pytheya.blogspot.com Webutation

৭ মার্চ, ২০১২

Golden Calf :সামেরী ও গো-বৎস কাহিনী।

মূসার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময় ইস্রায়েলীরা এক অবিশ্বাস্য কাজ করে বসল। তার কি হয়েছে না হয়েছে তা না জেনেই তারা সিদ্ধান্ত নিল যে, তারা এই পর্বত থেকে চলে যাবে। তাদের অনেকে এমনকি মিসরেও ফিরে যেতে চাইল। এ কারণে যে কোন মূল্যে তারা তাদের অগ্রগামী হবার জন্যে একজন দেবতা পেতে চাইল। অতঃপর তারা স্বর্ণময় গো-বৎস (Golden Calf) তৈরী শেষে পূজায় রত হল। দূর্ভাগ্যবশতঃ এসময় হারুণ (Aaron) তাদেরকে নিবৃত্ত করতে ব্যর্থ হলেন। 

দেবতার বিষয়ে সামেরী (Sameri) অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। সে ইস্রায়েলীদেরকে একথা বোঝাতে সক্ষম হল যে, মিসরীয়দের কাছ থেকে চেয়ে আনা স্বর্ণ অপরের ধন। তাই তা তাদের জন্যে অবৈধ, আর তা তাদের কাছ থেকে দূর করা আবশ্যক। তখন ইস্রায়েলী মেয়েরা তাদের সঙ্গে থাকা মিসরীয়দের কাছ থেকে পুন:রায় ফিরিয়ে দেবার প্রতিশ্রুতিতে চেয়ে আনা সমস্ত স্বর্ণালংকার নিয়ে এল। তারপর সেগুলি তারা একটা গর্তে ছুঁড়ে ফেলল। এরপর হারুণের উপস্থিতিতে তা আগুন ফেলে দেয়া হল যাতে ঐ সোনা গলে একটা তালে পরিণত হয়। হারুণ সমবেত লোকদেরকে বললেন, ‘মূসা ফিরে এসে এই স্বর্ণ সম্পর্কে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’

মেয়েরা ভগ্ন হৃদয়ে অলঙ্কারের পরিণতি লক্ষ্য করছিল। আর কিছু অতি উৎসাহী জনতা শোরগোল তুলছিল। সেইসময় সামেরী তার হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে হারুণকে বলল, ‘আমিও কি এগুলো নিক্ষেপ করব?’
হারুণ মনে করলেন তার হাতেও হয়তঃ মিসরীয়দের কোন অলঙ্কার রয়েছে, তাই তিনি তা নিক্ষেপ করতে আদেশ দিলেন। সামেরী বলল, ‘আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হোক।’ আপনি আমার জন্যে এ মর্মে দোয়া করলেই শুধু আমি নিক্ষেপ করব-নতুবা নয়।’

সামেরীর কপটতা ও কুফর হারুণের জানা ছিল না। তাই তিনি দোয়া করলেন। তখন সে তার হাতের বস্তু ঐ আগুনে ছুঁড়ে ফেলল। বস্তুত: তার হাতে কোন অলঙ্কার ছিল না, ছিল ফেরেস্তা জিব্রাইলের পায়ের নীচের কিছু মাটি। সে এই বিষ্ময়কর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছিল যে, জিব্রাইলের অশ্বের পা মাটিতে যেখানে পড়ে সেখানে তখুনি ঘাস উৎপন্ন হয়। এতে সে বুঝে নিয়েছিল যে তার পায়ের নীচের মাটিতে জীবনের স্পন্দন নিহিত আছে। নিতান্ত কৌতুহল বশে সে ঐ মাটির কিছুটা সংগ্রহ করে নিজের কাছে রেখেছিল। 

মিসরীয়দের কাছ থেকে চেয়ে আনা স্বর্ণে যখন আগুন ধরিয়ে দেয়া হল, তখন শয়তান সামেরীকে প্ররোচিত করল এই মাটি তারমধ্যে নিক্ষেপ করতে। তার মনে বাসনা ছিল হারুণের অনুপস্থিতিতে এই স্বর্ণ দিয়ে সে মিসরীয়দের দেবতার মত একটি দেবতা তৈরী করবে। আর তার মনের বাসনা পূর্ণ করার মানসে সে হারুণের দোয়াও কাজে লাগাল। 

সামেরী ও দেবতা ওপিষ।
হারুণ যখন ঐ স্থান পরিত্যাগ করলেন তখন সামেরী উপস্থিত অন্যান্যদের সহায়তায় ঐ স্বর্ণ দিয়ে গো-বৎসের আকারে (মিসরীয় দেবতা ওপিষ) এক দেবতা তৈরী করল। আগুনে সামেরীর নিক্ষিপ্ত জিব্রাইলের অশ্বের পদতলের মাটির গুনে এই দেবমূর্ত্তি জীবন্ত গরুর মত আচরণ ও হাম্বা স্বরে ডাকতেও লাগল। 
সামেরী বলল, ‘এটাই হল খোদা। মূসা এঁর সাথে কথা বলতে তূর পাহাড়ে গেছেন, আর এদিকে ইনি সশরীরে এখানে এসে হাজির হয়েছেন।’

সামেরীর একথা শুনে লোকেরা বিপুল উৎসাহে সেটার অর্চণা শুরু করে দিল। কিন্তু তারা এটা দেখল না যে, ওটা তাদের সাথে কথা বলে না, আর কোন পথও দেখায় না। আর তারা ওটার অচর্ণা শুরু করল। প্রকৃতই তারা ছিল সীমালংঘনকারী। 

তিন দিনের এক উৎসবে লোকেরা যাত্রার প্রস্তুতির জন্যে স্বর্ণময় ঐ গো-বৎসের পদতলে পশু উৎসর্গ করল। হারুণ যখন দেখলেন যে, সামেরীর কারণে বনি-ইস্রায়েলীদের এক বিরাট অংশ গরু-বাছুরের মূর্ত্তিপূজা শুরু করেছে। তখন তিনি তাদের কাছে গেলেন এবং বললেন, ‘এ তোমাদের খোদা নয়, পথভ্রষ্টতা তোমাদেরকে পেয়ে বসেছে। এ তো অলংকারাদি দিয়ে তৈরী একটি মূর্ত্তিমাত্র। তোমাদের খোদা হলেন মহান আল্লাহ।’
তারা বলল, ‘এটাই আমাদের দেবতা, জীবন্ত খোদা। আর যদি তা না হবে তবে তুমি আমাদেরকে বল কেন এটা নাচানাচি করছে, হাম্বা রবে ডাকছে।’
হারুণ তাদের এ প্রশ্নের কোন সদুত্তোর দিতে পারলেন না। সুতরাং তারা তাকে উপেক্ষা করে ঐ স্বর্ণের গো বৎসের নাচানাচি ভক্তি ও আগ্রহ নিয়ে অবলোকন করতে লাগল ও পূজায় মত্ত রইল।

স্বর্ণ গোবৎসের পূজায়রত ইস্রায়েলীরা।
এসময় দেবতার সেবাকারী কয়েকজন হারুণের কাছে এগিয়ে এসে বলল, ‘মূসা কোথায় গেছেন? তিনি তো আমাদের থেকে ত্রিশ দিনের জন্যে বিদায় নিয়েছিলেন। এখন চল্লিশ দিন পার হওয়ার পথে।’
হারুণ এ প্রশ্নেরও কোন জবাব দিতে পারলেন না। শুধু বললেন, ‘তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন।’
সামেরী মন্তব্য করল, ‘তিনি পথ ভুলে গিয়েছেন, তার অনুসন্ধান করা দরকার।’
হারুণ বললেন, ‘পথ পেতে হলে আমার কথা শোন। হে আমার সম্প্রদায়! এ দিয়ে তো তোমাদেরকে কেবল পরীক্ষা করা হচ্ছে। তোমাদের প্রতিপালক করুণাময়। সুতরাং তোমরা আমাকে অনুসরণ কর ও আমার আদেশ মেনে চল।’

কিন্তু অধিকাংশই তার কথায় কান দিল না। তারা পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিল, ‘যতক্ষণ না মূসা ফিরে আসেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা একেই উপাস্য বলে মানতে থাকব এবং এর পূজা অর্চণা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।’ 

এই পরিস্থিতিতে হারুণ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়লেন। নিতান্ত অপারগ হয়ে তিনি বনি-ইস্রায়েলীদের একাংশ নিয়ে পথভ্রষ্টদের থেকে পৃথক হয়ে গেলেন এবং মূসার ফিরে আসার অপেক্ষায় রইলেন।

গো-বৎসের বেদী।
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘আর মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দিয়ে একটা গো-বৎসের মূর্ত্তি গড়ল, যার মধ্যে থেকে গরুর শব্দ বের হত। তারা কি দেখেনি যে ওটা তাদের সাথে কথা বলে না, আর কোন পথও দেখায় না? তারা ওটার অচর্ণা শুরু করল এবং তারা ছিল সীমালংঘনকারী।’(৭:১৪৮) হারুণ ওদের পূর্বেই বলেছিল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এ দিয়ে তো তোমাদেরকে কেবল পরীক্ষা করা হচ্ছে। তোমাদের প্রতিপালক করুণাময় সুতরাং তোমরা আমাকে অনুসরণ কর ও আমার আদেশ মেনে চল।’
ওরা বলেছিল, ‘আমাদের কাছে মূসা ফিরে না আসা পর্যন্ত আমরা এর পূজা অর্চণা থেকে কিছুতেই বিরত হব না।’(২০:৯০-৯১) 

সীনাই-এ মূসার সামান্য অনুপস্থিতিতে ইস্রায়েলীরা মূসার আদেশ অমান্য করে প্রতিমা তৈরী করল এবং পূজা করল। এই কাজ প্রমাণ করে যে, মিসরীয় প্রতিমার প্রতি তারা কত গভীরভাবে ঝুঁকে ছিল। এই ধরণের কাজ, যে কোন সময় করা ছিল একটি সামগ্রীক পাপ। উপরন্তু, এটা সেইসময় যখন সীনাই পর্বতে মূসাকে কিতাব দেয়া হচ্ছে, তখন সেই সীনাইয়ের পাদদেশে বসেই তার সম্প্রদায় মূর্ত্তি পূজার জন্যে দোষী সাব্যস্ত হচ্ছে। এই সময় ইস্রায়েলীদের এই পাপ করা সত্যিই বড় দুঃখজনক ছিল। নেতা হিসেবে মূসাকে এ সমস্ত সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়েছিল। এই অভিযোগকারী এবং বিদ্রোহী মহাজনতাকে পরিচালিত করতে গিয়ে মূসা যে অসাধারণ ধৈর্য্য, বিচক্ষণতা ও স্বার্থহীনতার মনোভাব দেখিয়েছিলেন তা নি:সন্দেহে ইতিহাসে এক মহানেতৃত্বের আদর্শ।


সীনাইয়ে বনি ইস্রায়েলী।
এই সংকটময় পরিস্থিতির সময় মূসা (Moses) ইস্রায়েলীদের মাঝে ফিরে এলেন। তিনি এসে তাদের পাপ দেখলেন এবং রাগে ও ঘৃণায় ফেটে পড়লেন। তিনি ইস্রায়েলীদেরকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি কারণে তোমরা গরু-বাছুরের মূর্ত্তিপূজা শুরু করে দিলে? তোমরা কি মনে করেছিলে আমি আর তোমাদের মাঝে ফিরে আসব না? এ কিভাবে বুঝলে? আমি তো তোমাদের কাছ থেকে ত্রিশ দিনের জন্যে বিদায় নিয়েছিলাম, আর তোমরা ওয়াদা করেছিলে আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত তোমরা আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকবে, নাফরমানি করবে না। ত্রিশ দিনের জায়গায় চল্লিশ দিন হয়েছে। মাত্র দশ দিনের বিলম্বে কেন এমন করলে?’

ইস্রায়েলীদের কেউ কোন কথা বলছিল না। এতে মূসা রাগে ও দুঃখে বললেন, ‘আমার  অবর্তমানে  তোমরা  আমার হয়ে কত খারাপ কাজই না করেছ। তবে কি তোমরা আল্লাহকে নারাজ করে তাঁর গজবকে ডেকে আনতে চেয়েছ?’ ক্রুদ্ধ ও অনুতপ্ত অবস্থায় তিনি আরও বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তার প্রতিশ্রুতির কাল কি বিলম্বিত হয়েছে, না তোমরা চেয়েছ তোমাদের উপর আল্লাহর গজব পড়ূক, আর সেজন্যেই কি আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?’

তারা বলল, ‘আমরা তোমাকে দেয়া অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় খেলাপ করিনি; তবে আমাদের উপর লোকেদের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, আর আমরা তা আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেই, ঐভাবে সামেরীও ফেলে দেয়। তারপর সে ওদের জন্যে একটা গো-বৎস তৈরী করল, যা গরুর মত শব্দ করতে থাকে। সে বলল, ‘এ তোমাদের উপাস্য আর মূসারও উপাস্য, কিন্তু, মূসা ভুলে গেছে।’ 
মূসা বললেন, ‘তবে কি তোমরা ভেবে দেখ না যে ওটা তোমাদের কথায় সাড়া দেয় না, আর তোমাদের কোন খারাপ বা ভাল করার ক্ষমতাও রাখে না?’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘আর মূসা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে এসে রাগে ও দুঃখে বলল, ‘আমার  অবর্তমানে  তোমরা  আমার  হয়ে কত খারাপ কাজই না করেছ। তোমাদের প্রতিপালকের আদেশকে এগিয়ে নিয়ে আসার জন্যে কেন তাড়াহুড়ো করলে?’(৭:১৫০)‘

অতঃপর মূসা তার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেলেন ক্রুদ্ধ ও অনুতপ্ত অবস্থায়। তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালক কি এক উত্তম প্রতিশ্রুতি দেননি? তার প্রতিশ্রুতির কাল কি বিলম্বিত হয়েছে, না তোমরা চেয়েছ তোমাদের উপর আল্লাহর গজব পড়ূক, আর সেজন্যেই কি আল্লাহর অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে?’ 

ওরা বলল, ‘আমরা তোমাকে দেয়া অঙ্গীকার স্বেচ্ছায় খেলাপ করিনি; তবে আমাদের উপর লোকেদের অলংকারের বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল, আর আমরা তা আগুনে ছুঁড়ে ফেলে দেই, ঐভাবে সামেরীও ফেলে দেয়। তারপর সে ওদের জন্যে একটা গো-বৎস গড়ল, যা গরুর মত শব্দ করতে থাকে।’
ওরা বলল, ‘এ তোমাদের উপাস্য আর মূসারও উপাস্য, কিন্তু, মূসা ভুলে গেছে।’ 
(মূসা বলল), ‘তবে কি ওরা ভেবে দেখে না যে ওটা তাদের কথায় সাড়া দেয় না, আর তাদের কোন খারাপ বা ভাল করার ক্ষমতাও রাখে না?’(২০:৮৬-৮৯)

মূসা তার ভ্রাতা হারুণকে কাছে ডাকলেন। তিনি ধারণা করলেন তার ভ্রাতা স্বীয় দায়িত্ব পালন করেনি, নুতবা এ অপকর্ম কেন?। তিনি হারুণের উপর খুবই রুষ্ট হলেন। কঠিনস্বরে তাকে বললেন, ‘তুমি যখন দেখলে ওরা ভুল পথে যাচ্ছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল আমাকে অনুসরণ করতে? তবে কি আমার হুকুম তুমি মাননি?’

রাগে অন্ধ হয়ে হাতের ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেললেন মূসা। তারপর আক্রোশ নিয়ে হারুণের দাঁড়ি ও চুল ধরলেন। হারুণ অতি নরম ভাষায় তাকে বললেন, ‘হে আমার ভ্রাতা! আমার কথা শোন, আমার দাঁড়ি ও চুল ছেড়ে দাও। আমি এই আশংকা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, ‘তুমি বনি ইস্রায়েলীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ, আর তুমি আমার কথার মর্যাদা দাওনি।’

--হে ভ্রাতা! আমি দায়িত্ব পালনে অলসতা করিনি। আমি তাদের নিবৃত্ত করতে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা আমার কথায় কান দেয়নি, বরং আমাকে দুর্বল মনে করে প্রায় খুন করে ফেলেছিল আর কি! এসময় আমি তাদের ঔদ্ধত্যের জবাব দিতে গেলে বনি-ইস্রায়েলীদের মধ্যে বিভক্তি আসত, আর আমি এ বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশী ভয় করেছি। তাই আমি তোমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল, তুমি এসে তাদেরকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে। এই কারণে আমি বেশী বাড়াবাড়ি করিনি।

--হে আমার ভ্রাতা! এখন তুমি আমার সাথে এমন কোরও না যেন শত্রুরা আনন্দিত হয়। আর আমাকে সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত কোরও না।’  

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- মূসা বলল, ‘হে হারুণ! তুমি যখন দেখলে ওরা ভুল পথে যাচ্ছে তখন কিসে তোমাকে নিবৃত্ত করল, আমাকে অনুসরণ করতে? তবে কি আমার হুকুম তুমি মাননি?’ (২০:৯২-৯৩)

আর তারপর সে ফলকগুলো ছুঁড়ে ফেলল। আর সে তার ভাইয়ের চুল ধরে নিজের দিকে টানতে লাগল। ভাই বলল, ‘হে আমার সহোদর ভাই! লোকেরা তো দুর্বল মনেকরে আমাকে প্রায় খুন করে ফেলেছিল আর কি! তুমি আমার সাথে এমন কোরও না যেন শত্রুরা আনন্দিত হয়। আর আমাকে সীমালংঘনকারীদের অন্তর্ভূক্ত কোরও না।’(৭:১৫০)

সে বলল, ‘হে আমার আপন ভাই! আমার দাঁড়ি ও চুল ধরে টেনো না; আমি এই আশঙ্কা করেছিলাম যে, তুমি বলবে, ‘তুমি বনি ইস্রায়েলীদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ আর তুমি আমার কথার মর্যাদা দাওনি।’(২০:৯৪) 

হারূণের কথায় মূসার রাগ কমে এল। তিনি বুঝতে পারলেন, এ ব্যাপারে প্রকৃত দোষী  সে নয়। দোষী হল সামেরী। তাই তিনি তৎক্ষণাৎ তাকে তলব করলেন। সামেরীও সম্মুখে এগিয়ে এল। তাকে দেখতে পেয়ে মূসা জিজ্ঞেস করলেন- ‘হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি?’

অধোবদনে সামেরী বলল, ‘আমি সেইসময় যা দেখতে পেয়েছিলাম তা ওরা কেউ দেখেনি। আমি জিব্রাইলকে দেখতে পেয়েছিলাম। আর সেইসময় আমি তার পদচিহ্ন থেকে একমুঠো ধূলি নিয়েছিলাম। পরে তা ঐ আগুনে ফেলে দেই। আর আমার আত্মা আমাকে প্ররোচিত করেছিল এভাবে। অত:পর তা দিয়ে যখন গো-বৎসের আকারে একটি দেবতা তৈরী করা হল, তখন তা জীবন্ত হয়ে গেল এবং গরুর মত হাম্বা স্বরে ডাকতেও লাগল। আর লোকেরা সেটাকে পূজা করতে শুরু করে দিল।’ 

সামেরী যখন জন্মগ্রহন করেছিল তখন সকল ইস্রায়েলী পুত্রসন্তান হত্যার ফেরাউনের আদেশ বলবৎ ছিল। নিজের চোখের সামনে সিপাহীদের হাতে স্বীয় পুত্রের মৃত্যু দৃশ্য দেখার ভয়ে তার জননী তাকে জঙ্গলের একটি গর্তে রেখে উপর থেকে ঢেকে দিয়ে এসেছিল। এসময় আল্লাহর নির্দেশে জিব্রাইল তাকে দেখাশুনা করেছিল। এ কারণেই হয়তোবা সে তাদের মাঝে জিব্রাইলকে দেখে তাকে চিনে ফেলেছিল। সাগর পাড়ি দেবার পর সীনাই পর্বতের কাছাকাছি পৌঁছিলে মূসাকে ব্যবস্থা আনতে তূর পর্বতে গমণের আদেশ শোনানোর জন্যে জিব্রাইল অশ্বপৃষ্ঠে সওয়ার হয়ে এসেছিল।
 
যাহোক সামেরীর কথা শুনে মূসা তীব্র রাগান্বিত হলেন। তিনি তাকে হত্যা করতে চাইলেন। কিন্তু জিব্রাইল তাকে তা করতে নিষেধ করল তার অতীত কর্মের কারণে। মিসরে বনি ইস্রায়েলীদেরকে দেশত্যাগে সংগঠিত করতে সে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল। 

মূসা ঘৃণার সাথে সামেরীকে বললেন, ‘হে সামেরী, আল্লাহ তোমাকে ইহকাল ও পরকালে শাস্তি প্রদান করবেন। ইহকালের শাস্তি এই যে, যতদিন তুমি জীবিত থাকবে ততদিন তোমাকে কেউ স্পর্শ করতে পারবে না এবং তুমিও কাউকে স্পর্শ করবে না। আর তুমি তোমার উপাস্যকে দেখে যাও যার পূজায় তুমি ব্যস্ত ছিলে, আমরা তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেব। একমাত্র আল্লাহই তো তোমাদের উপাস্য, তিনি ব্যতিত অন্য কোন উপাস্য নেই, সকল বিষয়ই তাঁর জ্ঞানায়ত।’

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- মূসা বলল, ‘হে সামেরী! তোমার ব্যাপার কি?’
সে বলল, ‘আমি যা দেখেছিলাম ওরা তা দেখেনি। তারপর আমি রসূলের (জিব্রাইলের) পায়ের চিহ্ন থেকে এক মুঠো (ধূলো) নিয়েছিলাম ও তা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলাম আর আমার আত্মা আমাকে প্ররোচিত করেছিল এভাবে।’

মূসা বলল. ‘দূর হয়ে যাও! আর তোমার জন্যে এই সাব্যস্ত হল যে, তুমি তোমার জীবদ্দশায় সকলকে বলবে যে, ‘আমি অস্পৃস্য’ এবং তোমার জন্যে রইল এক নির্দিষ্টকাল, যার ব্যতিক্রম হরে না। আর তুমি তোমার উপাস্যকে দেখে যাও যার পূজায় তুমি ব্যস্ত ছিলে, আমরা তাকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেব। একমাত্র আল্লাহই তো তোমাদের উপাস্য, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন উপাস্য নেই, সকল বিষয়ই তাঁর জ্ঞানায়ত।’(২০:৯৫-৯৮) 
মূসা ইস্রায়েলীদের কাছ থেকে গো-বৎসটি ছিনিয়ে নিয়ে আগুনে পোড়ালেন। স্বর্ণ আগুনে গললেও পুড়ে ছাই হয়ে যায় না, কিন্তু জিব্রাইলের পদধূলির কারণে গো-বৎসটি যেহেতু জীবন্ত হয়েছিল তাই তা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। 

মূসা এই ছাই নদীর পানিতে ভাসিয়ে দিলেন। এরপর তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে ও আমার ভ্রাতাকে ক্ষমা কর। তুমি আমাদেরকে আশ্রয় দাও আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’

আল্লাহ বললেন, ‘যারা গো-বৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, তাদের উপর আমার পক্ষ থেকে পার্থিব জীবনেই গজব ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে। এমনিভাবে আমি অপবাদ আরোপ কারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি। আর যারা মন্দ কাজ করে, তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয় তোমার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্য ক্ষমাকারী, করুণাময়।’

মূসার রাগ যখন কমল তখন সে ফলকগুলো তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে চলে, তাদের জন্যে তাতে লেখা ছিল পথের নির্দেশণা ও করুণা। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘মূসা বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা কর। তুমি আমাদেরকে আশ্রয় দাও আর তুমিই তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’
যারা গো-বৎসকে উপাস্য বানিয়ে নিয়েছে, তাদের উপর পরওয়ারদেগারের পক্ষ থেকে পার্থিব এ জীবনেই গজব ও লাঞ্ছনা এসে পড়বে। এমনিভাবে আমি অপবাদ আরোপকারীদেরকে শাস্তি দিয়ে থাকি। আর যারা মন্দ কাজ করে তারপরে তওবা করে নেয় এবং ঈমান নিয়ে আসে, তবে নিশ্চয় তোমার পরওয়ারদেগার তওবার পর অবশ্য ক্ষমাকারী, করুণাময়।’

মূসার রাগ যখন কমল তখন সে ফলকগুলো তুলে নিল। যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে চলে তাদের জন্যে তাতে লেখা ছিল পথের নির্দেশণা ও করুণা।’(৭:১৫১-১৫৪) 

মূসা কর্তৃক সামেরীকে শাস্তি প্রদান ও দেবমূর্ত্তিকে পুড়িয়ে ছাই করে নদীতে ভাসিয়ে দেবার পর পূজাকারীদের একদল বুঝতে পারল তারা আল্লাহর কাছে বিরাট অপরাধের কাজ করে ফেলেছে। তারা সমবেতভাবে মূসাকে জানাল, ‘হে মূসা! এখন আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদেরকে দয়া না করেন বা ক্ষমা না করেন তবে তো আমাদের সর্বনাশ।’

কিন্তু তাদের কিছু তখনও আন্তরিকভাবে লজ্জিত না হয়ে বরং যারা হারুণের অনুসারী হিসেবে পূজায়রত হয়নি তাদেরকে ঈর্ষা করতে লাগল। অবশ্য তারা বাহ্যিক ভাবে হলেও মূসার কাছে আবেদন জানিয়েছিল আল্লাহর কাছে তাদের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করার।  

মূসা আল্লাহর কাছে ইস্রায়েলীদের হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করলেন। তিনি জানালেন, ‘তারা যেন নিজেদের মধ্যে একে অপরকে হত্যা করে।’ 

মূসা পূজাকারী ইস্রায়েলীদেরকে ডেকে বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের উপর ঘোর অত্যাচার করেছ, সুতরাং তোমরা সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে যাও, আর তোমাদের আত্মাকে সংহার কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে এই হবে কল্যাণকর। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন। তিনি তো ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু।’

সামনে অন্য কোন পথ খোলা না থাকায় অবশেষে এই কঠোর আদেশ ইস্রায়েলীরা মেনে নিল এবং একে অপরকে হত্যা করতে শুরু করল। এভাবে সত্তুর ব্যক্তি নিহত হল। অতঃপর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমার সু-সংবাদ দিলেন। আর যারা নিহত হল তারা শহীদ হিসেবে গণ্য হল। 

ইস্রায়েলী নারীরাও তাদের অলঙ্কার দ্বারা দেবতা তৈরীতে অপরাধ বোধে ভুগতে লাগল। তারা তাদের অবশিষ্ট অলঙ্কারাদি খুলে ফেলল, আর কখনও তারা তা পরেনি। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- ‘তারা (ইস্রায়েলীরা) যখন অনুতপ্ত হল ও দেখল যে তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে তখন তারা বলল, ‘আমাদের প্রতিপালক যদি আমাদেরকে দয়া না করেন বা ক্ষমা না করেন তবে তো আমাদের সর্বনাশ।’(৭:১৪৯) 
মূসা তার নিজের সম্প্রদায়কে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! গো-বৎসকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করে তোমরা নিজেদের উপর ঘোর অত্যাচার করেছ, সুতরাং তোমরা সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে যাও, আর তোমাদের আত্মাকে সংহার কর। তোমাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে এই হবে কল্যাণকর। তিনি তোমাদের প্রতি ক্ষমাপরবশ হবেন, তিনি তো ক্ষমাপরবশ, পরম দয়ালু।’ (২:৫৪)

এরপর আমি (আল্লাহ) তোমাদেরকে ক্ষমা করেছি যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পার।’(২:৫২) 

এদিকে সামেরী এক ঘৃণ্য জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল এবং মৃত্যুর পূর্বমুহুর্ত পর্যন্ত সে এই জ্বরে আক্রান্ত ছিল। যে কেউ তাকে স্পর্শ্ব করত সেই ঐ জ্বরে আক্রান্ত হত। এ কারণে সে সকলকে তার কাছ থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করত। শেষপর্যন্ত সে লোকসমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিল এবং অতি অসহায় অবস্থায় সে মৃত্যুবরণ করেছিল।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, bcc-la, bible.ca.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন