pytheya.blogspot.com Webutation

২ মার্চ, ২০১২

Moses: প্রণয় ও বিবাহের ইতিবৃত্ত।


মূসা (Moses) যখন মিসর থেকে বের হয়েছিলেন, তখন তার সাথে পাথেয় বলতে কিছুই ছিল না এবং গন্তব্যস্থান সম্পর্কেও তার কোন ধারণা ছিল না। ঐ সঙ্কটময় অবস্থায় তিনি আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করে বলেছিলেন, ‘আশাকরি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ দেখাবেন।’

একজন মিসরীয়কে হত্যার অপরাধে মূসার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেছিলেন ফেরাউন। আর ফেরাউনের এক উচ্চপদস্থ ইস্রায়েলী কর্মচারী ইউশায়া ইবনে নূন এখবর জানতে পেরে তৎক্ষণাৎ মূসার খোঁজে বেরিয়ে পড়েন এবং তাকে শহরের মধ্যে খুঁজে পেয়ে সত্ত্বর মিসর ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

মিসর থেকে পালাচ্ছেন মূসা।
শ্যাম দেশ। প্রায় আট মঞ্জিল (এক মঞ্জিল = ১৬ মাইল) পথ অতিক্রম করে মূসা মদিয়ানের প্রান্তরে এসে পৌঁছিলেন। ইতিমধ্যে সাতদিন অতিবাহিত হয়েছে। এই সাতদিনে তার একমাত্র আহার্য ছিল বৃক্ষপত্র। তীব্র ক্ষুধা আর ক্লান্তি নিয়ে তিনি সম্মুখে এগিয়ে চলছিলেন। 

একসময় মূসা মাঠের মধ্যে একটা কূয়ো দেখতে পেলেন। দুপুর গড়িয়ে গেছে। তিনি এগিয়ে কূয়োর ধারে পৌঁছে দেখলেন একদল রাখাল তাদের পশুগুলোকে নিয়ে সেখানে জটলা করে আছে। সেইসময় দু‘টি মেয়ে পানি তুলে গামলা ভরতে কূয়োর কাছে গেল। কিন্তু কয়েকজন রাখাল এগিয়ে এসে তাদেরকে তাড়িয়ে দিল। তখন তারা রাখালদের পিছনে সরে গিয়ে তাদের পশুগুলো আগলাতে লাগল। এই ব্যাপার দেখে মূসা মেয়ে দু‘টির কাছে গিয়ে তাদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাদের কি হয়েছে? তোমরা পশুগুলো আগলে দাঁড়িয়ে রয়েছ কেন? এগুলোকে পানি পান করাও?’

ম্যাপে মদিয়ানের অবস্থান।
মেয়ে দু‘টি মূসার বেশভূষা লক্ষ্য করে বুঝতে পারল লোকটি বিদেশী- সম্ভবতঃ মিসরীয়। তাদের একজন অবনত মুখে সরল স্বীকারোক্তি করল, বলল, ‘রাখালেরা তাদের পশুগুলোকে সরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াতে পারছিনে।’

'তোমরা কেন পশু চারণের কাজ করছ? এ কাজ তো মেয়েদের জন্যে নয়!'-মূসার চোখে মুখে এমন কিছু জিজ্ঞাসার চিহ্ন লক্ষ্য করে ২য় জন নীচুস্বরে আরও যুক্ত করল-‘আমাদের কোন ভাই নেই, আর আমাদের পিতাও বৃদ্ধ, সুতরাং তিনিও একাজ করতে পারেন না। তাই আমাদেরকেই এই পশুগুলোর দেখভাল করতে হয়।’

‘ও এই ব্যাপার!’ -মূসা এগিয়ে গিয়ে কূয়োর কাছ থেকে রাখালদের তাড়িয়ে দিলেন। তারপর কূয়োর মুখ থেকে ভারী পাথরখানা একাই সরিয়ে দিয়ে ওদের পশুগুলোকে পানি তুলে খাওয়াতে লাগলেন। মেয়ে দু‘টি চুপচাপ দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তার কার্যকলাপ লক্ষ্য করতে লাগল। 

যখন পশুগুলোর পানি পান শেষ হল, মেয়ে দু‘টি সেগুলোকে তাড়িয়ে তাদের গৃহ অভিমূখে চলে গেল। আর মূসা নিকটেই একটা গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিলেন। অতঃপর নিজের অবস্থা ও অভাব আল্লাহর সামনে তুলে ধরে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! যে অনুগ্রহই তুমি আমার প্রতি করবে আমি তাই-ই চাই।’ 

মূসা ও শেয়েবের দু'কন্যা।
এদিকে মেয়ে দু‘টি ছিল হযরত শোয়েবের কন্যা। যখন তারা তাদের বাড়ীতে ফিরে গেল, তাদের পিতা সকাল সকাল তাদেরকে গৃহে ফিরতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আজ তোমরা এত তাড়াতাড়ি কি করে ফিরে এলে?’

তারা বলল, ‘আজ রাখালদের হাত থেকে একজন মিসরীয় আমাদেরকে রক্ষা করেছেন, আর তিনি পানি তুলে আমাদের ভেড়াগুলোকেও পান করিয়েছেন।’

শোয়েব দেখলেন, লোকটি অনুগ্রহ করেছে; তাকে এর প্রতিদান দেয়া উচিৎ। তাই তিনি তাদেরকে বললেন, ‘লোকটি কোথায়? তোমরা তাকে ফেলে এলে কেন? তাকে ডেকে এনে কিছু খেতে দাও।’

ক্ষুধা ও ক্লান্তিতে মূসা তখনও বৃক্ষতলে বসে আছেন এমন সময় দু‘কন্যার মধ্যে একজন লজ্জায় জড়সড় পায়ে তার কাছে ফিরে এসে বলল, ‘আপনি যে আমাদের পশুগুলোকে পানি পান করিয়েছেন তার প্রতিদান দেবার জন্যে আমার পিতা আপনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’
মেয়েটির একথা শুনে মূসা বুঝতে পারলেন আল্লাহর সাহায্য এসে পড়েছে। সুতরাং তিনি কোন কথা না বলে উঠে দাঁড়ালেন এবং মেয়েটির পিছে পিছে তাদের বাড়ীতে গেলেন। 

মেয়েটি তার পিতার সাথে মূসার পরিচয় করে দিল। অত:পর কথাবার্তার একপর্যায়ে মূসা তাদের পিতাকে তার এখানে আগমনের সকল ঘটনা খুলে বললেন। খাদ্য পরিবেশনের ফাঁকে কন্যাদ্বয়ও মূসার সবকথা মনোযোগ সহকারে শুনল। সবকিছু শোনার পর কন্যাদ্বয়ের মত হযরত শোয়েবও বুঝতে পারলেন মূসা এই মূহূর্তে নিরাশ্রয়ী-তার আশ্রয়ের প্রয়োজন। আর তিনি ইচ্ছে করলেই মূসাকে অতিথি হিসেবে আশ্রয় দিতে পারেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন মূসা অন্যের গলগ্রহ হবার ভয়ে এই আতিথেয়তা গ্রহণ করবেন না-চলে যাবেন। সুতরাং তিনি ঐ প্রস্তাব না দিয়ে কেবলমাত্র মূসাকে আশ্বস্ত করে শুধু এইটুকু বললেন, ‘ভয় কোরও না, তুমি সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছ।’ 

মূসা ও শোয়েব।
কন্যারা তার পিতাকে ভালভাবে জানত এবং বুঝত। আর মূসা সম্পর্কে তাদেরও যথেষ্ট ধারণা হয়েছিল। কিন্তু আশ্রয় না পেলে এই অচেনা বিদেশ-বিভূয়ে মূসা বিপদে পড়তে পারেন। উপরন্তু কন্যাদ্বয়ও কোন অবস্থাতেই মূসাকে হারাতে চাইছিল না। সুতরাং বুদ্ধিমতী জৈষ্ঠ্য কন্যা সফুরা পিতার নিকট আহল্লাদি কন্ঠে এক প্রস্তাব পেশ করলে, ‘হে পিতা! তুমি তাকে কাজের লোক হিসেবে নাও-সে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত, তোমার কাজের লোক হিসেবে সে কিন্তু ভালই হবে।’ 

সফুরার এ কথায় একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে যে, সামান্য সময়ের পরিচয়ে মূসার বিষয়ে (অর্থাৎ তার শক্তি সামর্থ্য ও চরিত্র সম্পর্কে) সে এই সার্টিফিকেট কিভাবে দিল? বুদ্ধিমতী এই মেয়েটি মূসা যে শক্তিশালী তা কূয়োর মুখ থেকে ভারী পাথরখানা একাই সরিয়ে দেয়াতে বুঝতে পেরেছিল। আর বিশ্বস্ততা? -দু‘জন যুবতীর প্রতি তার ব্যাবহার ও দৃষ্টি তাকে এ বিষয়ে নিশ্চিত ধারণা দিয়েছিল। আর এ কথা তো সত্য যে মেয়েরা জন্মগতভাবেই পুরুষের চাহনি সনাক্ত করার ক্ষমতা লাভ করে থাকে।

কন্যার এই প্রস্তাব শুনে হযরত শোয়েব বুঝতে পারলেন এই যুবককে সে পছন্দ করেছে। আর তিনিও ভেবে দেখলেন-এই যুবকের সাথে যদি তার কন্যার বিবাহ হয় তবে ভালই হবে। সে উপযুক্ত পাত্র। তাছাড়া তার কন্যার রাখা প্রস্তাব শুনে সে নিরুত্তর ছিল। তাই কোন ভণিতা না করে তিনি সরাসরি লেন-দেনের পথই বেঁছে নিলেন-মূসাকে তার কন্যাদের একজনের সাথে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন এভাবে- ‘আমি আমার দু‘কন্যার মধ্যে একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই এই শর্তে যে, তুমি আট বৎসর আমার কাজ করবে। যদি দশ বৎসর পুরো করতে চাও -তাও করতে পার। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তুমি আমাকে একজন ভাল লোক হিসেবেই পাবে।’ 

মূসা বললেন, ‘আপনার ও আমার মধ্যে এই চুক্তিই রইল। এই-দুই মেয়াদের যে-কোন একটি আমি পুরো করলে আমার বিরুদ্ধে আর কিছু বলার থাকবে না। আমরা যা বললাম, আল্লাহ তার স্বাক্ষী রইলেন।’
মূসা হযরত শোয়েবের জৈষ্ঠ্য কন্যা সফুরাকে বিবাহ করলেন এবং শর্তানুযায়ী শ্বশুবের পশুপাল চরানোর কাজে লেগে গেলেন। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘যখন মূসা মদিয়ানের অভিমুখে রওনা হল, তখন বলল, ‘আশাকরি আমার প্রতিপালক আমাকে পথ দেখাবেন।’ 

যখন সে মদিয়ানের কূপের ধারে পৌঁছিল, দেখল একদল লোক তাদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াচ্ছে আর তাদের পিছনে দু‘টি মেয়ে তাদের নিজেদের পশুগুলো আগলিয়ে রাখছে। মূসা বলল, ‘তোমাদের কি ব্যাপার?’
ওরা বলল, ‘আমরা আমাদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াতে পারছিনে, যে পর্যন্ত রাখালেরা তাদের পশুগুলোকে নিয়ে সরে না যায়। আমাদের পিতা খুবই বৃদ্ধ।’
মূসা তখন ওদের পশুগুলোকে পানি খাওয়াল। তারপর সে ছায়ার নীচে আশ্রয় নিয়ে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! যে অনুগ্রহই তুমি আমার প্রতি করবে আমি তারই মুখাপেক্ষী।’ 

অতঃপর দু‘কন্যার মধ্যে একজন লজ্জায় জড়সড় পায়ে তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘তুমি যে আমাদের পশুগুলোকে পানি খাইয়েছ তার প্রতিদান দেবার জন্যে আমার পিতা তোমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।’ 

শোয়েবের মেষ পালকের কাজে মূসা।
তারপর মূসা তার (শোয়েবের) কাছে গিয়ে সব ঘটনা বলার পর সে বলল, ‘ভয় কোরও না, তুমি সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে বেঁচে গেছ।’ 
কন্যাদের একজন বলল, ‘হে পিতা! তুমি একে কাজের লোক হিসেবে নাও-সে শক্তিশালী ও বিশ্বস্ত, তোমার কাজের লোক হিসেবে সে ভালই হবে।’ 

ওদের পিতা মূসাকে বলল, ‘আমি আমার দু‘কন্যার মধ্যে একজনকে তোমার সঙ্গে বিবাহ দিতে চাই এ শর্তে যে, তুমি আট বৎসর আমার কাজ করবে। যদি দশ বৎসর পুরো করতে চাও -তাও করতে পার। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনে। আল্লাহর ইচ্ছেয় তুমি আমাকে একজন ভাল লোক হিসেবেই পাবে।’ 

মূসা বলল, ‘আপনার ও আমার মধ্যে এই চুক্তিই রইল। এ-দুই মেয়াদের যে-কোন একটি আমি পুরো করলে আমার বিরুদ্ধে আর কিছু বলার থাকবে না। আমরা যা বললাম, আল্লাহ তার স্বাক্ষী রইলেন।’(২৮:২২-২৮)

মদিয়ানে মূসা চাকুরীর নির্দিষ্ট আট বৎসর বাধ্যতামূলক এবং দু‘বৎসর ঐচ্ছিক মেয়াদ পূর্ণ করলেন। অর্থাৎ সর্বমোট দশ বৎসর একজন মেষপালকের জীবন-যাপন করেছিলেন।

সমাপ্ত।
ছবি: tedloukes.blogspot, jesuswalk, ellenwhite, umanitoba.ca.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন