল তার প্রেরিত পুরুষ ও আইনবেত্তা, নবী মুহম্মদকে।

বনি খোজা গোত্র দু’শতাব্দীরও অধিক কা’বাগৃহ এবং কা’বাগৃহ তাদের যে প্রাধান্য দিয়েছিল তার অধিকার ভোগ করেছিল। শেষ খোজা গোত্রপ্রধান হোলাইলের মৃত্যুতে ফিহরের এক বংশধর কোসাই যিনি হোলাইলের কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন, খোজাদেরকে মক্কার বাইরে তাড়িয়ে দিলেন এবং নিজেই নগরের পার্থিব ও ধর্মীয় সর্বময় ক্ষমতা দখল করলেন। এভাবে তিনি হিজাজের প্রকৃত শাসনকর্তা হলেন।

কোসাই ৩৯৮ সি.ই জন্মগ্রহণ করেছিলেন। অতঃপর পঞ্চম শতাব্দীর মধ্যভাগে মক্কা নগরীর অধিপতির আসনে সমাসীন হয়ে অবিলম্বে সুগঠিত ভিত্তির উপর নগরীর শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিয়োজিত করলেন। 

কুরাইশরা কোসাইপূর্ব কালে কা’বাগৃহ থেকে যথেষ্ট দূরে বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করত। কা’বাগৃহের প্রতি তারা যে আত্মান্ত্যিক পবিত্রতা আরোপ করত তাই তাদেরকে তার সন্নিকটে বাসগৃহ নির্মাণে বাঁধা দিত। অরক্ষিত অবস্থায় জাতীয় উপাসনালয় বিপদের সম্মুখীন- এই সত্য অনুধাবন করে কোসাই তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণের জন্যে চারিদিকে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রেখে দিয়ে কা’বাকে বেষ্টন করে কুরাইশদেরকে ঘরবাড়ী নির্মাণে উদ্বুদ্ধ করলেন। যে সব পরিবারের মধ্যে জমি বন্টন করা হয়েছিল তারা সুরক্ষিত গৃহ নির্মাণ করল। কোসাই নিজের জন্যেও একটা প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। এই প্রাসাদের মূল প্রবেশদ্বার দরজা কা’বাগৃহের প্রাঙ্গনে ছিল। এই প্রাসাদে পরামর্শসভা অনুষ্ঠিত হত- কোসাইয়ের সভাপতিত্বে সরকারী কর্মকান্ড সম্পর্কে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হত। এই সভায় কোসাইয়ের বংশধর ছাড়া চল্লিশ বৎসরের কম বয়সের কোন ব্যক্তি অংশগ্রহণ করতে পারত না। 

কোসাই নিজে ধর্মীয়, বেসামরিক ও রাজনৈতিক কার্যাবলী পরিচালনা করতেন। তার প্রতিপত্তি কুরাইশ বংশের গৌরব বৃদ্ধি করেছিল এবং তার সময় থেকেই ইসমাইলের বংশধরদের মধ্যে কুরাইশরা উল্লেখযোগ্য গুরুত্ব অর্জন করেছিল। 

কোসাই ৪৮০ খ্রীষ্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে মৃত্যুবরণ করলে তার জৈষ্ঠ্যপুত্র আব্দুদ্দার উত্তরাধিকারী হলেন। তার মৃত্যুর পর তার পুত্র ও ভ্রাতুস্পুত্রের মধ্যে বিরোধ শুরু হল। আপোষ মিমাংসায় ভ্রাতা আব্দুস মান্নাফের পুত্র, আব্দুস শামসের উপর সিকায়া ও রিফাদার ভার ন্যস্ত হয়। আব্দুস মান্নাফের শামস, হাশিম, নত্তফেল ও মুত্তালিব এই চার পুত্র ছিলেন। আব্দুস শামস তুলনামূলকভাবে দরিদ্র ছিলেন। তাই তিনি তার উপর ন্যস্ত দায়িত্ব গোত্রের মধ্যে প্রতিপত্তিশীল ও ঐশ্বর্যশালী ব্যক্তি তার ভ্রাতা হাশিমের উপর ন্যস্ত করেছিলেন। 

কা’বা।
অধিকাংশ মক্কাবাসীদের মত হাশিমও বাণিজ্য করতেন। তিনি নিয়মিতভাবে মক্কা থেকে দু’টি বাণিজ্য দল পাঠাতেন। একটি শীতকালে ইয়েমেনে, অন্যটি গ্রীষ্মকালে সিরিয়ায়। একবার ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমনকালে হাশিম ইয়াসরিবের বনি নাজ্জার গোত্রের সালমা নাম্নী জনৈকা নারীর পাণি গ্রহণ করেন। কিছুকাল পর সিরিয়ায় এক বাণিজ্য অভিযানকালে তিনি গাজা শহরে (৫১০ খ্রীষ্টাব্দের দিকে) মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তিনি ইয়াসরিববাসী স্ত্রী সালমার গর্ভজাত একমাত্র পুত্র শায়বাকে রেখে যান। তার মৃত্যুতে তার পুত্রের খবর তার ভ্রাতাদের কাছে অজ্ঞাত থেকে যায়। এদিকে তার মৃত্যুতে রিফাদা ও সিকায়া তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা মুত্তালিবের উপর ন্যস্ত হয়। দীর্ঘ আট বৎসর পর মুত্তালিব ভ্রাতুষ্পুত্রের সংবাদ পেয়ে শ্বেতকেশ বিশিষ্ট যুবক শায়বাকে ইয়াসরিব থেকে মক্কায় নিয়ে আসেন। শায়বাকে মুত্তালিবের দাস মনে করে মক্কাবাসীরা তাকে ‘আব্দুল মুত্তালিব’ বলত। এই আব্দুল মুত্তালিবই নবী  মুহম্মদের পিতামহ।

মুত্তালিব ৫২০ খ্রীষ্টাব্দের শেষ দিকে ইয়েমেনের কাজওয়ানে মৃত্যুবরণ করলে আব্দুল মুত্তালিব তার উত্তরাধিকার লাভ করেন। এসময় মক্কার শাসনভার কোসাই পরিবারের নেতৃস্থানীয় সদস্যদের নিয়ে গঠিত পরিষদের উপর ন্যস্ত ছিল। 

আমিনা একটি পুত্রসন্তান প্রসব করলেন।
আব্দুল মুত্তালিব দশটি পুত্র ও ছয়টি কন্যাসন্তান লাভ করেছিলেন। হারিস ছিলেন জৈষ্ঠ্য পুত্র। অন্যান্যরা হলেন আবু লাহাব (আব্দুল উজ্জা), আবু তালিব (আব্দুল মান্নাফ), আমরের কন্যা ফাতিমার গর্ভজাত পুত্ররা হলেন জোবায়ের ও আব্দুল্লাহ এবং কন্যারা হলেন আত্তিকা ও মায়মা, আরওয়া, বার্রা ও বায়জা। নুতাইলার গর্ভজাত পুত্ররা হলেন ধিরার ও আব্বাস। হালার গর্ভজাত পুত্ররা হলেন মুকাইন, গায়জাক, হামজা ও কন্যা সফিয়া। আব্দুল মুত্তালিবের অন্য দু’টি পুত্র অজ্ঞাতনামা, সম্ভবতঃ তারা কোন সন্তান রেখে যাননি। 

জুহরী পরিবারের প্রধান ওয়াহাবের কন্যা আমিনার সাথে আব্দুল্লাহর বিবাহ হয়েছিল। বিবাহের পর প্রথা অনুযায়ী আব্দুল্লাহ তিন দিন শ্বশুরবাড়ী থেকে ফিরে এলেন। এসময় তার বয়স ছিল সতের বৎসর। তার বিবাহের পরবর্তী বৎসর গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহের সমাবেশে পরিপূর্ণ। বৎসরের শুরুতেই ইয়েমেনের শাসক আবরাহা আল-আশরাম কা’বাগৃহ ধ্বংস করার জন্যে জাঁকজমকের সাথে একটি সুসজ্জিত হস্তী পৃষ্ঠে সমাসীন হয়ে এক বিরাট সেনাবাহিনী নিয়ে মক্কার অদূরে চলে এলেন। 

এই ঘটনার অল্পকাল পরে মুহম্মদ মাতৃগর্ভে থাকাকালীন সময়ে আব্দুল্লাহ ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন করেছিলেন। ফেরার পথে তিনি মদিনায় অসুস্থ্য হয়ে মৃত্যুবরণ করলেন। পিতা আব্দুল মুত্তালিব তার অসুখের কথা শুনে পুত্র হারিসকে সেখানে পাঠিয়েছিলেন। হারিস মদিনায় গিয়ে জানতে পারেন তিনি মারা গিয়েছেন। এরপর তাকে মুহম্মদের মামা আদি পুত্রদের অধিকৃত অঞ্চলে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। মৃত্যুর সময় আব্দুল্লাহ একটি উট, একপাল মেষ ও উম্মে আয়মন নাম্নী এক দাসী রেখে গিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নবী মুহম্মদ এগুলির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। 

আব্দুল্লাহর মৃত্যুর অল্পকিছুদিন পরে তার স্ত্রী আমিনা একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। তার নাম রাখা হয় মুহম্মদ। হস্তী বৎসরের ৯ই রবিউল আওয়াল, সোমবার, আবিসিনীয় সৈন্যবাহিনী ধ্বংসের পঞ্চাশ দিনের কিছু পরে, ৫৭১ খ্রীষ্টাব্দের ২০ শে এপ্রিল তারিখে সুবেহ সাদিকের অব্যবহিত পরে নবী মুহম্মদ জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এভাবেই কবুল হল ইব্রাহিমের এই প্রার্থনা-

“আর যখন ইব্রাহিম ও ইসমাইল (কা’বা) গৃহের ভিত্তি স্থাপন করছিল, তখন তারা বলেছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের এ কাজ গ্রহণ কর। তুমি তো সব শোন আর সব জান। 


--হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাদের দু‘জনকে তোমার একান্ত অনুগত কর ও আমাদের বংশধর হতে তোমার অনুগত এক উম্মত (সমাজ) তৈরী কর। আমাদেরকে উপাসনার নিয়ম পদ্ধতি দেখিয়ে দাও, আর আমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হও! তুমি তো অত্যন্ত ক্ষমাপরবশ পরম দয়ালু। 

--হে আমার প্রতিপালক! তাদের মধ্যে থেকে তাদের কাছে ”একজন রসূল প্রেরণ কোরও যে তোমার আয়াত তাদের কাছে আবৃত্তি করবে, তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেবে এবং তাদেরকে পবিত্র করবে। তুমি তো পরাক্রমশালী, তত্ত্বজ্ঞানী।-(২:১২৭-২৯) 


ইব্রাহিম ও ইসমাইলের বংশে প্রথম ও শেষবারের মত একজন নবীর আগমন হল। ঈসা হলেন ’মসিহ’ কেবল ইহুদি গোত্রের জন্য, আর মুহম্মদ ’মসিহ’ জগৎবাসীর জন্যে। আর তাই কোরআনে বলা হয়েছে তিনি জগৎবাসীর জন্যে মূর্ত্ত্য করুণা স্বরূপ”এবং আমি তাকে নিখিল বিশ্বের জন্যে মূর্ত্তিমান করুণাস্বরূপ পঠিয়েছি।”-(২১:১০৭) ঠিক যেমনটা খোদা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন ইব্রাহিমের কাছে- "Behold, in your seed I will bless all the tribes of the earth; and as you have broken in pieces the idols, O Abraham;, even so shall your seed do.""- [Barnabas ch-43]

নবী মুহম্মদের সৃষ্টি এবং জগৎবাসীর জন্যে যে মূর্ত্তিমান করুণাস্বরূপ, তা ব্যাখ্যা করতে ঈসা বলেন, ”Everyone that works, works for an end in which he finds satisfaction. Wherefore ..God, truly because he is perfect, has not need of satisfaction, seeing that he has satisfaction himself. And so, willing to work, he created before all things the soul of his Messenger (Muhammad), for whom he determined to create the whole, in order that the creatures should find joy and blessedness in God, whence his Messenger should take delight in all his creatures, which he has appointed to be his slaves. And wherefore is this, so save because thus he has willed?

Every prophet when he is come has borne to one nation only the mark of the mercy of God. And so their words were not extended save to that people to which they were sent. But the Messenger of God, when he shall come, God shall give to him as it were the seal of his hand, insomuch that he shall carry salvation and mercy to all the nations of the world that shall receive his doctrine. He shall come with power upon the ungodly, and shall destroy idolatry, insomuch that he shall make Satan confounded; ....... [Barnabas ch-43]

The Messenger of God is a splendour that shall give gladness to nearly all that God has made, for he is adorned with the spirit of understanding and of counsel, the spirit of wisdom and might, the spirit of fear and love, the spirit of prudence and temperance, he is adorned with the spirit of charity and mercy, the spirit of justice and Piety, the spirit of gentleness and patience, which he has received from God three times more than he has given to all his creatures.- [Barnabas ch-44]

আর নবী মুহম্মদের জন্ম একেবারে নিভৃত-নিরব ছিল না মাজীবাদী জগতে, যদিও আরবরা এ বিষয়ে অজ্ঞই ছিল বলা যায়। যে রাতে নবী মুহম্মদ জন্মগ্রহণ করেন, ঐ রাতে একের পর এক ঘটনা ঘটে ছিল।the Palace of the Persian King was shaken by an earthquake, so that fourteen of its battlements fell to the ground; the Sacred Fire, which had burned continuously for a thousand years was extinguished and the Lake of the Sawa suddenly dried up; while the chief priest of the Zoroastrians saw in a dream the West of Persia overrun by Arabian camels and horses from across the Tigris.

At these portents Nushirwan was greatly troubled, nor was his trouble dispelled by the oracular answer brought back by his messenger 'Abdu'l-Masih, a Christian Arab of the tribe of Ghassan, from his uncle, the aged Satih, who dwelt on the borders of the Syrian desert. This answer, conveyed in the rhyming rajaz regarded by the Arabian soothsayers (kahana) as the appropriate vehicle of their oracles, was couched in the following strain :

"On a camel 'Abdu'l-Masih 
Hastens toward Satih, 
Who to the verge of the Tomb 
Is already come.
Thee hither doth bring 
The command of the Sasanian King 
Because the Palace hath quaked, 
And the Fire is slaked, 
And the Chief Priest in his dream hath seen 
Camels fierce and lean,
And horse-troops by them led 
Over the Tigris bed,
Through the border marches spread.

"O Abdu'l-Masih! When reading shall abound, 
And the Man of the Staff' [I.e., the Caliph 'Omar, in whose reign (CE 634-644) the conquest of Persia was chiefly effected.] be found 
And the hosts shall seethe in the Vale of Samawa, [A place near Hira, in the neighbourhood of which was fought the fateful battle of Qadisiyya.]
And dried up shall be the Lake of Sawa, 
And the Holy Fire of Persia shall fail, 
No more for Satih shall Syria avail!
Yet to the number of the turrets [I.e., the fourteen turrets or battlements which, in Nushirwan's dream, fell from the palace. Nushirwan's fourteen successors are presumably to be reckoned as follows: (i) Hurmazd IV; (2) Khusraw Parwiz; (3) Shiru'e; (4) Ardashir III; (5) Shahrbaraz; (6) Puran-dukht; (7) Gushnaspdeh? (8) Azarmi-dukht; (9) Khusraw, son of Mihr-Gushnasp; (10) Khurrazadh-Khusraw; (n) Piruz, son of Gushnaspdeh; (12) Farrukhzadh-Khusraw; (13) Hurmazd V; (14) Yazdigird III."]
Your kings and queens shall reign, 
And their empire retain, 
Though that which is to come cometh amain!"-[EG Browne, A literary History of Persia]

বি:দ্র: পাঠক, নবীজীর জন্ম তারিখটি সুন্নী (১২ই রবিউল আওয়াল, সোমবার, ৫৭১ সন ) ও শিয়া (১৭ই রবিউল আওয়াল, সোমবার, ৫৭১ সন) সমাজে প্রচলিত তারিখদ্বয়ের বিপরীত উল্লেখ করেছি এটা বোঝাতে যে, এ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে এবং আমরা “Mawlûd: মিলাদ-উন-নবী উৎযাপন- বৈধ না অবৈধ?” নামক আর্টিকেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, islamickorner, discerningthetimesonline, ldysinger.stjohnsem.edu

উৎস: 

সৈয়দ আমীর আলী, দি স্প্রিট অফ ইসলাম।
EG Browne, A literary History of Persia

Gospel of Barnabas

1 টি মন্তব্য: