pytheya.blogspot.com Webutation

১২ মার্চ, ২০১২

Battle of Badr: যুদ্ধে ধৃত বন্দীদিগের ভাগ্য মীমাংসা।


মক্কাবাসীরা প্রভূত ক্ষতি সহ্যকরে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেল। তাদের অনেক নেতা নিহত হল। আবু জেহেল তার দুর্নিবার অহংকারের শিকার হয়েছিলেন। মা‘আজ ও তার ভাই আবু জেহেলকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধাবিত হলে, আবু জেহেল পুত্র ইকরামা তাদেরকে বাঁধা দিল। সে তরবারির এক আঘতে মা‘আজের বাম বাহু বিছিন্ন করে ফেলে। কিন্তু অদম্য মা‘আজ তা উপেক্ষা করে আবু জেহেলের শির তার দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন। 

এই যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলমানদের পক্ষে ৬ জন মোহাজির ও ৮ জন আনসার নিহত হয়। আর কুরাইশদের পক্ষে ওৎবা, শায়বা, আবু জেহেল ও তার ভ্রাতা আছী, আবু সুফিয়ানের পুত্র হানজালাসহ প্রায় শতাধিক নিহত হয়েছিলেন।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে কুরাইশদের পলায়নের সংবাদ শুনে মুহম্মদ মুসলমানদের অস্ত্র ব্যাবহারে নিষেধাজ্ঞা জারী করলেন। তিনি যুদ্ধের পূর্বেও মুসলমানদের এই বলে সতর্ক করেছিলেন-‘কুরাইশদের মধ্যে কতকগুলি লোক অনিচ্ছাসত্ত্বেও যুদ্ধে যোগদান করতে বাধ্য হয়েছে। সাবধান, তাদেরকে কেউ আঘাত কোরও না।’

মুসলমানরা মুহম্মদের আদেশ মেনে নিয়ে অস্ত্র ব্যাবহার বন্ধ করে পলায়নপর শত্রুদেরকে বন্দী করতে আরম্ভ করল। বহু সংখ্যক কুরাইশ (৭০জন) মুসলমানদের হাতে বন্দী হল। অতঃপর এসব বন্দী ও আবু জেহেলের ছিন্ন শির মুহম্মদের নিকট আনীত হল।

যুদ্ধবন্দীদের প্রতি আরবদের মধ্যে প্রচলিত প্রথা ও ঐতিহ্যের বিপরীতে উচ্চতম মানবতার সঙ্গে আচরণ করা হল। মুহম্মদ কড়া নির্দেশ ছিল যে বন্দীদের দুর্ভাগ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শণ করতে হবে এবং তাদের প্রতি সদয় আচরণ করতে হবে। যে সব মুসলমানদের তদারকীতে এসব বন্দীরা ছিল, তারা বিশ্বস্ততার সঙ্গে মুহম্মদের নির্দেশ পালন করেছিলেন। তারা তাদের আহার্য রুটি বন্দীদের খেতে দিতেন এবং নিজেরা শুধু শুকনো খেজুর আহার করে ক্ষুধা নিবৃত্ত করতেন। পরবর্তীকালে একজন বন্দী (আবু আজিজ) তাদের প্রতি আচরণ সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মদিনার লোকদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তারা আমাদের অশ্বপৃষ্ঠে যেতে দিতেন এবং নিজেরা হেঁটে যেতেন। তারা আমাদেরকে রুটি খেতে দিতেন, নিজেদের জন্যে রুটি অবশিষ্ট থাকত না, ফলে তারা খেজুর ভক্ষণ করে ক্ষুধা মেটাতেন এবং তাতেই তৃপ্ত থাকতেন।’
বদরযুদ্ধে (Battle of Badr) ধৃত বন্দীদিগের ভাগ্য সম্বন্ধে মীমাংসার ভার ও অধিকার আল্লাহ কর্তৃক মুসলমানদের প্রতি ন্যস্ত হয়েছিল এবং মুহম্মদ প্রকাশ্যভাবে এর ঘোষণাও করে দিয়েছিলেন। এ কারণে বন্দীদের মদিনায় আনয়নের পর পরামর্শ সভা বসল। মুহম্মদ শিষ্যদের মতামত জানতে চাইলেন। আবু বকর নিবেদন করলেন, ‘হযরত এরা সকলে আমাদের স্বজন ও আত্মীয়। আমার মতে যদি কিছু কিছু অর্থ নিয়ে এদেরকে মুক্তি দেয়া হয়, তাতে আমাদের সাধারণ তহবিলে যথেষ্ট অর্থ সঞ্চিত হবে, পক্ষান্তরে অল্পদিনের মধ্যে এদের সকলের পক্ষে ইসলাম গ্রহণ করাও সম্ভব।’

মুহম্মদ আবু বকরের মতামত শোনার পর ওমরের প্রতি লক্ষ্য করে বললেন, ‘খাত্তাবের পুত্র, আপনার কি মত?’
ওমর স্ব-সম্ভ্রমে নিবেদন করলেন, ‘এরা ইসলামের চিরশত্রু। মুসলমানদেরকে নির্যাতিত করতে, আল্লাহর রসূলকে হত্যার ষড়যন্ত্র করতে এবং আল্লাহর সত্য ধর্মকে পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে মুছে ফেলতে এরা সাধ্যমতে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। এগুলি অন্যায়, অধর্ম ও অত্যাচারের সাক্ষাৎ প্রতিমূর্ত্তি। এদেরকে অবিলম্বে হত্যা করে ফেলা উচিৎ। প্রত্যেক মুসলমান উলঙ্গ তরবারী হস্তে দন্ডায়মান হবে এবং নিজহস্তে নিজের আত্মীয়বর্গের মুন্ডুপাত করবে- এটাই ন্যায়তঃ বলে আমি মনে করি।’
মুহম্মদ দু‘টি ফয়সালাই সাহাবীদের কাছে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে পেশ করলেন। অধিকাংশ সাহাবীর মতের প্রতিধ্বনি ছিল মুক্তিপণের মাধ্যমে বন্দীদেরকে মুক্তিদান। সুতরাং রহমাতুল্লিল আলামীন সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত গ্রহণ করলেন। অতঃপর মুক্তিপণ নির্ধারিত হল। এর পরিমান ছিল চারশত দিরহাম। এসময় জিব্রাইল এসে মুহম্মদকে অবহিত করলেন যে, বন্দীদেরকে অর্থের বিনিময়ে মুক্তি দেবার সিদ্ধান্তের কারণে আল্লাহর নির্দেশক্রমে একথা অবধারিত যে, এর বদলা হিসেবে আগামী বৎসর সমসংখ্যক মুসলমান যুদ্ধে শহীদ হবে।’

অতঃপর কোরআনের এ আয়াত নাযিল হল- নবীর পক্ষে উচিৎ নয় বন্দীদেরকে নিজের কাছে রাখা, যতক্ষণ না দেশময় প্রচুর রক্তপাত ঘটাবে। তোমরা পর্থিব সম্পদ কামনা কর, অথচ আল্লাহ চান আখেরাত। আর আল্লাহ হচ্ছেন পরক্রমশালী হেকমতওয়ালা। (৮:৬৭)

বদর যুদ্ধের সময় পর্যন্ত যুদ্ধবন্দীদের প্রতি কৃপা করা বা মুক্তিপণ নেয়া নিষিদ্ধ ছিল। তাই অধিকাংশ সাহাবী কর্তৃক মুক্তিপণ বাবদ পার্থিব সম্পদ কামনা করা আল্লাহর কাছে পছন্দনীয় ছিল না। কিন্তু মুসলমানরা যে এমন সিদ্ধান্ত নেবে তা পূর্ব থেকেই লওহে মাহফুজে তিনি লিখে রেখেছেন। একারণে কোন আযাব তাদেরকে পাকড়াও করবে না। সাহাবীদেরকে সতর্ক করা ঐ আয়াতটি এই-যদি একটি বিষয় না হত যা পূর্ব থেকেই আল্লাহ লিখে রেখেছেন, তাহলে তোমরা যা গ্রহণ করছ, সেজন্যে বিরাট আযাব এসে পৌঁছাত।(৮:৬৮)

এই আয়াত নাযিল হওয়ার পর মুহম্মদ সাহাবীদেরকে বলেছিলেন, ‘আমাদের সিদ্ধান্তের কারণে আল্লাহর আযাব নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। আর যদি আযাব এসেই পড়ত, তবে ওমর ইবনে খাত্তাব ও সা‘দ ইবনে মু‘আজ ব্যতিত কেউই রেহাই পেত না।’

অতঃপর এই আয়াত নাযিল হল- হে নবী, তাদেরকে বলে দাও, যারা তোমার হাতে বন্দী হয়ে আছে যে, আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তরে কোনরকম মঙ্গল চিন্তা রয়েছে বলে জানেন, তবে তার চেয়ে বহুগুণ বেশী দান করবেন যা তোমাদের কাছ থেকে বিনিময়ে নেয়া হয়েছে। তাছাড়া তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দেবেন। বস্তুতঃ আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়।(৮:৭০)

অনেকে আশঙ্কা করছিল কুরাইশরা মক্কায় ফিরে গিয়ে আবারও মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করবে। তখন তাদের আশঙ্কামুক্ত করতে এই আয়াত নাযিল হল-আর যদি তারা তোমার সঙ্গে প্রতারণা করতে চায়-বস্তুতঃ তারা আল্লাহর সাথেও ইতিপূর্বে প্রতারণা করেছে, অতঃপর তিনি তাদেরকে ধরিয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত, সুকৌশলী।(৮:৭১)
যে সকল বন্দী লেখাপড়া জানত কিন্তু মুক্তিপণ দিতে অক্ষম ছিল তাদেরকে মুক্তির বিনিময়ে দশটি বালককে লেখাপড়া শেখাতে বলা হয়েছিল। আর যাদের শিক্ষা ও অর্থ কোনটাই ছিল না তাদেরকে কোন প্রকার পণ না নিয়েই মুক্তি দেয়া হয়েছিল। এভাবে মুহম্মদের দয়া ও মুসলমানদের অনুগ্রহের ফলে অল্পদিনের মধ্যে কুরাইশ সমস্ত বন্দী স্বাধীনভাবে স্বদেশে ফিরে গেল।
মুহম্মদের পিতৃব্য আব্বাস বদর যুদ্ধে ধৃতবন্দীদের একজন ছিলেন। তাকে বন্দী অবস্থায় মদিনায় আনা হলে তার মুসলিম আত্মীয়বর্গ যারা মদিনাতে হিযরত করে চলে এসেছিল তারা তাকে বাতিল ধর্মের উপর বহাল থাকার জন্যে বিদ্রুপ করতে লাগল। তখন আব্বাস বললেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে শ্রেষ্ঠ মনে করে আছ, অথচ আমরা কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ ও হাজীদের পানি সরবরাহ করে থাকি? তাই আমাদের সমান আমল কারও হতে পারে না।’

তার এই কথা ও তার জবাব কোরআন দিয়েছে এভাবে-তোমরা কি হাজীদের পানি সরবরাহ ও মসজিদুল হারাম আবাদকরণকে সেই লোকের সমান মনেকর, যে ঈমান রাখে আল্লাহ ও শেষবিচারের দিনের প্রতি এবং যুদ্ধ করেছে আল্লাহর রাহে, এরা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান নয়, আর আল্লাহ জালেম লোকদের হেদায়েত করেন না।(৯:১৯)

যাহোক মুক্তিপণের সময় আব্বাস যখন মুহম্মদের সম্মুখে আনীত হলেন, তিনি দেখলেন যে তার গায়ে কোন কোর্তা নেই। তখন তিনি উপস্থিত সাহাবীদের বললেন, ‘তাকে একটি কোর্তা পরিয়ে দেয়া হোক।’
আব্বাস ছিলেন দীর্ঘাদেহী লোক। উপস্থিত আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইও ছিলেন দীর্ঘাদেহী। তিনি আগ্রহ করে তার কোর্তা খুলে দিলে মুহম্মদ তা তার পিতৃব্য আব্বাসকে পরিয়ে দিলেন।

অতঃপর তিনি পিতৃব্যকে বললেন, ‘আপনার জন্যে মুক্তিপণ ধার্য্য হয়েছে।’
আব্বাস নিবেদন করলেন, ‘আমার কাছে যে স্বর্ণমুদ্রা ছিল তা মুক্তিপণ হিসেবে গণ্য করা হোক।’ তিনি ৭০০স্বর্ণমুদ্রা কুরাইশ সৈন্যদের জন্যে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। 
তিনি বললেন, ‘তা মুসলমানদের গনিমতের মালে পরিণত হয়েছে। মুক্তিপণ হতে হবে সেগুলো বাদে। তাছাড়া আপনার দুই ভাতিজা আকিল ইবনে আবু তালিব ও নওফেল ইবনে হারেসের মুক্তিপণও আপনাকে পরিশোধ করতে হবে।’
আব্বাস বললেন, ‘আমার উপর এত অধিক অর্থনৈতিক চাপ পড়লে আমাকে কুরাইশদের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে হবে।’
তিনি বললেন, ‘আপনি সেই অর্থ মুক্তিপণ বাবদ দেবেন যা আপনি যুদ্ধে আসার আগে আপনার স্ত্রী উম্মুল ফজলের কাছে রেখে এসেছেন।’
একথা শুনে আব্বাস অতি অবাক হয়ে তার মুখপানে চেয়ে রইলেন। 

বদর যুদ্ধে কুরাইশদের পক্ষে যুদ্ধ করতে এসে মুহম্মদের জামাতা আ‘স বন্দী হয়েছিলেন। পিতার নব্যুয়ত প্রাপ্তির পর কন্যা জয়নব ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তার স্বামী আ‘স পৌত্তলিক রয়ে গিয়েছিলেন। আ‘স ছিলেন খাদিজার ভাগিনেয় এবং তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও ধনী। আ‘সকে কখনই মুহম্মদ বা খাদিজা কেউই ইসলাম গ্রহণের জন্যে পীড়াপীড়ি করেননি বা জয়নবকে তার কাছ থেকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টাও করেননি। মুহম্মদ যখন তার পরিবারকে মক্কা থেকে মদিনায় স্থানান্তরিত করেন, তখন জয়নব তার স্বামীর গৃহেই রয়ে গিয়েছিলেন। 
        
বন্দীরা মদিনায় আনীত হলে অন্যান্য বন্দীর মত আ‘সেরও মুক্তিপণ নির্ধারিত হয়। তখন জয়নব তার স্বামীর মুক্তিপণ বাবদ কিছু অর্থ ও একটি মুল্যবান স্বর্ণহার পাঠিয়ে দেন। এই হার বিবি খাদিজা জয়নবকে বিবাহে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। হারটি দেখে মুহম্মদ বিচলিত হয়ে পড়লেন এবং আ’সের কাছ থেকে মুক্তিপণ বাবদ প্রদেয় হারটি গ্রহণ না করার জন্যে শিষ্যদের অনুমতি প্রার্থনা করলেন। তারা সম্মত হল। আ‘সকে হারটি ফিরিয়ে দেয়া হল একটি মাত্র শর্ত দিয়ে যে, তিনি জয়নবকে মদিনায় পাঠিয়ে দেবেন। 
আ‘স তার কথা রক্ষা করেছিলেন।

সমাপ্ত।

বিদ্র: জয়নব খাদিজার কন্যা হোক বা তার বোন হালার, বিবি খাদিজা  ও মুহম্মদ তাকে লালন-পালন করেছেন এতে কোন বিতর্কের অবকাশ নেই।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন