pytheya.blogspot.com Webutation

২ মার্চ, ২০১২

Moses: হত্যার অপরাধে মূসার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা।

ফেরাউন পরিবারের পোষ্যপুত্র হিসেবে রাজপরিবারের সমস্ত উচ্চশিক্ষার সুযোগ মূসা (Moses) লাভ করেছিল। সম্ভবতঃ মহান আল্লাহর ইচ্ছায় তার নিজের মা তাকে অতি যত্নের সাথে তাদের পূর্বপুরুষদের-ইব্র্রাহিম, ইসহাক, ইয়াকুব ও ইউসূফের জীবন গাঁথা এবং আল্লাহর মনোনীত বংশ হিসেবে তাদের দায়িত্ব ও পরিকল্পণার কথা বলে থাকবেন। এগুলি এমন ঘটনা যা তার মনে দাগ কেটেছিল- নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করেছিল- তার হৃদয়ে আশা ও স্বপ্নকে জাগিয়ে তুলেছিল।

প্রাচীন মিসর।
ফেরাউন নিজেকে জনগণের পালনর্কতা উপাস্যরে আসনে বসিয়েছিলেন। মিসরীয়রা ও অসহায় ইস্রায়েলীদের কিছু কিছু তাকে পালনর্কতা  হিসেবে উপাসনাও করত। তারপর যখন মূসা সাবালক ও প্রতিষ্ঠিত হল তখন আল্লাহ তাকে হিকমত ও জ্ঞানদান  করলেন। (২৮:১৪) সুতরাং মূসা জ্ঞান-বুদ্ধি লাভ করার পর সত্য ধর্মের কিছু কিছু কথা মানুষকে বলতে শুরু করলেন। এতে অনেকে তার অনুসারী হয়ে গলে। তখন র্কমচারীরা ফেরাউনকে জানাল-‘হে ফেরাউন! মূসা আপনাকে উপাস্য বলে স্বীকার করেন না উপরন্ত তিনি অন্যদেরকেও না করতে মদদ দিচ্ছেন। তিনি বলছেন- সমগ্র জগতের স্রষ্টা আল্লাহই একমাত্র উপাস্য, সকলের প্রতিপালক।’

একথা শুনে ফেরাউন তীব্র রাগান্বিত হলেন। এভাবে মূসা তার শত্রু হয়ে গেলেন। তিনি মূসাকে গোপনে হত্যা করতে পরকিল্পণা করলেন। কিন্তু এই গোপন পরকিল্পণার কথা প্রকাশ হয়ে পড়ল। বিবি আছিয়া তাকে বললেন, ‘পুত্র হিসেবে তাকে বড় করে তুললাম কি হত্যা করার জন্য? লোকেরা তো তার বিরুদ্ধে অনর্থক অপবাদ দিচ্ছে। আর ইতিপূর্বেও তারা তা করেছিল।’
ফেরাউন বললেন, ‘এবার তার সর্ম্পকে লোকদের বক্তব্য সর্ম্পূণ অসত্য নয়।’
তিনি বললেন, ‘তাকে আপনি হত্যা করবেন না। সে এখনও ছেলেমানুষ, বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে নিশ্চয়ই তার কার্যকলাপের পরিবর্তণ হবে।'

মিসরের এক নগরী।
স্ত্রী আছিয়ার অনুরোধে ফেরাউন তাকে হত্যা করা  থেকে বিরত হলেন বটে, কিন্তু তাকে শহর থেকে বহি:স্কারের আদেশ জারি করলনে। এসময় মূসা শহরের বাইরে বিভিন্ন্ স্থানে অবস্থান করতেন এবং মাঝে মাঝে গোপনে নগরীতে আগমন করতেন। এ সময়েরই কোন একদিন তিনি যখন শহরে প্রবেশ করলেন, তখন একস্থানে দেখতে পেলেন একজন ইস্রায়েলীর উপর একজন মিসরীয় জুলুম করছ। ইস্রায়েলী লোকটি মূসাকে দেখতে পেয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য চাইল। তখন তাকে সাহায্য করতে তিনি এগিয়ে গেলেন। ইস্রায়েলী বলল, ‘এ আমার সংগ্রহ করে আনা জ্বালানী জোরপূর্বক নিতে চাচ্ছে।’

মিসরীয়টি ছিল ফেরাউনের প্রধান বাবুর্চি। সে মূসাকে উপেক্ষা করল এবং নিজের কর্তৃত্ব জাহির করতে মুসাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল, ‘এ জ্বালানী রাজকীয় চূলার জন্যেই নেয়া হচ্ছে।’

ফেরাউনের পোষ্যপুত্র হিসেবে রাজদরবারে, প্রাসাদে বা বাইরে- সর্বত্র সর্বসাধারণের কাছে মূসা সম্মানের পাত্র ছিলেন। উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা পর্যন্ত তাকে সমীহ করে চলত। সুতরাং এই মিসরীয়র উচিৎ ছিল তাকে দেখেই এই ন্যাক্কারজনক কাজ থেকে বিরত থাকা। অথচ সে তো সেটা করলই না, বরং তাকে আমলে না এনে ঐ ইস্রায়েলীকে অমানুষিক নির্যাতনে মারতে শুরু করল।

প্রাচীন লাক্সরের ধ্বংসাবশেষ।
মূসা তীব্র ক্রোধান্বিত হলেন এবং ঐ মিসরীয়কে সজোরে এক ঘুসি মারলেন। তার এক ঘুসিতেই সে পড়ে গেল। মূসা ইস্রায়েলীকে বললেন, ‘যাও তোমার লাকড়ি নিয়ে চলে যাও।’
এতে ইস্রায়েলী তার লাকড়ি তুলে নিয়ে চলে গেল।

ইস্রায়েলী চলে গেলে মূসা মিসরীয়র প্রতি নজর দিলেন। এ-কি! এ লোক তো এখনও উঠল না!- মূসা এগিয়ে গিয়ে লোকটিকে তুলতে গেলেন। কিন্তু তিনি বিষ্মিত হলেন। দেখলেন তার ঐ এক ঘুষিতেই ইতিমধ্যেই ঐ কিবতী মৃত্যুবরণ করেছে।

মিসরীয়কে প্রাণে মারার ইচ্ছে তো মূসার ছিল না। ইস্রায়েলীকে জুলুম থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যেই তিনি তাকে একটা মাত্র ঘুসি মেরেছিলেন মাত্র, কিন্তু এতেই সে মারা গেল। মূসা অনুভব করলেন ঘুসির জোর আরও কম মাত্রারই ঐ কিবতীর জন্যে প্রযোজ্য ছিল। সুতরাং তার বাড়াবাড়িতে ঐ মিসরীয়র মৃত্যু হওয়ায় তিনি দুঃখিত হয়ে আক্ষেপ করে বললেন, ‘শয়তানের বুদ্ধিতে এ ঘটল। সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।’
তারপর তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে দু‘হাত উর্দ্ধে বাড়িয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের উপর জুলুম করেছি, সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর।’

মূসার এক ঘুষিতে মিসরীয় নিহত
অতঃপর মূসা এদিক ওদিক তাকিয়ে আশেপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে তাড়াতাড়ি শোষক লোকটির লাশকে বালির মধ্যে কবর দিয়ে দিলেন। তারপর আল্লাহর উদ্দেশ্যে বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ করেছ তার শপথ, আমি কখনও কোন অপরাধীকে সাহায্য করব না।’
মূসা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে সরে পড়লেন।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- সে (মূসা) শহরে প্রবেশ করল যখন তার বাসিন্দারা ছিল অসতর্ক। সেখানে সে-যে দু‘টো লোককে মারামারি করতে দেখল তাদের একজন তার দলের আর একজন শত্রু পক্ষের। মূসার দলের লোকটি শত্রুর বিরুদ্ধে তার সাহায্য চাইল। 

তারপর মূসা ওকে ঘুসি মারলে সে শেষ হয়ে গেল। তখন মূসা বলল, ‘শয়তানের বুদ্ধিতে এ ঘটল। সে তো প্রকাশ্য শত্রু ও বিভ্রান্তকারী।’ 

সে বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমি তো আমার নিজের ওপর জুলুম করেছি, সুতরাং তুমি আমাকে ক্ষমা কর।’ তারপর তিনি তাকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল পরম দয়ালু। 
সে আরও বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমার উপর যে অনুগ্রহ করেছ তার শপথ, আমি কখনও অপরাধীকে সাহায্য করব না।’(২৮:১৫-১৭)

মিসরীয় লোকটিকে হত্যার সময় সেখানে অন্য কোন লোক উপস্থিত ছিল না। ফলে হত্যার ঘটনা প্রকাশ পাবার কোন আশঙ্কা ছিল না। আর ঐ ইস্রায়েলীর তো কিবতীর মৃত্যুর কথা জানতে পারার কথা নয়। আর জানলেও তো তার এ ঘটনা প্রকাশ করার কথাই না, কারণ তাকে রক্ষা করতে গিয়েই তো ঐ দুর্ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু তবুও মূসা ভয়ে ভয়ে ছিলেন এবং ভীতচকিত হয়ে চারিদিক দেখতে দেখতে ঐ শহরেই রাতটা পার করে দিলেন।

মূসা সর্বদা মনে মনে দৃঢ়ভাবে এই আশা পোষণ করতেন যে, তার নিজের লোকেরা তাকে উদ্ধারকর্তা হিসেবে গ্রহণ করবে এবং তাকে সর্বদা সমর্থন করবে, কিন্তু পরের দিনের ঘটনায় তিনি বুঝতে পারলেন ইস্রায়েলীদের সম্পর্কে তার ধারণা কতটাই না ভুল।

সকালে মূসা পথ চলতে চলতে একস্থানে দেখতে পেলেন গতকাল যে লোকটি তার সাহায্য চেয়েছিল সে অপর একজনের সাথে মারামারি করছে, আর তাকে দেখতে পেয়ে তার সাহায্যের জন্যে চিৎকার করছে। মূসা এগিয়ে গিয়ে তাকে বললেন, ‘তুমি তো স্পষ্টতই একজন ঝগড়াটে লোক।’

তবে কি মূসা তার উপর রেগে গিয়েছেন? ইস্রায়েলী সন্দেহে পড়ল। অতঃপর মূসা যখন তাদের দু’জনের শত্রুকে মারতে উদ্যত হলেন তখন ঐ ইস্রায়েলী ভাবল মূসা তাকেই মারতে যাচ্ছেন। সুতরাং তৎক্ষণাৎ সে চিৎকার করে বলে উঠল, ‘হে মূসা! গতকাল তুমি যেভাবে একটা লোককে খুন করেছ সেভাবে আমাকেও খুন করতে চাও না-কি? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চলেছ, তুমি কি একজন সংশোধনকারী হতে চাও না?’

ইস্রায়েলীর মুখে একথা শুনে মূসা ভীত হলেন। তিনি ভাবলেন নিশ্চয়ই ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেছে। নইলে গোপন ঐ বিষযটি সে জানল কি করে? তিনি যখন এসব ভাবছেন, সেই সময় সুযোগ বুঝে মিসরীয়টি সঁটকে পড়ল আর মনে মনে বলল-‘তাহলে এই কথা! দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা! কত ধানে কত চাল বুঝবে এবার বাবা!’- কাল বিলম্ব না করে ঐ মিসরীয় রাজ দরবারে ছুটে গেল এবং হত্যার বিষয়ে ফেরাউনকে অবহিত করল।

মূসার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ পেয়ে ফেরাউন উৎফুল্ল হয়ে উঠলেন। অনতি বিলম্বে তিনি মূসাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। রক্ষীরা সাথে সাথেই শহরের অলিতে গলিতে তার খোঁজে ছড়িয়ে পড়ল। আর তারা মনে মনে বলতে লাগল-‘এতবড় কান্ড ঘটিয়ে এই মূসাটা পালাবে কোথায়?’
রাজকীয় রক্ষীরা প্রধান প্রধান সড়কে নিশ্চিদ্র পাহারা বসিয়ে দিল।

আরবের মিদিয়ান।
এদিকে গ্রেফতারী পরোয়ানা সম্পর্কে মূসা কিছুই জানতে পারলেন না। কিন্তু তার এক হিতাকাঙ্খী এবং ফেরাউনের বিশ্বস্ত এক রাজকর্মচারী ইউশায়া ইবনে নূন মূসা সম্পর্কে গৃহীত সরকারী সিদ্ধান্তের কথা জানতে পেরে শহরের দূরপ্রান্ত থেকে ছুটে এলেন এবং মূসাকে খুঁজে পেয়ে তিনি বললেন, ‘হে মূসা! ফেরাউনের পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার জন্যে ষড়যন্ত্র করছে। সুতরাং তুমি বাইরে চলে যাও। আর আমি তোমার ভালোর জন্যেই বলছি।’
একথা শুনে মূসা আকাশের দিকে দু‘হাত তুলে প্রার্থনা করলেন, ‘হে আমার প্রতিপালক! সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর।’

ভীত চকিত অবস্থায় মূসা নিজ জীবন রক্ষা করতে শহর থেকে বের হয়ে গেলেন। যে অঞ্চলে তিনি পলায়ন করেছিলেন, তা ছিল আরবের মিদিয়ান, অনুর্বর মরুভূমি এলাকা।

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-তারপর ভয়ে চারধার দেখতে দেখতে সে শহরে তার সকাল হয়ে গেল। (সে শুনতে পেল) আগের দিন যে লোকটি তার সাহায্য চেয়েছিল সে তার সাহায্যের জন্যে চিৎকার করছে। মূসা তাকে বলল, ‘তুমি তো স্পষ্টই একজন ঝগড়াটে লোক।’
তারপর মূসা যখন তাদের দু’জনের শত্রুকে মারতে উদ্যত হল তখন সে লোকটি বলে উঠল, ‘হে মূসা! গতকাল তুমি যেভাবে একটা লোককে খুন করেছ সেভাবে কি আমাকেও খুন করতে চাও? তুমি তো পৃথিবীতে স্বেচ্ছাচারী হতে চলেছ, তুমি কি একজন সংশোধনকারী হতে চাও না?’

শহরের দূরপ্রান্ত থেকে ছুটে এসে একটি লোক বলল, ‘হে মূসা! (ফেরাউনের) পরিষদবর্গ তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে। সুতরাং তুমি বাইরে চলে যাও। আর আমি তোমার ভালোর জন্যেই বলছি।’

ভীত চকিত অবস্থায় সে সেখান থেকে বের হয়ে গেল আর বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! সীমালংঘনকারী সম্প্রদায়ের হাত থেকে তুমি আমাকে রক্ষা কর।’(২৮:১৮-২১)

সমাপ্ত।
ছবি: archelogicalsite.blogspot, nexttriptourism, theconspiracyreview,

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন