pytheya.blogspot.com Webutation

১৯ মার্চ, ২০১২

Jacob: ইয়াকুবের ১৪ বৎসর দাসত্ববরণ।


ইয়াকুব (Jacob) বের-শেবা ছেড়ে হারোণ শহরের দিকে যাত্রা করল। পথে এক জায়গায় বেলা ডুবে গেলে সে সেখানেই রাতটা কাটানোর সিদ্ধান্ত নিল। সেখানে কতকগুলো পাথর পড়েছিল। সে তারই একটা মাথার নীচে দিয়ে শুয়ে পড়ল। ভ্রমন জনিত ক্লান্তির কারণে সে দ্রুত নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ল। সে স্বপ্নে দেখল স্বর্গ থেকে একটি সিঁড়ি মর্ত্যে নেমে এসেছে, আর ফেরেস্তাগণ তার উপর দিয়ে ওঠানামা করছে। আর খোদা উর্দ্ধে স্বর্গ থেকে তাকে বলছেন, ‘আমিই খোদা, তোমার পূর্বপুরুষ ইব্রাহিমের খোদা ও ইসহাকের খোদা। তুমি যেখানে শায়িত সেই দেশ আমি তোমাকে এবং তোমার বংশধরদের দেব। তোমার বংশধরেরা পূর্ব পশ্চিম এবং উত্তর দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়বে। অনেক জাতি তোমার ও তোমার বংশের মধ্যে দিয়ে আশীর্বাদ পাবে। আমি সর্বদা তোমার সঙ্গে আছি। তুমি যেখানেই যাও না কেন এই দেশেই আবার আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনব।’

ইয়াকুবের দেখা স্বর্গ সিঁড়ি।
ইয়াকুব ঘর্মাক্ত হয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠল। আর মনে মনে বলল, ‘কি ভয়ঙ্কর! এটা তো তাহলে খোদার বাসস্থান ছাড়া আর কিছুই না। স্বর্গদ্বার এখানেই। হায়! খোদা এই স্থানে আছেন, অথচ আমি তা বুঝতে পারিনি।’ 

সে বাকী রাতটুকু জেগে কাটিয়ে দিল। অতঃপর সকাল হলে যে পাথরটা তিনি মাথার নীচে দিয়ে ঘুমিয়ে ছিল সেটা থামের মত করে দাঁড় করিয়ে তার উপর তেল ঢেলে দিল। এরপর সে বলল, ‘হে খোদা, যদি তুমি আমার এই যাত্রায়, পথে আমাকে রক্ষা কর, যদি আমার খোরাক-পোষাক যুগিয়ে দাও, যদি আমি আবার আমার পিতা-মাতার কাছে ভালোয় ভালোয় ফিরে আসতে পারি, তবে এই যে পাথর আমি থামের মত করে দাঁড় করিয়ে রাখলাম এখানেই আমি তৈরী করব তোমার গৃহ। আর হে খোদা! তুমি আমাকে যাকিছু দেবে, তার এক দশমাংশ নিশ্চয়ই আমি তোমাকে ফিরিয়ে দেব।’
ইয়াকুব জায়গাটার নাম দিল বৈথেল (খোদার ঘর) যার পূর্ব নাম ছিল লূস।

ইয়াকুব বৈথেল পরিত্যাগ করে উত্তর দিকে যাত্রা করল। চলতে চলতে  একসময় সে এমন এক স্থানে এসে উপস্থিত হল, যেখানে চারিদিকে তাকিয়ে সে মাঠের মধ্যে একটা কূয়ো দেখতে পেল। সেই কূয়োর পাশে ভেড়ার তিনটে পাল শুয়ে আছে। ইয়াকুব লক্ষ্য করল কূয়োটার মুখে দু’টি বড় বড় পাথর বসান। যখন সমস্ত ভেড়ার পাল জড় হয়, তখন রাখালেরা কূয়োর মুখ থেকে পাথরটা সরিয়ে দিয়ে ভেড়াগুলোকে পানি খাওয়ায়। তারপর পাথরটা আবার কূয়োয় মুখে বসিয়ে রাখে।

ইয়াকুবের যাত্রাপথ।
ইয়াকুব কূয়োর কাছে পৌঁছে রাখালদের জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কোথাকার লোক?’ 
তারা বলল, ‘হারোণ শহরের।’ 
ইয়াকুব-‘তোমরা কি নাহোরের নাতি লাবনকে চেন?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ, চিনি।’ 
ইয়াকুব- ‘তিনি কেমন আছেন?’
তারা বলল, ‘হ্যাঁ, তিনি ভালই আছেন।’ 
এসময় তাদের একজন দূরে অঙ্গুলি নির্দেশ করে বলল, ‘ঐ তো তার কন্যা রাহেল তাদের ভেড়ারপাল নিয়ে আসছে।’ 

ইয়াকুব দেখল সত্যিই একটি মেয়ে ভেড়ার পাল তাড়িয়ে নিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। সে রাখালদেরকে বলল, ‘দেখ, বেলা পড়তে এখনও অনেক দেরী। সব পশু এক জায়গায় জড় হওয়ায় সময় এখনও হয়নি। তোমরা বরং তোমাদের ভেড়াগুলোকে পানি পান করিয়ে আবার চরাতে নিয়ে যাও।’
তারা বলল, ‘না, একটু পরে সন্ধ্যে হবে, তখনই আমরা ভেড়াগুলোকে পানি খাওয়াতে পারব।’

রাহেল ও ইয়াকুব।
ইয়াকুব রাখালদের সঙ্গে কথা বলছে এসময় রাহেল তার ভেড়াগুলো নিয়ে সেখানে এল। ভেড়ার এই পালটা সেই চরাত। ইয়াকুব তাকে দেখে কূয়োর কাছে এগিয়ে গেল এবং কূয়োর মুখ থেকে পাথরটা সরিয়ে দিয়ে ভেড়াগুলোর জন্যে পানি তুলে দিল। রাহেল দেখল লোকটা বিদেশী, সুতরাং সে তাকে তার পরিচয় জিজ্ঞেস করল। ইয়াকুব বলল, ‘আমি তোমার আত্মীয়, তোমার ফুফু রেবেকার পুত্র।’ 

একথা শুনে রাহেল দৌঁড়ে গিয়ে তার পিতাকে সেই খবর দিল। লাবন তার ভাগ্নে ইয়াকুরেব আসার খবর পেয়ে ছুটে এল। সে ইয়াকুবকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করল এবং তাকে বলল, ‘সত্যিই আমাদের গায়ে একই রক্ত বইছে।’  
লাবন তাকে বাড়ীতে নিয়ে গেল। 

লাবনের দু’কন্যা-লেয়া ও রাহেল। তার কোন পুত্রসন্তান ছিল না। বিচক্ষণ লাবন শুরুতেই রাহেলের প্রতি ইয়াকুবের দুর্বলতা ধরে ফেলেছিল। তাই ইয়াকুব যখন রাহেলকে বিবাহ করার আকাংখা মামার কাছে ব্যক্ত করল তখনি সুচতুর মামা তার এই দুর্বলতার সুযোগ পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করল। এমনিতে তার নিজের কোন পুত্রসন্তান না থাকাতে ইয়াকুবকে নিজের কাছে রাখার আকাংখাও তার মনে ছিল। সে বলল, ‘রাহেলকে অন্য কোন পাত্রের কাছে দেবার চেয়ে তোমার হাতে তুলে দেয়াই ভাল। তার সঙ্গে তোমার বিবাহে আমার আপত্তি নেই বটে, তবে তাকে পাবার জন্যে তোমাকে সাত বৎসর আমার দাসত্ব করতে হবে।’ 

ইয়াকুব রাহেলকে পাবার জন্যে সাত বৎসর দাস্যকর্ম করল। রাহেলের প্রতি তার অনুরাগের কারণে এক এক বৎসর তার কাছে এক এক দিন মনে হল। সরল বিশ্বাসে সে শর্ত মোতাবেক তার দায়িত্ব পালন করল। শেষদিনে সে তাঁর মামাকে স্মরণ করিয়ে দিল যে, সাত বৎসরের দাসত্ব¡ সে পালন করেছে। মামা লাবন জানাল, ‘যথাসময়েই বিবাহ হবে।’

 লাবন রাহেলকে বিবাহের শর্ত দিচ্ছেন।
বিবাহ হল। বিবাহের অনুষ্ঠান রাতে হয়েছিল এবং কনের লম্বা ঘোমটা ছিল। অনুষ্ঠান শেষে বাসর ঘরে ইয়াকুব বুঝতে পারল, রাহেল নয়, লেয়ার সাথে তার বিবাহ হয়েছে- মামা লাবন তাকে ঠকিয়েছে। সে তখনি মামার কাছে ছুটে গিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে প্রতিবাদ করল, ‘এতদিন কি আমি রাহেলের জন্যেই আপনার দাসত্ব করিনি?’ 
তার শ্বশুর লাবন শান্তভাবে তাকে বলল, ‘জৈষ্ঠ্যার আগে কনিষ্ঠাকে সম্প্রদান, আমাদের এস্থানে অকর্তব্য।’ 
ইয়াকুব বলল, ‘আমি রাহেলকে ভালবাসি।’
লাবন বলল, ‘সেক্ষেত্রে আরও সাত বৎসর আমার দাস্যকর্ম দ্বারা তুমি তাকেও পেতে পার।’

এতদিনে ইয়াকুব তার মামার চরিত্রকে ভালভাবে বুঝতে পেরেছে। রাহেলকে পেতে তার আর অন্য কোন উপায় না থাকায় মামা লাবনের শর্ত মেনে নিয়ে তাকে বিবাহ করল এবং পরবর্তী সাত বৎসরের জন্যে দাস্যকর্ম শুরু করল। 

রাহেলকে বিবাহের পর স্বাভাবিকভাবে লেয়া স্ত্রীর অধিকার থেকে কিছুটা বঞ্চিত হচ্ছিল। স্বামীকে কিছু না বলে মনের এই ব্যাথা সে আল্লাহর দরবারে তুলে ধরল। আল্লাহ ন্যায় বিচারক। তিনি ইয়াকুবের এই পক্ষপাতিত্বের কারণে লেয়াকে গর্ভধারণ ক্ষমতা দিলেন, আর রাহেল বন্ধ্যা হয়ে রইল। 

লেয়া প্রথমবারের মত একটি পুত্রসন্তান প্রসব করল। সে খুশী হয়ে বলল, ‘আল্লাহ আমার দুঃখ দেখেছেন, তাই তিনি এই সন্তানটিকে দান করেছেন। এখন নিশ্চয়ই আমার স্বামী আমাকে ভালবাসবেন।’ 
এই সন্তানটির নাম রাখা হল রূবেন। 

লেয়া ও রাহেল।
এরপরে লেয়া আরও তিনটি পুত্রসন্তান প্রসব করল। এরা হল শিমিয়োন, লেবী ও ইহুদা। অতঃপর কিছুকালের জন্যে তার আর কোন সন্তানাদি হল না। এদিকে রাহেল যখন দেখল সে কোন সন্তানের মা হতে পারছে না, তখন সে ইয়াকুবকে বলল, ‘আমাকে সন্তান দাও। নইলে আমি মরব।’ 
ইয়াকুব বলল, ‘যিনি তোমাকে বন্ধ্যা করে রেখেছেন, তাঁর কাছে যাঞ্ছা কর।’ 
রাহেল বলল, ‘তবে আমার দাসী বিলহাকে বিবাহ করে নাও যাতে ওর মধ্যে দিয়ে আমি সন্তান কোলে পাই। আর এভাবে আমিও একটা পরিবার গড়ে তুলতে পারি।’ 

দাসী বিলহা পরপর দু'টি পুত্রসন্তান প্রসব করল। তারা হল দান ও নপ্তালি। 

এদিকে লেয়া যখন দেখল তার নিজের আর কোন সন্তান হচ্ছে না, তখন সেও তার দাসী শিল্পাকে বিবাহ করতে ইয়াকুবকে বাধ্য করল। এতে শিল্পাও পরপর দু‘টি পুত্রসন্তান প্রসব করল। এরা হল গাদ ও আঁশের। 

গম কাটবার মৌসুম। লেয়ার জৈষ্ঠ্য পুত্র রূবেন মাঠে গিয়ে কতকগুলো দুদাফল পেল আর সেগুলো এনে সে তার মাকে দিল। তখন রাহেল এসে লেয়াকে বলল, ‘রুবেন যে দুদাফল এনেছে তা থেকে আমাকে কয়েকটা দাও।’ 
লেয়া বলল, ‘তুমি আমার স্বামীকে দখল করে নিয়েছ, সেটা কি যথেষ্ট হয়নি? আবার আমার দুদাফলও নিতে চাও?’ 
রাহেল মুচকি হেসে তার কানে কানে বলল, ‘দুদাফলের বদলে আজ রাতে তিনি তোমার সঙ্গে থাকবেন।’ 

সন্ধ্যে বেলায় ইয়াকুবকে মাঠ থেকে ফিরতেই লেয়া ঘর থেকে বের হয়ে এসে তাকে বলল, ‘আজ তুমি আমার সঙ্গে থাকবে, কারণ তোমাকে আমি আজ রাতের জন্যে আমার করে নিয়েছি।’ 
লেয়া পরপর আরও তিনটি সন্তান প্রসব করল। এরা হল পুত্র ইষাখর ও সবুলুন এবং কন্যা দীণা। 

দীণার জন্মের পর আল্লাহ রাহেল এর মনোস্কামনা পূর্ণ করলেন। তিনি তার প্রার্থনার উত্তর দিলেন- তার গর্ভধারণ ক্ষমতা ফিরিয়ে দিলেন। রাহেল গর্ভধারণ করে প্রথম বারের মত একটি পুত্রসন্তান প্রসব করল। সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে অত্যন্ত খুশীতে কেঁদে ফেলল সে, বলল, ‘আল্লাহ আজ আমার অসম্মান দূর করলেন।’ 

এই পুত্রটির নাম রাখা হল ইউসূফ।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, contextrules.typepad, newworldencyclopedia, biblecourses.co.uk.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন