pytheya.blogspot.com Webutation

৩০ মার্চ, ২০১২

Gladiator: গ্লাডিয়েটর বিদ্রোহ ও স্পার্তাকাসের কাহিনী।


যুদ্ধে বন্দী লক্ষ লক্ষ দাস এবং রোমের অধিনস্থ প্রদেশগুলোয় নিষ্ঠুর অত্যাচার চালাবার ফলে রোমে দাসের সংখ্যা অত্যধিক পরিমানে বেড়ে যায়। ফলে শত শত দাসদাসী কেনাবেচার বাজার গড়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় বাজার ছিল ইজিয়ান সাগরের মধ্যে দেলোস দ্বীপে: এই বাজারে দিনে ১০ হাজার পর্যন্ত দাসদাসী ক্রয়-বিক্রয় হত। এইসব দাসদের বেশীর ভাগই ইটালীতে রপ্তানি হত। আর তাদেরকে ব্যাবহার করা হত কৃষিকাজে, খনিতে, জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বা জাহাজের মাঝিমাল্লা হিসেবে।

দেলোস দ্বীপ।
রোমান দাস মালিকেরা বলত যন্ত্র তিন প্রকার- নীরব যন্ত্র- যথা- গাড়ি, লাঙ্গল; সরব যন্ত্র- যেমন- ষাঁড়; আর সবাক যন্ত্র-তথা দাস। দাস হবার পর লোকের নিজের আর কোন নাম থাকত না, তাকে নতুন নামে ডাকত সবাই, আর প্রায়শ:ই সেই নাম হত অবজ্ঞাপূর্ণ ও লাঞ্ছনাদায়ক।

দাস অত্যন্ত সস্তা ছিল বলে, দাস মালিকেরা তাদের দিয়ে অসম্ভব কষ্টসাধ্য কাজ করাত। গ্রীষ্মের প্রখর রৌদ্রে দৈনিক ১৮ ঘন্টা ক্ষেতে বা খনিতে কাজ করত তারা। অপর্যাপ্ত আহার, অত্যধিক পরিশ্রম এবং কোন চিকিৎসা না থাকায় মাত্র কয়েক বৎসর দাস জীবন-যাপন করলেই একজন শক্ত সামর্থ্য যুবক পঙ্গু হয়ে যেত। অকর্মণ্য দাসদের জনমানব শুণ্য কোন দ্বীপে ফেলে আসা হত, সেখানেই অনাহারে একসময় প্রাণ ত্যাগ করত তারা। তাদের শুন্যস্থান পূরণ হত নতুন দাসদের দ্বারা, বাজারে কোন সময়ই দাসের কোন অভাব ছিল না।

দাসদের মধ্যে যারা ক্ষিপ্র, চটপটে ও শক্তিশালী ছিল তাদেরকে রোমবাসীগণ অস্ত্রচালনা শিক্ষা দিত এবং পরে তাদের একজনকে অন্যজনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে বাধ্য করত।এই দাসদের বলা হত গ্লাডিয়েটর (Gladiator)।

গ্লাডিয়েটরদের দ্বন্দ্বযুদ্ধ দেখার জন্যে অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন বা অ্যাম্ফিথিয়েটার (Amphitheatre) তৈরী করা হয়েছিল ইটালী ও তার পার্শ্ববর্তী সকল প্রধান প্রধান শহরে। অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন দেখতে ছিল সার্কাসের মঞ্চের মত। এর ঠিক কেন্দ্রস্থলে থাকত বালুময় উন্মুক্তস্থান, যাকে বলা হত আরেনা (arena)। এই আরেনার চতুর্দিকে ধাপে ধাপে দর্শকদের বসার স্থান ছিল। 

অ্যাম্ফিফেয়াত্রোন
উৎসবাদির সময়ে এই গ্লাডিয়েটরদের দ্বৈরথ অনুষ্ঠিত হত বিনোদনের জন্যে। দাস মালিকেরা তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে ঐ পৈচাশিক দ্বৈরথ উপভোগ করত। দ্বৈরথে পরাজিত কিন্তু তখনও জীবিত- এধরণের গ্লাডিয়েটরদের ভাগ্য দর্শকদের উপর ছেড়ে দেয়া হত। দর্শকরা হাত তুললে তার জীবন রক্ষা পেত, আর যদি তারা হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল নীচের দিকে করত, তাহলে বিজয়ী তাকে হত্যা করত। পরে ভৃত্যেরা আঙটা পরানো লাঠি দিয়ে মৃতদেহকে আরেনার বাইরে টেনে নিয়ে যেত। সিংহ, বাঘ ও অন্যান্য হিংস্র পশুদের সাথেও গ্লাডিয়েটরদের এধরণের যুদ্ধ করতে হত।

পরাজিতের ভাগ্য জানার অপেক্ষায়।
কাপূয়া শহরে গ্লাডিয়েটরদের জন্যে একটা বড় শিক্ষা কেন্দ্র ও কারাগার ছিল। ৭৪ খ্রী:পূর্বাব্দে বন্দীরা সেখানে এক ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিতে থাকে। কারাগারের প্রহরী এই ষড়যন্ত্রের কথা জানতে পারে। তা সত্ত্বেও বেশকিছু বন্দী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পলাতকগণ ভিসুভিয়াস পর্বতের চূঁড়ার আশ্রয় নেয়। এই পলাতক গ্লাডিয়েটরগণ স্পার্তাকাসকে নিজেদের নেতা নির্বাচিত করে। 

স্পার্তাকাস তার প্রচন্ড শক্তি, সাহস ও বুদ্ধির জন্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি ছিলেন বলকান দ্বীপের অধিবাসী, রোমকগণ তাকে বন্দী করে নিয়ে অসে। বন্দী অবস্থায় পলায়ন করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলে তাকে গ্লাডিয়েটরদের দলে ফেলা হয়। 

বিদ্রোহী গ্লাডিয়েটরদের অস্ত্র বলতে কিছু ছিল না। প্রথম দিকে নিজেদের দূর্দান্ত সাহস শক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে তারা দাস মালিকদের ঘরবাড়ি ও খামার লুটপাট করত। এভাবে লুটপাটের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তারা নিজেদের সুসংবদ্ধ ও অস্ত্রবলে বলীয়ান করে। নিকটবর্তী এলাকার দাসরা এসে স্পার্তাকাসের দলে যোগ দিল। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠল স্থানীয়রা। তখন তিন হাজার রোমক সৈন্য এসে পলাতকদের আশ্রয়স্থল ঘিরে ফেলল। 

পাহাড় থেকে নীচে নামার একমাত্র পায়ে চলা পথ রোমকগণ অবরোধ করেছিল। তাদের ধারণা ছিল, ক্ষুৎ পিপাসায় কাতর হয়ে বিদ্রোহীরা আত্মসমর্পণ করবে। কিন্তু বিদ্রোহীরা স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে আঙ্গুর লতা দিয়ে মই বুনে তার সাহায্যে রাতের বেলায় পাহাড়ের অত্যন্ত খাঁড়া দিকটা দিয়ে নীচে নামে, যেদিকটাতে কোন পাহারা ছিল না। অত:পর তারা অতর্কিতে রোমক বাহিনীর উপর ঝাপিয়ে পড়ে তাদের সকলকে হত্যা করে।

লতার দঁড়ির সাহায্যে রাতে নীচে নামে।
বিদ্রোহীদের এই সাফল্যের সংবাদ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সমগ্র ইটালী হতে দলে দলে দাস এসে স্পার্তাকাসের দলে যোগ দেয়। তারা তাদের দুর্ভাগ্য আর নিয়তি বলে মেনে নেয়নি।

স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে হাজার হাজার দাস সঙ্ঘবদ্ধ হল। নানান ভাষাভাষী এইসব দাসদের মধ্যে স্পার্তাকাস কঠোর শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। রোমক সেনাবাহিনীর অনুকরণে তিনি পদাতিক বাহিনী, অশ্বারোহী বাহিনী ও গুপ্তচর ব্যবস্থা গঠন করেন। অন্যদিকে দিনরাত্র কর্মকার তাদের শিবিরে নানা ধরণের অস্ত্রপাতি তৈরীতে নিয়োজিত থাকে।

স্পার্তাকাস তার সেনাবাহিনীকে উত্তরাভিমুখে চালনা করেন। তখন তার বিরুদ্ধে রোমক সিনেট উভয় কন্সুলকে প্রেরণ করেন। স্পার্তাকাস উভয় কন্সুলের রোমক বাহিনীকে একে একে পরাজিত করেন এবং সমগ্র ইটালী অতিক্রম করে পো নদীর উপত্যকায় এসে উপস্থিত হন। এখান থেকে তিনি তার বাহিনী নিয়ে বিপরীত মুখে যাত্রা করেন।

দ্বন্দ্বরত দুই গ্লাডিয়েটর।
বিদ্রোহীদের প্রত্যাবর্তণের সংবাদ পেয়ে দাস মালিকেরা ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তারা তাড়াহুড়ো করে বিশাল সৈন্য সমাবেশ করে। এই বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন ক্রান্সুস নামের খুবই ধনাঢ্য এক ব্যক্তি। ইতিমধ্যে সিনেট স্পেন ও বলকান উপদ্বীপ থেকেও সেনাবাহিনী তলব করে।

এদিকে রোমের উপকন্ঠে পৌঁছে স্পার্তাকাস দেখলেন যে, রোম অবরোধ করার শক্তি তার নেই। সুতরাং তিনি তার বাহিনীকে ইটালীর দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চালিত করলেন। পথে ক্রান্সুসের বাহিনী তাদের পথ অবরোধ করে, কিন্তু স্পার্তাকাসের বাহিনী সেই বাঁধা ছিন্ন ভিন্ন করে বেরিয়ে যায় এবং দক্ষিণ পশ্চিম অন্তরীপ অভিমুখে যাত্রা করে। স্পার্তাকাসের হয়ত: সিলিলি গিয়ে সেখানে দাস বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পণা ছিল। কিন্তু সমুদ্রে ঝড় ওঠায় তা আর সম্ভব হয়নি, যদিও সিসিলি তাদের অবস্থান থেকে খুব একটা দূরে ছিল না। 

হিংস্র পশুর উপস্থিতিতে দ্বন্দ্বরত দুই গ্লাডিয়েটর।
স্পার্তাকাসের নেতৃত্বে বিদ্রোহীরা অন্তরীপে পৌঁছুলে রোমান সেনাপতি ক্রান্সুস এগিয়ে এসে অন্তরীপে যাতায়াতের একমাত্র পথ সংকীর্ণ যোজকটি দখল করে বসে এবং এক উপকূল হতে অন্য উপকূল পর্যন্ত সমস্ত জায়গায় গভীর পরিখা খনন করে উঁচু উঁচু বাঁধ বাঁধে। এরফলে বিদ্রোহীরা ফাঁদে আটকা পড়ে এবং তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এসময় বিদ্রোহীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দিতে গিয়ে স্পার্তাকাস বললেন যে- ‘অনাহারে কাপুরুষের মত মৃত্যুবরণ করার চেয়ে তীরের আঘাতে বীরের মত মরা অনেক ভাল।’ 

দুর্বিসহ ঠান্ডার মধ্যে স্পার্তাকাস রোমকদের আক্রমণ করে বসলেন। তার বাহিনী এক জায়গায় পরিখা ভরাট করে ফেলে ও বাঁধ দখল করে নেয়; অত:পর রোমক বাহিনীকে ছিন্ন করে বেরিয়ে যায়। 

রোমানদের সাথে স্পার্তাকাসের শেষ যুদ্ধ হয় ৭১ খ্রীঃপূঃ। এসময় বলকান উপদ্বীপ থেকে সেনাবাহিনী চলে আসে ইটালীতে। আবার পম্পেইর নেতৃত্বে স্পেন থেকেও সেনাবাহিনী এসে পৌঁছায়। 

এই যুদ্ধে স্পার্তাকাসের প্রচন্ড আক্রমণের মুখে দু‘জন রোমান সেনাপতি নিহত হয়। অবশ্য স্পার্তাকাস নিজেও আহত হয়েছিলেন। তার এক পা কাটা পড়ে, তখন তিনি এক পায়ে দাঁড়িয়েই যুদ্ধ করেছিলেন। 

বিদ্রোহীরা মহাসাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেছিল। কিন্তু রোমানদের শক্তিসামর্থ খুবই বেশী থাকায় তারা এই যুদ্ধে বিজয়ী হতে পারেনি।

যুদ্ধে ৬ বা ৭ হাজার বিদ্রোহী বন্দী হয়েছিল। এই বন্দীদের মধ্যে অবশ্য স্পার্তাকাস ছিলেন না। যুদ্ধক্ষেত্রে রোমকরা তাকে এমন টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলেছিল যে, পরে তাকে আর সনাক্ত করা যায়নি।

রোমকরা বন্দীদের সকলকে ক্রুস বিদ্ধ করে কাপুয়া থেকে রোমগামী রাস্তার দু‘ধারে ক্রুসগুলি পুতে দিল। পথিক এবং উল্লাসরত রোমানদের সম্মুখে ৬ বা ৭ হাজার বন্দী প্রচন্ড যন্ত্রণার মৃত্যূ প্রতীক্ষায় ক্রুসের উপর ঝুলে রইল।

সমাপ্ত।

বি:দ্র: যারা Spartacus, Season 1-5 এর সকল পর্বগুলি দেখেননি তারা দেখে ফেলেন, নইলে মিস করবেন।
উৎস: হিস্ট্রি অব দা এন্সিয়েন্ট ওয়ার্ল্ড -ফিওদর করোভকিন। হিস্ট্রি অব গ্রীস -গ্রোট।
ছবি: Wikipedia, greek-islands.

২টি মন্তব্য:

  1. হেনা সুলতানা১:০০ pm

    গ্লাডিয়েটর বিদ্রোহ ও স্পার্টাকাসের কাহিনীটি পড়ে আমি কয়েক মিনিট স্তবদ্ধ হয়ে রইলাম। প্রকৃত মানুষের জন্য আসলে পৃথির্বী কোন দিনই নিরাপদ ছিলনা সে অসভ্য যুগই বলি আর সভ্য যুগেই বলি। বর্তমানে আমরা বাংলাদেশের মানুষরা কী একরকম গ্লাডিয়েটরের জীবন কাটাচ্ছিনা? আমি মনে প্রাণে একজন স্পার্টাকাসের অপেক্ষায় আছি ।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. আমি দু:খিত যে আপনার মন্তব্যটি আমার নজরে পড়েছে আনেক দেরীতে। কেউ মন্তব্য করে না, তাই সেদিকে নজর পড়েনি। যাহোক, কষ্ট করে পড়েছেন এজন্য ধন্যবাদ। আর হ্যাঁ, ভয়ের কারণ নেই, পৃথিবীতে কোনকিছুই স্থায়ী না, পরিবর্তন আসবেই।

      মুছুন