pytheya.blogspot.com Webutation

১১ মার্চ, ২০১২

The Companions: মুহম্মদের প্রাথমিক অনুসারীগণ।


মুহম্মদ মানবজাতির প্রতি তার দায়িত্ব পালনের জন্যে আহবায়িত হলেন। একদা গভীর ধ্যানমগ্ন অবস্থায় তিনি অনুভব করলেন যে, স্বর্গীয়বাণী দ্বারা তিনি আহুত হয়েছেন, যে বাণী তার পূর্বে যারা বিগত হয়েছেন তাদেরকেও আহবান জানিয়েছে সত্য প্রচার করতে। তার কাছে তার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত কর্ম পরিকল্পণা পরিস্কার হল। 

ওহে বস্ত্রাবৃত, ওঠ, সতর্ক কর, আর নিজ পালনকর্তার মহিমা ঘোষণা কর।’(৭৪:১-৩) তিনি উঠলেন এবং যে কাজের জন্যে তিনি মনোনীত হয়েছেন তা সম্পন্ন করার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। তারপর থেকেই তার জীবন মানবতার সেবায় উৎসর্গীত। 

খাদিজা সর্বপ্রথম মুহম্মদের প্রচারিত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রত্যাদেশে সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করলেন, আরব জাতির পৌত্তলিকতা বর্জন করলেন এবং বিশুদ্ধ চিত্তে স্বামীর সঙ্গে সর্বশক্তিমান আল্লাহর এবাদতে যোগদান করলেন।

শুরুতে মুহম্মদ একমাত্র অনুরক্তজনদের কাছে সত্য ধর্মের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং তাদের পূর্ব পুরুষদের স্থূল রীতিনীতি থেকে মুক্ত করার প্রয়াস চালিয়েছিলেন। তিনি জনসম্মুখে পৌত্তলিকতা বর্জন করার আহবান জানাতে সাফা পর্বতের পাদ দেশে এক সভা আহবান করলেন। সেখানে তিনি আল্লাহর দৃষ্টিতে তাদের অপরাধের ব্যপকতা, মূর্ত্তিপূজার অসারতা সম্পর্কে এবং অতীতকালে পয়গম্বরদের আহবানে সাড়া না দেয়ায় বিভিন্ন গোত্রের যে ভয়াবহ পরিনতি হয়েছিল সে সম্পর্কেও সতর্ক করলেন। সকলকে সম্বোধন করে তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার দেশবাসী! শ্রবণ করুন! এক বেহেস্তী সওগাত আমি আপনাদের জন্যে নিয়ে এসেছি। আল্লাহর পবিত্র কালাম আমি লাভ করেছি। আপনারা মূর্ত্তিপূজা করবেন না। একমাত্র আল্লাহর উপাসনা করুন। বলুন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহম্মদুর রসূলুল্লাহ। ইসলাম-ই আল্লাহর মনোনীত ধর্ম। ইসলাম গ্রহণ করুন, ইহকাল ও পরকালে আপনাদের কল্যাণ হবে। অন্যথায় শিরক ও কুফরের কারণে ভীষণ আযাব সকলকে গ্রাস করবে।- কে এই সত্য প্রচারে আমাকে সাহায্য করবেন? কে আমার পাশে এসে দাঁড়াবেন? -আসুন।’

অনেকে বিরক্ত হল। আবু লাহাব বললেন, ‘আমার কাছে ঢের অর্থ ও লোকবল রয়েছে, আমি এগুলোর বিনিময়ে নিজেকে বা পরিবারকে রক্ষা করব।’
কেউ কেউ বলল, ‘হে মুহম্মদ! তুমি যদি পয়গম্বরই হবে তবে কোন একটি মু‘জেযা দেখাও তো? আমাদের এই মরুভুমিতে একটি নহর বইয়ে দাও তো?’
আবার কেউ কেউ বলল, ‘যদি আপনি বাস্তবিকই আল্লাহর রসূল হয়ে থাকেন, তবে মু‘জেযার মাধ্যমে সারা পৃথিবীর ধন-ভান্ডার আমাদের জন্যে একত্রিত করে দিন।’

তিনি বললেন, ‘এই কাজের জন্যে আমি আসিনি। সব মু‘জেযা আল্লাহর ইচ্ছেধীন, তিনি ইচ্ছে করলে সবকিছুই করতে পারেন। আমি যাদুকর নই, আর যাদু দেখিয়ে আপনাদেরকে স্বমতে আনতে ঘৃণাবোধ করি। সত্যের জলন্ত স্পর্শে আপনাদের মন যদি সাড়া না দেয় তবে আপনারা আমার কথা শুনবেন না।’
তারা বলল, ‘তবে আমাদের ভবিষ্যৎ উপকারী ও ক্ষতিকর অবস্থা ও ঘটনাবলী ব্যক্ত করুন, যাতে আমরা উপকারী বিষয়গুলো অর্জণ করার এবং ক্ষতিকর বিষয়গুলো বর্জন করার ব্যবস্থা পূর্ব থেকেই করে নিতে পারি। অবশ্য আমরা বুঝতে অক্ষম যে, আমাদেরই স্বগোত্রের একজন লোক, যিনি আমাদের মতই পিতা-মাতার মাধ্যমে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং পানাহার ও হাট-বাজারে ঘোরাফেরা ইত্যাদি মানবিক গুণে আমাদের সম অংশীদার, তিনি কিরূপে আল্লাহর রসূল হতে পারেন! কোন ফেরেস্তা হলে আমরা তাকে রসূল ও মানবজাতির নেতারূপে মেনে নিতাম।’

তাদের কথার জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল-তুমি বল, আমি আপনাদেরকে বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডার রয়েছে। তাছাড়া আমি অদৃশ্য বিষয় অবগতও নই। আমি এমনও বলি না যে, আমি ফেরেস্তা। আমি তো শুধু ঐ ওহীর অনুসরণ করি, যা আমার কাছে আসে।’(৬:৫০)

আবু লাহাব (আগুনের পিতা) ক্রুদ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, ‘মুহম্মদ! ধৃষ্টতা পরিহার কর। তোমার পূজনীয় পিতৃব্য ও খুল্লাতাত ভ্রাতৃগণ এখানে উপস্থিত আছেন, তাদের সম্মুখে বাতুলতা কোরও না। তুমি কুলাঙ্গার। তোমার আত্মীয়দের উচিৎ তোমাকে কয়েদ করে রাখা।’

তিনি সোরগোল পাকিয়ে তুললেন। তার এহেন ব্যাবহারে মুহম্মদ মর্মাহত হলেন। এমনিতে তিনি এবং তার স্ত্রী ইসলামের ও মুহম্মদের চরম বিদ্বেষী ছিলেন। এসময় আলী সম্মুখে এগিয়ে এসে উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করলেন, ‘হে রসূলুল্লাহ! আমি আপনার পাশে দাঁড়াতে প্রস্তুত আছি। আল্লাহর কসম, আজ হতে আমি আমার জীবন আপনার সেবায় নিয়োজিত করলাম।’
কিন্তু কুরাইশরা তার আহবানের প্রতি ব্যঙ্গোক্তি করল, তরুন আলীর উদ্দীপনাকে হেসে উড়িয়ে দিল। উপহাস ও তামাসার মহড়া করতে করতে তারা স্থানত্যাগ করল।

খাদিজার পরে আলী তার দ্বিতীয় শিষ্য। তিনি প্রায়ই তার স্ত্রী ও তরুণ আলীসহ মক্কার মরুভূমির গভীর নির্জনতায় যেতেন যেন তারা সমগ্র মানবজাতির স্রষ্টা আল্লাহর বহুমুখী করুণার জন্যে তাদের হৃদয় উজাড় করা কৃতজ্ঞতা জানাতে পারেন। 

একদিন মরুভূমির নির্জণে আবু তালিব দূর থেকে মুহম্মদ ও আলীকে প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকতে দেখতে পেলেন। প্রার্থনার ভঙ্গীর ব্যাপারে বিষ্মিত বোধ করার কারণে তিনি নিকটবর্তী হলেন। অতঃপর দাঁড়িয়ে তাদের প্রার্থনা মনোযোগ সহকারে দেখলেন। প্রার্থনা শেষে তিনি মুহম্মদকে বললেন, ‘ওহে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! তুমি কোন ধর্ম অনুসরণ করছ?‘ 

মুহম্মদ উত্তর দিলেন, ‘এই ধর্ম আল্লাহর, তার ফেরেস্তাদের, তার নবীদের এবং আমাদের পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের ধর্ম। আল্লাহ আমাকে তার বান্দাদের কাছে পাঠিয়েছেন তাদেরকে সত্যের দিকে পরিচালিত করতে, হে পিতৃব্য! আপনি সকলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উপযুক্ত ব্যক্তি। এটা একটা সম্মেলন, আমি আপনাকে অনুরোধ করি যে, আপনি ইসলাম গ্রহণ করে এর প্রচারে সহায়ক হোন।’

আবু তালিব একজন দৃঢ়চিত্ত সেমিটিকের যথার্থ ভঙ্গীতে বললেন, ‘হে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি আমার পিতা-পিতামহের পালিত ধর্ম জলাঞ্জলি দিতে পারিনে, তবে পরম শক্তিমান আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি যে, যতদিন আমি জীবিত আছি কেউ তোমার কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না।’ 

এরপর পুত্র আলীর দিকে ফিরে সম্মানিত গোত্রপতি সে কোন ধর্ম অনুসরণ করছে তা জিজ্ঞেস করলেন। আলী উত্তর দিলেন, ‘হে আমার পিতা! আমি আল্লাহ ও তাঁর এই প্রেরিত পুরুষে বিশ্বাস করি এবং তাকে অনুসরণ করি।’ 
আবু তালিব বললেন, ‘হে আমার পুত্র! সে তোমাকে যা ভাল নয় এমন কিছুর দিকে আহবান করবে না, কাজেই তুমি স্বাধীনভাবেই তার প্রতি অনুগত হতে পার।’

কিছুদিনের মধ্যেই জায়েদ বিন হারিস, যিনি মুক্তি পাবার পরও মুহম্মদকে পরিত্যাগ করেনি; নতুন ধর্মে দীক্ষিত হলেন। তারপরেই কুরাইশ গোত্রের একজন নেতৃস্থানীয় সদস্য আব্দুল্লাহ বিন আবু কুহাফা ওরফে ‘আব্দুল কাবা’ ইসলাম গ্রহণ করলেন। তিনি পরবর্তীতে আবু বকর নামে পরিচিতিলাভ করেছিলেন। তিনি তায়েম ইবনে মুর্রা নামক গুরুত্বপূর্ণ পরিবারের সদস্য, সম্পদশালী ব্যবসায়ী, স্বচ্ছ ও সুস্থির বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন এবং সেই সঙ্গে কর্মঠ, বিজ্ঞ, সৎ ও অমায়িক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তার দেশবাসীদের মধ্যে প্রভূত প্রতিপত্তি লাভ করেছিলেন। তিনি মুহম্মদের মাত্র দু’বছরের ছোট ছিলেন এবং কথিত নতুন ধর্মের প্রতি তার অকুন্ঠ সমর্থন ইসলামের নৈতিক শক্তির উপর যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। 

আবু বকরের ইসলাম গ্রহণের পর তার দেখাদেখি পাঁচজন নামজাদা ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন উমাইয়া বংশের ওসমান বিন আফফান যিনি পরবর্তীতে তৃতীয় খলিফা হয়েছিলেন, আউফের পুত্র আব্দুর রহমান, আবু ওয়াক্কাসের পুত্র সাদ যিনি পরবর্তীকালে পারস্য বিজেতা হয়েছিলেন এবং আওয়ামের পুত্র ও খাদিজার জ্ঞাতি ভাই জুবায়ের এরা সকলেই মুহম্মদের হাতে হাত রেখে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। আরও যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তারা হলেন-আবু ওবায়দা, আবু সালমা, ওসমান ইবনে মায়উন, সাইদ, আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ প্রমুখ।

সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস মুহম্মদের একজন শিষ্য এবং দশজন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবীদের (Companions) অন্যতম। তিনি যখন ইসলাম গ্রহণ করলেন, তখন তার মাতা হোমনা বিনতে আবু সুফিয়ান খুবই মর্মাহত হলেন। তিনি শপথ গ্রহণ করলেন, ‘আমি ততক্ষণ পর্যন্ত আহার ও পানীয় গ্রহণ করব না, যে পর্যন্ত না সাদ পৈতৃক ধর্মে ফিরে আসে। এমনিভাবে আমি ক্ষুৎ-পিপাসায় মৃত্যুবরণ করব, যাতে সে মাতৃহন্তা রূপে সকলের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন হয়।’
সাদ অত্যধিক পরিমাণে মাতৃভক্ত ছিলেন। তিনি এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে পড়লেন। 

এসময় এই আয়াত নাযিল হয়েছিল-আমি মানুষকে পিতামাতার সাথে সদ্ব্যাবহার করার জোর নির্দেশ দিয়েছি। যদি তারা তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করার জোর প্রচেষ্টা চালায়, যার সম্পর্কে তোমার কোন জ্ঞান নেই, তবে তাদের আনুগত্য কোরও না।’(২৯:৮)

সাদের মাতা শপথ অনুযায়ী তিন দিন তিন রাত অনশন অব্যহত রাখলেন। তখন সাদ তার মাতার কাছে গিয়ে বললেন, ‘মা, যদি তোমার দেহে এক‘শ আত্মা থাকত এবং আমার সম্মুখে সেগুলি একটি একটি করে তোমার দেহ পরিত্যাগ করত, তবুও আমি এই সত্যধর্ম ত্যাগ করতাম না।’

অতঃপর তার মাতা নিরাশ হয়ে অনশন ভঙ্গ করেন।

সমাপ্ত।

1 টি মন্তব্য: