pytheya.blogspot.com Webutation

২৮ মার্চ, ২০১২

Hindustan: প্রাচীন ধর্ম ও সংস্কৃতি।

প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশ (Hindustan)। এই অঞ্চলের আদিম অধিবাসীরা ছিল দ্রাবিড়। বর্তমান তামিলের আদি নাম দ্রাভিদা। সম্ভবত: এই অঞ্চলে বসবাসের কারণেই তারা কালক্রমে দ্রাবিড় নামে পরিচিতি লাভ করে। দ্রাবিড়গণ ভূ-মধ্যসাগরীয় অঞ্চল, ক্রীট দ্বীপ ও অপরাপর সন্নিহিত অঞ্চল হতে ক্রমান্বয়ে উপমহাদেশের উত্তর পশ্চিম সীমান্ত পথে প্রথমে বেলুচিস্থানে বসতি স্থাপন করে। অত:পর তাদের একটি শাখা সিন্ধু নদীর উপত্যকা বরাবর বসতি স্থাপন করতে করতে অগ্রসর হয়। প্রাচীনকালে ভূ-পৃষ্ঠের স্থলভাগ ঘন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ থাকায় সুবিধাজনক ও নিরাপদ যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীপথ। এ কারণে বসতি ও ব্যবসা কেন্দ্র নদ-নদীর তীরবর্তী অঞ্চলসমূহে গড়ে উঠেছিল। এভাবে খ্রী:পূ: ৪,৫০০ বৎসর পূর্বে দ্রাবিড়গণ কর্তৃক মহেঞ্জদারো (Mohenjodaro) ও হরপ্পাতে (Horoppa) দু‘টি নগর কেন্দ্রিক প্রাকবৈদিক সভ্যতার সূচনা ঘটে- যা সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত। একই ভাবে পৃথিবীর বড় বড় নদীর উপত্যকায় বিভিন্ন সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। যেমন-নীল নদের উপত্যকায় মিসরীয় সভ্যতা, টাইগ্রীস উপত্যকায় অ্যাসিরীয় সভ্যতা এবং ফোরাত উপত্যকায় ব্যাবিলীয় সভ্যতা প্রভৃতি। 

মহেঞ্জদারো সভ্যতা।
দ্রাবিড়রা সমাজবদ্ধভাবে ছোট ছোট নগরে বাস করত। কৃষিই ছিল তাদের প্রধান উপজীবিকা। তবে ব্যবসা-বাণিজ্যও তাদের জানা ছিল। সোনা, রূপা, তামা ও লোহার ব্যাবহারও তারা জানত। আত্মরক্ষার জন্যে তীর-ধনুক, বল্লম, তরবারী প্রভৃতির ব্যাবহার তারা শিখে ফেলেছিল। তারা কৃষির প্রয়োজনে বাঁধ নির্মাণ করতে পারত। এমন কি পাকা দালান কোঠা নির্মাণ করতেও তারা শিখেছিল। পোশাক-পরিচ্ছদ ও অলঙ্কারাদি ব্যাবহারের পাশাপাশি তারা নৌকা ও ছোট ছোট জাহাজ নির্মাণ করত যা যোগাযোগ ও বাণিজ্যের কাজে ব্যবহৃত হত। 

 হরপ্পা সভ্যতা।
দ্রাবিড় সমাজে বিবাহ প্রথা প্রচলিত ছিল, তবে এটি ছিল মাতৃপ্রধান সমাজ। মাতা সন্তানদের নিয়ে বসবাস করত। তবে পিতা পরিবারের সাথে থাকতে পারত না।

দ্রাবিড়রা মাতৃদেবীর পূজা করত এবং দেবতার সন্তুষ্টি অর্জণে নরবলি দিত। তবে তাদের মধ্যে পাপ-পূণ্যের কোন ধারণা ছিল না। বর্তমানে দক্ষিণ ভারত ও সিংহলের অধিবাসী যারা তামিল, তেলেগু, মালয়ালম, কানাড়ী ভাষাভাষী তারাই সূ-প্রাচীন দ্রাবিড়দের বংশধর।

খাদ্যাভাব, স্থানাভাব ও গৃহবিবাদের কারণে আর্যরা তাদের আদি বাসস্থান মধ্য এশিয়ার ব্যাকটেরিয়া হতে দলে দলে বেরিয়ে পড়ল। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল পশু পালনের জন্যে চারণ ভূমি দখল করা। এইসব আর্যদের এক অংশ খ্রী:পূ: ২য় সহস্রাব্দে উত্তর-পশ্চিম খায়বর গিরিপথ দিয়ে ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করল এবং তাদের একটি শাখা পারস্য বা ইরানে চলে গেল। আর্য জাতির যে অংশ ইউরোপে চলে যায় বর্তমানে তারাই বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতি নামে পরিচিত। যেমন- এ্যাংলো স্যকশনের নামানুসারে বর্তমান ইংল্যন্ড, ফ্রাঙ্ক এর নামানুসারে বর্তমান ফ্রান্স ইত্যাদি।

প্রাচীন ভারতবর্ষ,১৮৩১।
আর্যরা শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজেদের গৃহস্থলি, পশু, আসবাবপত্র এবং দেবদেবী নিয়ে অধিবাসী হিসেবে এই উপমহাদেশে আগমন করেছিল। অত:পর দৈহিক শক্তি, নিষ্ঠুরতা, দু:সাহস ও দক্ষতা প্রভৃতি কারণে তারা উত্তর ভারতের আদি অধিবাসীদের উপর প্রভুত্ব অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। তারা সর্বপ্রথমে পাঞ্জাবে বসতি স্থাপন করেছিল। অত:পর পূর্বাঞ্চলে বসতি বিস্তার করে কোশল ও কাশী রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে তারা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের উপর আধিপত্য অর্জন করতে চাইলে যুদ্ধের সূচণা ঘটে। দীর্ঘ সংগ্রামের পর তারা সিন্ধু বিধৌত অঞ্চল- সপ্তসিন্ধুর দখল কায়েমে আনে। সিন্ধু, বিতস্তা, চন্দ্রভাগা, ইরাবতী, বিপাশা, শতদ্রু ও স্বরস্বতী এই সাতটি নদী বিধৌত অঞ্চলটি সপ্তসিন্ধু নামে পরিচিত।

আর্যদের আক্রমণের ফলে সমগ্র সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। অনার্য সিন্ধুর অধিবাসী যারা এই আক্রমণ প্রতিহত করে প্রাণে বেঁচেছিল তারা তাদের বাসস্থান পরিত্যাগ করে দক্ষিণ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আর যারা বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল তারা আর্য সমাজে নিম্নস্তরের জীবন-যাপনের সুযোগ পেয়েছিল। ক্রমে ক্রমে আর্যরা সমগ্র উত্তর ভারতে তাদের আধিপত্য বিস্তার করে এবং বিহার, বারাণসী, বঙ্গদেশ প্রভৃতি স্থান দখল করে নেয়। এভাবে হিমালয় হতে বিন্ধ্যা পর্বত এবং বঙ্গোপসাগর হতে আরব সাগর পর্যন্ত সমগ্র ভারতে তাদের প্রভাব সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

সপ্তসিন্ধু।
যে সময় গঙ্গা উপত্যকার পূর্বাঞ্চালে আর্য সভ্যতার বিস্তার ঘটছিল, সেই সময় হস্তিনাপুর, অহিচ্ছত্র এবং কৌশম্বীতে আর্য সভ্যতা পরিপূর্ণ বিকাশ লাভ করেছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক দূর্যোগে হস্তিনাপুর ও কৌশম্বী নগরীদ্বয় ধ্বংস প্রাপ্ত হলে সুযোগ মত লিছবী উপজাতীরা বিদেহ রাজ্যটি দখল করে নেয়। এসময় এই বিদেহ রাজ্যের দক্ষিণে মগধ নামে আর একটি রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। 

উপমহাদেশে আগমনকারী আর্যরা ৫টি গোত্র ছিল। এ কারণে তারা নিজেদেরকে পঞ্চজাতি বলত। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে সমাজ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এল। কয়েকটি পরিবার নিয়ে গোত্র, কয়েকটি গোত্র নিয়ে গ্রাম, কয়েকটি গ্রাম নিয়ে বিশ, কয়েকটি বিশ নিয়ে জনপদ অথবা কয়েকটি জনপদ নিয়ে একটি মহাজনপদ গঠিত হয়েছিল। 

গ্রীষ্মে ঝিলম নদী।
আর্য সমাজে পিতা হত পরিবারের প্রধান। আর গোত্র প্রধান হত গোত্রের সবচেয়ে বয়সী গণ্যমান্য ব্যক্তি। অন্যদিকে গ্রাম, বিশ, জনপদ বা মহাজনপদের প্রধানগণ নির্বাচিত হত। জনপদ বা রাজ্য প্রধান (রাজা) নির্বাচিত হত ক্ষত্রিয়দের মধ্যে থেকে সেই ব্যক্তি যে বিজয়ী সমরনায়ক অথবা সম্মুখ সমরে সুযোগ্য নেতৃত্বদানে সক্ষম সাহসী যোদ্ধা।

আর্যগণ যখন উপমহাদেশে আগমন করে তখন তাদের মধ্যে কোন জাতিভেদ ছিল না। তারা ছিল গৌর বর্ণ, দীর্ঘকায় এবং অনার্য আদিবাসীরা ছিল কৃষ্ণ বর্ণ। পরবর্তীতে বৈদিক যুগে সমাজ ব্যবস্থা জটিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুণ ও কর্মভেদে তাদের মধ্যে চারটি বর্ণের উদ্ভব হয়। এগুলি হল-

ক) ব্রাহ্মণ: পূজা-পার্বন, যাগ-যজ্ঞ, ধর্মশাস্ত্র পাঠ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার যারা সংরক্ষিত করেছিল।
খ) ক্ষত্রিয়: অস্ত্র-শস্ত্রের ব্যাবহার, দেশরক্ষা ও দেশ শাসনে যারা নিয়োজিত হত।
গ) বৈশ্য: ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিকাজ ও পশুপালনের দ্বারা যারা জীবিকা নির্বাহ করত।
ঘ) শূদ্র: উপরোক্ত তিন শ্রেণীর সেবাকাজে যারা ব্যপ্ত হয়েছিল।

এই শ্রেণী বিভাগের ব্যাখ্যায় ব্রাহ্মণরা প্রচার করেছিল যে পৃথিরীর সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা তার শরীরের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন। ব্রহ্মার মুখ থেকে সৃজিত হয়েছে ব্রাহ্মণ এবং এই কারণে তারা দেবতার পক্ষ থেকে কথা বলতে পারে, হাত থেকে সৃষ্টি হয়েছে ক্ষত্রিয় অর্থাৎ যোদ্ধা শ্রেণী, উরু থেকে বৈশ্য অর্থাৎ বণিক শ্রেণী, আর পদযুগলের ময়লা থেকে শূদ্র অর্থাৎ ভৃত্য শ্রেণী। শূদ্রদের জীবন ছিল অতি কষ্টের, কিন্তু তার চেয়েও কষ্টের ও লাঞ্ছনার জীবন ছিল তাদের যারা ছিল অচ্ছুৎ। অচ্ছুৎ গণ্য করা হত তাদের যারা এই চতুর্বর্ণের কোনটার মধ্যেই পড়ে না। অচ্ছুৎরা সবচেয়ে নোংরা কাজ করতে বাধ্য থাকত। এরা হল মুচি, ম্যাথর বা ডোম, কাওরা বা শুকর পালক ইত্যাদি। মনে করা হত এদের গাত্র স্পর্শ করা মাত্রই কোন লোক অপবিত্র হয়ে যায়। ভূমিষ্ঠ হওয়ার মূহূর্ত থেকেই অচ্ছুতের সন্তানকে অশুচি ভাবত লোকে।

ব্রাহ্মণরা বিভিন্ন বর্ণভূক্ত লোকজনের জন্যে নির্দিষ্ট ধরণের কাজ ও আচার ব্যাবহারের এমন কঠোর নিয়ম বেঁধে দিয়েছিল-
  • শরীরের সর্বোত্তম প্রত্যঙ্গ থেকে উৎপত্তি লাভের ফলেই একজন হয় ব্রাহ্মণ-সারা পৃথিবীর প্রভু। ব্রাহ্মণদের যদি কিছু ভাল লাগে, বিনা খেদে তাকে তা প্রদান করা উচিৎ।
  • ঈশ্বর শুধুমাত্র একটি কর্তব্য সমাধার জন্যেই শূদ্রদের নির্দেশ দিয়েছেন: বিনয়াবনত চিত্তে তোমা অপেক্ষা উচ্চবর্ণের লোকদের সেবা কর। 
  • উচ্চ বর্ণদের সম্পর্কে যদি কোন শূদ্র অপমানজনক কোন কথা বলে, তবে তার মুখ উত্তপ্ত লৌহপিন্ড দ্বারা বন্ধ করে দাও। ব্রাহ্মণদের সঙ্গে তর্করত শূদ্রদের মুখ ও কানে ফুটন্ত তেল ঢেলে দিতে রাজাই আদেশ দেবেন।
  • শূদ্র ব্রাহ্মণকে হাত বা ষষ্ঠি দ্বারা প্রহার করার চেষ্টা করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলার জন্যে যোগ্য হয়, আর রাগান্বিত হয়ে পা দ্বারা আঘাত করলে তার পা কেটে ফেলা উচিৎ। 
  • ব্রাহ্মণের ক্ষেত্রে মৃত্যুদন্ডের স্থলে মস্তক মুন্ডনই চরম শাস্তি।
  • ব্রাহ্মণকে বাদ দিয়ে ক্ষত্রিয় কখনও সাফল্য লাভ করে না এবং ক্ষত্রিয় ব্যাতিরেকে ব্রাহ্মণেরও কোন সাফল্য নেই।
  • ঈশ্বরই রাজা ও ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করেছেন, যাদের কাজ হল এইসব নিয়ম ঠিকমত পালিত হচ্ছে কিনা তা দেখা।
আর্যরা স্বর্গ ও মর্ত্যকে দেবতা জ্ঞানে অর্চণা করত। এভাবে ইন্দ্র বজ্রের দেবতা ছিল। অগ্নিকেও তারা দেবতার আসনে বসিয়েছিল। দেবতাদেরকে মহান ও শক্তিশালী মনে করা হত। আর্যদের মতে দেবতারা উপাসনাকারীদের মঙ্গল সাধনে ইচ্ছুক এবং অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে নিয়ত সংগ্রামে লিপ্ত।

এই উপমহাদেশে আগমন কালে আর্যগণ কোনরূপ পূজার সাথে জড়িত ছিল না। তারা স্তুতি ও উৎসর্গের দ্বারা দেবতাদের অর্চণা করত মাত্র। তাদের ধর্ম একেশ্বরবাদী না হলেও তাদের মধ্যে একেশ্বরবাদের ধারণা প্রচলিত ছিল। কালক্রমে তাদের এইসব রীতিনীতি এবং চিন্তাধারা যা তারা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, অনার্য রীতি-নীতি তাদের সমাজে প্রবেশ করাতে তার ক্রমাগত গ্রহণ ও বর্জন চলতে লাগল এবং একসময় তারা কর্মফল ও জন্মান্তরবাদে বিশ্বাসী হয়ে পড়েছিল। এই মতবাদই বর্তমান হিন্দু ধর্মের জন্ম দেয়।

উপমহাদেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আর্যদের অবদান অপরিসীম। তাদের রচিত প্রথম সাহিত্যের নাম বেদ। বেদ অর্থ জ্ঞান। এই বেদ চারটি ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা- ঋগ্বেদ, সামবেদ, যজুর্বেদ এবং অথর্ববেদ। ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে আর্যদের অবদান না থাকলেও তাদের এইসব সাহিত্য ইতিহাস রচনায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়।

সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাথে সাথে বেদ আবারও চারভাগে বিভক্ত হয়েছে। যেমন- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। উপনিষদ বেদের একেবারে শেষভাগে রচিত বলে একে বেদান্ত বলা হয়ে থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আর্যদের রচিত এই বেদ-পূরাণে এক কলি অবতারের (মহাপুরুষ) আগমন বার্তা ঘোষণা করে তার জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটনা সমূহের বিস্তারিত ভবিষ্যৎ বাণী বর্ণনা করা হয়েছে। ঐসব গ্রন্থে বলা হয়েছে একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখ নিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। সেই কলি অবতার হচ্ছেন শেষ নবী মুহম্মদ। বলা হয়ে থাকে বেদ বাক্য অপরিবর্তনীয় ও অলঙ্ঘনীয়। সুতরাং আমরা কৌতুহলবশত: মুহম্মদ সম্পর্কে বেদ-পূরাণের শ্লোকগুলিতে নজর বুলিয়ে যাব--

উত্তরায়নবেদ:   
লা-ইলাহা হরত্তি পাপম
ইলাহ ইলাহা পরম পাদম
জন্ম বৈকুন্ঠ অপঃ ইন্যুতি
ও জপি নামো মুহামদম।
অর্থ: লা-ইলাহার (এক আল্লাহর) আশ্রয় ব্যতিত পাপমুক্তির কোন উপায় নেই। ইলাহ (আল্লাহ) এর আশ্রয়ই প্রকৃত আশ্রয়। বৈকুন্ঠে জন্মলাভের আশা করলে ইলাহর (আল্লাহর) আশ্রয় নেয়া ছাড়া কোন উপায় নেই। আর এজন্যে মুহম্মদের প্রদর্শিত পথ অনুসরণ অপরিহার্য।

অথর্বেদীয় উপনিষদ: 
অস্য ইল্ললে মিত্রাবরূণো রাজা
তম্মাৎ তানি দিব্যানি পুনস্তং দুধ্যু
হবয়ামি মিলং কবর ইল্লালাং
অল্লোরসূল মহম্মদ কং
বরস্য অল্লো অল্লাম ইল্লল্লোতি ইল্লাল্লা \ ৯ \
অর্থ: যথাসময়ে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। একমাত্র তিনিই হবেন মানব মুক্তির দূত। সকল মানুষকেই তার মুখনিঃসৃত বাণী গ্রহণ করে তার আদর্শে আদর্শবান হতে হবে। এছাড়া মানব মুক্তির কোন পথ খোলা নেই। সেই আল্লাহর রসূল মুহম্মদকে প্রণতি জানাই।
ভবিষ্যৎ পূরাণ:   
এত স্লিন্নস্তরে ম্লেচ্ছআচার্যেন সবন্বিতঃ।
মহামদ ইতি খ্যাতঃ শিষ্য শাখা সমন্বিতঃ \৫\
নৃপশ্চৈব মহাদেবং মরুস্থ'ল নিবাসিনম
গঙ্গা জলৈশ্চ সংস্পপ্য পঞ্চগব্য সমন্বিতৈঃ
চন্দনাদি ভিরভ্যর্চ তুষ্টাব মনসা হরম \৬\
নমস্তে গিরিজানাথ মরুস্থল নিবাসিনে 
ত্রিপুরা সুরনাশায় বহুমায়া প্রবর্তিনে \৭\
অর্থঃ যথাসময়ে মুহম্মদ নামে জনৈক মহাপুরুষ আবির্ভূত হবেন। যার নিবাস হবে মরুস্থলে আরব দেশে। সাথে স্বীয় সহচরবৃন্দও থাকবেন।
হে মরুর প্রভূ, হে জগত গুরু, আপনার প্রতি আমাদের স্তুতিবাদ, আপনি জগতের সমুদয় কুলুষাদি ধ্বংসের উপায় অবগত আছেন। আপনাকে প্রণতি জানাই। 

ভোজরাজ উবাচ:   
ম্লেচ্ছৈ গুপ্তায় শুদ্ধায় সচ্চিদানন্দ রূপিণে।
ত্বংমাং হি কিঙ্করং বিদ্ধি শরনার্থ মুপাগতম \৮\
অর্থ: হে মহাত্মা, আমরা আপনার দাসানুদাস। আমাদেরকে আপনার পদমূলে আশ্রয় প্রদান করুন।

অলোপনিষদ:
হোতার মিন্দ্রো হোতার মিন্দ্রো মহাসুরিন্দ্রাঃ।
অল্লো জ্যেষ্ঠং শ্রেষ্ঠং পরমং পূর্ণং ব্রহ্মাণ অল্লাম
অল্লো রসূল মহমদ কং বরস্য অল্লো অল্লাম 
আদল্লাহ্ বুকমে ককম অল্লাবুক নিখাতকম \৩\
অর্থ: ‘আল্লাহ সকল গুণের অধিকারী। তিনি পূর্ণ ও সর্বজ্ঞানী। মুহম্মদ আল্লাহর রসূল।  আল্লাহ আলোকময়, অয়, এক, চির পরিপূর্ণ এবং স্বয়ম্ভূ।’

অথর্ববেদ:    
ইদং জনা উপশ্রুত নরাশংসস্ত বিষ্যতে।
ষষ্টিং সহস্র নবতিংচ কৌরম আরুশ মেষু দবহে \১\
অর্থ: ‘হে মানবজাতি, মনোযোগ দিয়ে শোন, ‘প্রসংশিত জন’ লোকদের মধ্যে থেকে উত্থিত হবেন। আমরা তাকে ষাট হাজার শত্রুর মাঝে পেলাম। (মুহম্মদ নামের অর্থ প্রশংসিত জন আর তৎকালীন আরববাসীর সংখ্যা ছিল প্রায় ষাট হাজার।)’- ইত্যাদি।

যা হোক, আর্যদের দ্বারা উপমহাদেশের সাহিত্য ভান্ডার পরবর্তিতে আরও সমৃদ্ধ হয়। মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যসদেব মহাভারত এবং মহর্ষি বাল্মীকি রামায়ণ মহাকাব্য রচনা করলেন। সংস্কৃত ভাষায় এই মহাকাব্য দু‘টি রচিত হয়েছিল। ধারণা করা হয় আর্যদের যাগ-যজ্ঞাদিতে যে সমস্ত বীরগাঁথা পঠিত হত তা থেকেই এই মহাকাব্য দু‘টির উৎপত্তি।

মহাভারত পৃথিবীর দীর্ঘতম মহাকাব্য। প্রায় এক লক্ষেরও বেশী শ্লোক সন্নিবেশিত রয়েছে এতে। অন্যদিকে রামায়ণ মহাভারত অপেক্ষা অনেক ছোট কাব্যগ্রন্থ- মহাভারতের প্রায় এক চতুর্থাংশ। মহাভারত মহাকাব্য দুই রাজ পরিবারের মধ্যে ক্ষমতালাভের দ্বন্দ্ব নিয়ে রচিত হয়েছে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যসদেব অসম্ভব কল্পণার অপরূপ অলংকরণে সজ্জ্বিত করেছেন এই মহাকাব্যের পংক্তিগুলো। তবে আমরা কাব্যিক অলঙ্কার বিশ্লেষণে না গিয়ে বরং মহাভারতের কাহিনীটাতে একবার নজর বুলিয়ে যাই-

"পান্ডবদের পাঁচ ভাই অকালে পিতৃহীন হয়ে পড়ে। তাদের পিতৃব্য এবং তার সন্তানেরা তাদের স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করে। বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে পঞ্চপান্ডব অমিত বিক্রমশালী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সে সময়ে পার্শ্ববর্তী একটি দেশের রাজা ঘোষণা করেন যে, যে ব্যক্তি সোনালী মাছের চোখ তীরবিদ্ধ করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে, সে তার কন্যার পাণি গ্রহণ করতে পারবে। মাছটিকে একটি গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে তার সামনে পাখা বিশিষ্ট একটি চক্র সর্বদা ঘূর্ণায়মান রাখা হয়েছিল। সমগ্র ভারতবর্ষ থেকে তরুণের দল এসে জমায়েত হয়েছিল রাজদরবারে। এই পরীক্ষায় শুধুমাত্র পান্ডবদের একভাই উত্তীর্ণ হয়েছিল এবং সেই রাজকন্যাকে বিবাহ করেছিল।

পান্ডবদের মধ্যে যে জৈষ্ঠ্য সে নিজে সহ চার ভাই ও রাজকন্যাকে বাজী রেখে দ্যূতক্রীড়া খেলতে বসে এবং পরাজিত হয়। পরাজয়ের ফলে সকলকে দাস জীবন যাপন করতে হয়। অনেক পরে দাসত্ব থেকে তারা মুক্তি পায় বটে, কিন্তু নির্বিঘ্নে সহজ পন্থায় নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তখন শুরু হয় পঞ্চ পান্ডবভ্রাতা ও তাদের পিতৃব্যপুত্রদের মধ্যে মরণপণ সংগ্রাম। পন্ডবদের সবচেয়ে প্রধান শত্রুর কথা ছিল: "হয় আমি ওদের ধ্বংস করে পৃথিবী শাসন করব, নয়ত: আমার মৃত্যুর পর পারলে ওরা শাসন করুক।"

জনগোষ্ঠির কিছু দল গেল পন্ডবদের পক্ষে, আর অন্যরা গেল শত্রুদের দিকে। তাদের মধ্যে যুদ্ধ চলেছিল আঠার দিন। শত্রু নিধনের সাধনায় উভয় পক্ষই সবকিছু ভুলে প্রাণপণে যুদ্ধ করেছিল। সমস্ত যুদ্ধক্ষেত্র জুড়ে বোঁ বোঁ শব্দে তীরের আনাগোনা, রথে রথে সংঘর্ষ, আকাশে মেঘের ন্যায় বিশাল হস্তীযুথ একে অন্যের উপর প্রচন্ড হিংসায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পরস্পর পরস্পরকে ছিন্ন ভিন্ন করতে লাগল। যুদ্ধরত অশ্বারোহী সেনা ছুটে বেড়াচ্ছে পাখির মত দ্রুত গতিতে, হিস হিস শব্দে বায়ূ ভেদ করে ছুটে যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে তীর। সমগ্র যুদ্ধক্ষেত্র মৃত ও আহত মানুষের দেহে ঢেকে গেল, এই মহাযুদ্ধের যারা হোতা তাদের প্রতি উৎক্ষিপ্ত অভিশাপে পূর্ণ হয়ে গেল সমরভূমি।

না এ-পক্ষে, না ও-পক্ষে, কোনদিকেই জয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত অবশ্য পান্ডবরাই জয়ী হল। তারাই অবশেষে সিংহাসনে আরোহণ করে সমুদ্র পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করল।"

অন্যদিকে রামায়ণ মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে রাজকুমার রামের কাহিনী। "রামকে নির্বাসনে পাঠান হয়, তার পত্নী রাবণের হাতে বন্দী হয়। রাবণ ছিল শ্রীলঙ্কার রাজা। রাম হনুমান নিয়ে একটি সেনাবাহিনী ও ভল্লুক বাহিনী গঠন করে। তারপর তার বাহিনী নিয়ে রাবণের রাজ্য লঙ্কা দ্বীপে গিয়ে হাজির হয়। রামের হনুমান বাহিনী লঙ্কাতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে এক 'লঙ্কাকান্ড' ঘটিয়ে ফেলে। অন্যদিকে দ্বন্দ্ব যুদ্ধে রাম রাবণকে হত্যা করে পত্নীকে মুক্ত করে এবং তাকে নিয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করে।"

খ্রী:পূ: ষষ্ঠশতকে ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় চিন্তার জগতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হল। ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের বিরুদ্ধে ধীরে ধীরে গড়ে উঠা উষ্মা ও ক্ষোভ এই নূতন ধর্মীয় মতবাদের উদ্ভবের কারণ। এই ধর্মীয় বিপ্লব সাধিত হল ক্ষত্রিয়দের দ্বারা। বৈদিক ধর্মের জটিলতা, বাহ্যিক আড়ম্বর সর্বস্ব ধর্মীয় বিধি, যাগ-যজ্ঞাদি, নরবলি, সর্বোপরি পুরোহিত শ্রেণীর প্রাধান্য তাদেরকে ধর্মীয় মুক্তির পথ সন্ধানে উদ্বুদ্ধ করেছিল। প্রথম তীর্থাঙ্কর বা মুক্তির পথপ্রদর্শক ছিলেন ঋষভদেব। পরবর্তীতে একে একে আরও ২৩ জন তীর্থাঙ্করের আগমন ঘটে ধরণীতে। সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর মহাবীরের পূর্ববর্তী তীর্থাঙ্কর ছিলেন পার্শ্বনাথ। তার জন্ম ক্ষত্রিয় রাজবংশে। তিরিশ বৎসর বয়সে তিনি রাজপরিবারের বিলাসী জীবন-যাপন পরিত্যাগ করে সত্য সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে একসময় তিনি বর্তমান কাশীর নিকটবর্তী পরেশনাথ পর্বতে কঠোর সাধনায় লিপ্ত হন এবং সিদ্ধি লাভ করেন। অহিংসা, সত্য, অন্তেয় (অচৌর্য) ও অপরিগ্রহ (সন্ন্যাস) এই চারটি তার প্রচারিত ধর্মের মূল মন্ত্র যা চতুর্যাম নামে পরিচিত।

সর্বশেষ তীর্থাঙ্কর ছিলেন মহাবীর। পার্শ্বনাথের মৃত্যুর আড়াই‘শ বৎসর পর তার আবির্ভাব ঘটে। তার বাল্যনাম ছিল বর্ধমান। তিনি বর্তমান উত্তর বিহারের বৈশালীর নিকটবর্তী কুন্দপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সিদ্ধার্থ ছিলেন একজন ক্ষত্রিয় দলপতি। আর তার মাতা ত্রিশলা ছিলেন বৈশালী রাজের ভগ্নি।

মহাবীর যশোদা নাম্নী এক রাজকন্যার পাণি গ্রহণ করেছিলেন। কয়েক বৎসর সংসার যাপনের পর তাদের এক কন্যা সন্তান জন্মগ্রহন করে। এই সন্তান জন্মের পরপরই ৩০ বৎসর বয়সে তিনি সংসারত্যাগী হন।

দীর্ঘ বার বৎসর কঠোর সাধনার পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভ করতে না পেরে গোসাল নামের এক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে ছয়মাস তার সাথে অতিবাহিত করেন।

ইতিমধ্যে তার সন্যাস জীবনের তের বৎসর পূর্ণ হল। এসময় তিনি পূর্ব ভারতের ঋজুপালিকা নদীর তীরে বর্তমান পরেশনাথ পাহাড়ের নিকটবর্তীতে পুন:রায় কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হলে, এবার তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে সমর্থ হন।
মহাবীর সকল রিপু জয় করেছিলেন বলে লোকেরা তাকে জিন বা জয়ী বলত।

বুদ্ধের জন্মস্থান, লুম্বিনী।
মহাবীর দীর্ঘ ৩০ বৎসর ধর্ম প্রচার করেছিলেন। মগধরাজ বিম্বিসার ও অজাতশত্রু তাকে প্রচারকার্যে সহায়তা করেন। ধর্ম প্রচারকালে বর্তমান পাটনার পাব্য নামক স্থানে ৪৬৭ খ্রী:পূ: ৭২ বৎসর বয়সে এই মহান ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেন।
মহাবীরের প্রচারিত ধর্মমত নিগ্রন্থ বা সম্পর্কমুক্ত নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু কালক্রমে তার জিন উপাধির অনুকরণে এই ধর্ম জৈনধর্ম নামে পরিচিতি লাভ করে। মহাবীরের নামের সাথে জৈনধর্ম পরিচিতি লাভ করলেও প্রকৃতপক্ষে পার্শ্বনাথ এই ধর্মের মূল ভিত্তি স্থাপন করে গিয়েছিলেন। তার প্রবর্তিত চতুর্যামের সাথে মহাবীর ব্রহ্মচর্য সংযুক্তি করেন।
মহাবীর পার্থিব ভোগ-বিলাসের সাথে সাথে পরিধানের বস্ত্র পর্যন্ত ত্যাগ করেছিলেন। এ কারণে তার অনুসারীরা দ্বিগম্বর নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে জৈনদের মধ্যে শ্বেতাম্বর নামে অপর এক শাখার উদ্ভব হয়।

বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের সাথে জৈনদের মূল পার্থক্য হল-এরা বেদের কর্তৃত্ব স্বীকার করে না এবং দেবতার সন্তুষ্টি কামনায় পূজা ও পশু বলি করে না। তাদের চরম উদ্দেশ্য সিদ্ধি বা নির্বাণ লাভ করা। আর এই সিদ্ধি লাভের উপায় হল তিনটি-সৎকর্ম, কৃচ্ছসাধনও কঠোর সংযম। সংসারে বসবাস করে সিদ্ধিলাভ সম্ভব নয়। তাই সংসারত্যাগী জৈনরা মঠ, আশ্রম বা সঙ্ঘে বাস করে।

ধ্যানরত বুদ্ধ মূর্ত্তি, সারনাথ।
জৈনরা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। তাদের মতে বিশুদ্ধ বা পূর্ণ বিকশিত মানবাত্মাই দেবতা। তারা বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের মত পুনর্জন্ম ও কর্মবাদে বিশ্বাসী। মূল, সূত্র, রঙ্গ ও উপাঙ্গ -এই চারটি জৈনদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ।

খ্রী:পূ: ৫ম শতকে হিমালয়ের পাদদেশে তরাই অঞ্চলে শাক্য জাতির বসবাস ছিল। শুদ্বোধন ছিলেন এই জাতির রাজা যিনি ক্ষত্রিয় বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।শুদ্বোধনের স্ত্রী রানী মায়াদেবী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মের সময় পিতৃগৃহের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে প্রসব বেদনা শুরু হয়ে গেলে কপিলাবস্তুর নিকটবর্তী লুম্বিনী গ্রামে ৫১৮ খ্রী:পূ: এক পুত্রসন্তান প্রসব করতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এই শিশুসন্তানই 'সিদ্ধার্থ'।

মায়াদেবীর মৃত্যুর কারনে বিমাতা গৌতমী সিদ্ধার্থকে লালন-পালনের ভার নেন। বিমাতা গৌতমীর কারণে তার অপর নাম হয় 'গৌতম'। আবার শাক্যকূলে জন্মগ্রহণ করেন বলে তার অপর এক নাম 'শাক্যসিংহ'।

বাল্যকাল থেকেই গৌতম চিন্তাশীল ও উদাসীন ছিলেন। এ কারণে পিতা শুদ্বোধন তাকে সংসারী করতে ৫০২ খ্রী:পূ: মাত্র ষোল বৎসর বয়সে বিবাহ দেন গোপা নাম্নী এক রাজকুমারীর সাথে। এই গোপা-যশোধরা, বিম্বা, শুভদ্রকা নামেও পরিচিত। তের বৎসর সংসার যাপনের পর ৪৮৯ খ্রী;পূ: রাহুল নামে তাদের এক পুত্রসন্তান জন্ম গ্রহণ করে। এই সন্তান জন্মগ্রহনের পরই ২৯ বৎসর বয়সে গৌতম বিলাসী জীবন-যাপন ও সংসারের মায়া ত্যাগ করে জীবনের মুক্তির পথ খুঁজতে বেরিয়ে পড়েন।

ধ্যানরত বুদ্ধ।
সত্যের সন্ধানে গৌতম একাধিক সন্যাসীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করে বহুস্থানে পরিভ্রমণ করেন। কিন্তু নানাভাবে আত্মপীড়ন, ধ্যান ও কৃচ্ছসাধনের পরও তিনি দিব্যজ্ঞান লাভে ব্যর্থ হন। অবশেষে বর্তমান বুদ্ধগয়ার সন্নিকটস্থ উরুবিল্ব নামক স্থানে নিরঞ্জনা নদীতে অবগাহন করে পাশের এক বটমূলে কঠিন তপস্যায় লিপ্ত হলেন। এবার অভীষ্ট অর্জিত হল, পরম সত্য তার মনে উদ্ভাসিত হয়- তিনি বোধিলাভ করেন। 

যে বটমূলে বসে গৌতম দিব্যজ্ঞান লাভ করেন তা বোধিবৃক্ষ বা 'বোধিদ্রুম' নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীকালে গৌড়ের রাজা শশাঙ্ক এই বোধিবৃক্ষটি কর্তন করে ফেলেন।

গৌতম দিব্যজ্ঞান লাভ করেছিলেন ৪৮৩ খ্রী:পূ: ৩৫ বৎসর বয়সে। অত:পর তিনি নিজেকে নিয়োজিত করেন ধ্যানলব্ধ মহাসত্য প্রচারে। তার প্রথম প্রচার স্থান ছিল কাশীর নিকটবর্তী সারনাথে।

ধামেক স্তুপা, সারনাথ।
গৌতম বুদ্ধ মানুষের উদ্দেশ্যে যে উপদেশাবলী প্রদান করেছিলেন তা হল-
ক) হিংসা কোরও না।
খ) চুরি কোরও না।
গ) মিথ্যে বলিও না।
ঘ) পরনিন্দা কোরও না।
ঙ) জীব হত্যা কোরও না। জীব হত্যা মহাপাপ।
চ) ধনসম্পদ পরিত্যাগ কর। এবং
ছ) ব্রহ্মচর্য পালন কর।

সূদীর্ঘ ৪৫ বৎসর ধর্ম প্রচারের পর কূশী নগরে ৪৪৮ খ্রীঃপূঃ ৮০ বৎসর বয়সে গৌতম বুদ্ধ ইহধাম পরিত্যাগ করেন। তার এই তিরোধান বৌদ্ধদের নিকট 'মহাপরিনির্বাণ' নামে অভিহিত।

বুদ্ধ রিলিক স্তুপা, বৈশালী।
বৌদ্ধধর্মমত সহজ সরল ও উদারপন্থী। এই ধর্মনীতিতে মানুষ মানুষে কোন ভেদাভেদ নেই। ধর্মের মূল লক্ষ্য হল-
ক) অন্যায় কার্য থেকে নিজেকে বিরত রাখা।
খ) মনকে পবিত্র রাখা। এবং
গ) যা কিছু ভাল তা অন্তরে সঞ্চয় করা।

গৌতমবুদ্ধ ছিলেন বাস্তবধর্মী সংস্কারক। মানুষের সংসার জীবনের দুঃখ কষ্ট থেকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি চারটি মহা সত্যের প্রচার ও ব্যাখ্যা করেন। এগুলি হল-
ক) সংসারে দুঃখ নিত্য বর্তমান।
খ) দুঃখের নিশ্চয়ই কারণ আছে;
গ) দুঃখের নিবৃত্তিই মানুষের একান্ত কাম্য। এবং
ঘ) দুঃখ নিবৃত্তির যথার্থ উপায় কি তা জানা আবশ্যক।

বুদ্ধের মতে মানুষের দুঃখ কষ্টের মূল কারণ হল তার অজ্ঞতা এবং কোন কিছুর প্রতি আসক্তি। তনহা বা আকাঙ্খার ফলে দুঃখের সূচনা। সুতরাং আকাঙ্খার নিবৃত্তিতে দুঃখেরও নিবৃত্তি। আর এই আকাঙ্খার কবল হতে মুক্তিলাভ করা যায় ৮টি উপায় অবলম্বনের দ্বারা-যা 'অষ্টাঙ্গিক মার্গ' নামে পরিচিত। এগুলি হল-

বুদ্ধ শান্তি স্তুপা, বৈশালী।
ক) সৎ সংকল্প।
খ) সৎ চিন্তা।
গ) সৎ বাক্য।
ঘ) সদ্ব্যবহার।
ঙ) সৎ জীবন-যাপন।
চ) সৎ প্রচেষ্টা।
ছ) সৎ দর্শণ।
জ) সম্যক সমাধি।

গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর তার শিষ্যগণ রাজগৃহ নামক স্থানে এক মহাসভার আয়োজন করে। এই সভা 'বৌদ্ধ সংগীতি' নামে পরিচিত। এই সভায় সকলে বুদ্ধের মূল্যবান উপদেশবাণী গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। সুতরাং এক মহাগ্রন্থ রচিত হল- যা 'ত্রিপিটক' নামে পরিচিত।

অবাক ব্যাপার এই য়ে, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ এক মহাপুরুষের আগমন বার্তা ঘোষণা করেছে, আর তিনি হচ্ছেন শেষ নবী মুহম্মদ। 

দিঘা-নিকায়া:
মানুষ যখন গৌতম বুদ্ধের ধর্ম ভুলে যাবে, তখন আর একজন বুদ্ধ আসবেন, তার নাম ‘মৈত্তেয়’ অর্থাৎ শান্তি ও করুণার বুদ্ধ।

দ্যা গসপেল অব বুদ্ধা:
আনন্দ বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনার মৃত্যুর পর কে আমাদেরকে উপদেশ দেবে?’
বুদ্ধ বললেন, ‘আমিই একমাত্র বুদ্ধ বা শেষ বুদ্ধ নই। যথাসময়ে আর একজন বুদ্ধ আসবেন। আমার চেয়েও তিনি পবিত্র ও অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মমত প্রচার করবেন।’ 
আনন্দ জিজ্ঞেস করলেন, ‘তাকে আমরা চিনব কি করে?’ 
বুদ্ধ বললেন, ‘তার নাম হবে মৈত্রেয়।’ 

এই মৈত্রেয়ই মুহম্মদ। কোরআনে তার সম্পর্কে বলা হয়েছে তিনি ‘রহমাতুল্লিল আলামিন, ‘অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বের জন্যে মূর্তকরুণা ও আশীর্বাদ।

যা হোক, বুদ্ধের মৃত্যুর পর বিভিন্ন সময়ে তার বাণী নিয়ে মতভেদ দেখা দিলে একাধিকবার বৌদ্ধ সংগীতি আহুত হয়। বৈশালীতে ২য় সংগীতি, সম্রাট অশোকের সময় পাটালীপুত্র নগরীতে ৩য় সংগীতি এবং কাশ্মীরে কৃষাণরাজ কনিস্কের সময় ৪র্থ সংগীতি আহুত হয়েছিল। ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে এই সংগীতিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

যে স্থানে বসে বুদ্ধ বোধিলাভ করেছিলেন।
কনিস্কের রাজত্বকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীগণ দু‘ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল যথা-

ক) হীনযানঃ এতকাল বুদ্ধের মূর্ত্তি বা প্রতিকৃতি নির্মাণ করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। বুদ্ধের নিরাকার উপাসনাকে হীনযান বা সুক্ষ্ম ধর্মপথ নামে অভিহিত হত। এ পথে আত্মার পরমশুদ্ধির মাধ্যমে নির্বাণ লাভের চেষ্টা করা হত।

খ) মহাযানঃ মৌর্য সাম্রাজ্যের পতনের পর বিদেশীদের সংমিশ্রণে বৌদ্ধধর্মের উপাসনা পদ্ধতির উপর যে বিরূপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয় তাই মহাযান। এ পদ্ধতিতে বুদ্ধের প্রতিকৃতি নির্মাণের মাধ্যমে উপাসনা করা হত।

এই হীনযান ও মহাযান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় মতভেদ দেখা দিলে কনিষ্ক পার্থ নামের জনৈক বৌদ্ধধর্মাবলম্বীর পরামর্শক্রমে কাশ্মীরে এক বৌদ্ধ সংগীতি আহবান করেন এবং এটাই ৪র্থ ও শেষ সংগীতি। এই সংগীতিতে বসুমিত্র সভাপতি এবং অশ্বঘোষ সহসভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন।

সমাপ্ত।

উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। টেন গ্রেট রিলিজিয়ান্স  - ক্লার্ক।
ছবি: Wikipedia, myguru, maps.google, nationalgeographic, onushilon.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন