pytheya.blogspot.com Webutation

১৮ মার্চ, ২০১২

Hajj: হজ্জ্বের বিধি-বিধান।


ছয় বৎসর হল মক্কার মোহাজিররা তাদের দেশ ও ভিটেমাটি ত্যাগ করেছিলেন তাদের ধর্মের জন্যে ও তার জন্যে যিনি তাদের মধ্যে অভূতপূর্ব চেতনা জাগিয়ে দিয়েছিলেন যা তাদের মধ্যে কোনদিন অনুভূত হয়নি। তাদের মধ্যে জাগ্রত করেছিলেন ঐক্য, প্রেম ও ভ্রাতৃত্ব। আরবের প্রত্যেক অংশ থেকে মানুষ এই বিস্ময়কর ব্যক্তির কথা শ্রবণ করার জন্যে, প্রত্যাহিক জীবনের বিভিন্ন কাজে পরামর্শ গ্রহণের জন্যে তার কাছে আসতে লাগলেন, যেমন অতীতে বনি ইস্রায়েলীরা নবী ইসমাইলের সঙ্গে আলোচনা করতেন।

কা'বায় হজ্জ্ব দৃশ্য।
মোহাজিরদের হৃদয় জন্মভূমির জন্যে কাঁদত। গৃহ থেকে বহিঃস্কৃত হয়ে তারা একটি প্রতিদ্বন্দ্বী শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তারা পবিত্র কা’বাগৃহের সীমানা থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন যাছিল তাদের সকল সমষ্টিগত সম্পর্কের গৌরবময় কেন্দ্র। এই স্থানটিকে কেন্দ্র করেই তাদের জাতীয় জীবনের ইতিহাস সঞ্চিত হয়েছিল। মুহম্মদ নিজেও জন্মভূমি দর্শনের জন্যে প্রবল ইচ্ছে অনুভব করছিলেন। কা’বাগৃহ সমগ্র আরব জাতির অধিকারভূক্ত ছিল। কুরাইশরা এই পবিত্র গৃহের অভিভাবক ছিল মাত্র। তারা দেশীয় আইন অনুসারে এমনকি একজন শত্রুর আগমনও নিবারণ করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়নি, যদি সে ব্যক্তি কোনরূপ শত্রুতামূলক অভিসন্ধি প্রদর্শণ না করত এবং ধর্মীয় কর্তব্য পালনের প্রকাশ্য স্বীকৃতি ঘোষণা করত।
‘নিঃসন্দেহে সর্বপ্রথম গৃহ যা মানুষের জন্যে নির্ধারিত হয়েছে, সেটাই হচ্ছে এ গৃহ, যা বাক্কায় অবস্থিত এবং সারা জাহানের মানুষের জন্যে হেদায়েত ও বরকতময়। এতে রয়েছে ‘মকামে ইব্রাহিম’এর মত প্রকৃষ্ট নিদর্শণ। আর যে লোক এর ভিতরে প্রবেশ করেছে, সে নিরাপত্তা লাভ করেছে। আর এই গৃহের হজ্জ্ব করা হল মানুষের উপর আল্লাহর প্রাপ্য; যে লোকের সামর্থ রয়েছে এ পর্যন্ত পৌঁছার।(৩:৯৬-৯৭)  

কা'বার প্লান।
হিজরী ৩য় সনের দিকে উপরোক্ত কোরআনের আয়াত দ্বারা হজ্জ্বকে (Hajj) ফরজ করা হল। অবশ্য ইতিপূর্বেও হজ্জ্বের নির্দেশ ছিল। অত:পর তা সময়ের বিবর্তণে এক কূ-প্রথায় পরিণত হয়। বলা যায় জাহেলিয়াত যুগে শয়তান মানুষকে যেসব লজ্জাজনক ও অর্থহীন কূ-প্রথায় লিপ্ত করেছিল, তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি ছিল হজ্জ্ব পদ্ধতি।

কুরাইশ ছাড়া (হরমের সেবক হওয়ার সুবাদে তারা এ আইনের ব্যতিক্রম ছিল) কোন ব্যক্তি নিজবস্ত্র পরিহিত অবস্থায় কা‘বাগৃহ তাওয়াফ করতে পারত না। তাকে কুরাইশ গোত্রের কোন না কোন ব্যক্তির কাছ থেকে বস্ত্র ধার করতে হত। কিন্তু হজ্জ্বে আগত সব মানুষকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বস্ত্র প্রদান করা সম্ভবপর ছিল না। তাই আগত পুরুষ ও মহিলাদের প্রায় সকলেই উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত। মহিলারা সাধারণতঃ রাতের বেলায় তাওয়াফের কাজটা সারত। আর তাদের এই তাওয়াফ ছিল, শিস বাজাতে বাজাতে এবং তালি দিতে দিতে কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করা। উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার বৈধতার প্রশ্নে তারা বলত, ‘আল্লাহই আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদের বাপ-দাদাদের তরিকাও এটা।’

মূর্খ বাপ-দাদার অনুসরণ করার মধ্যে কোন যৌক্তিকতা নেই। কোন তরিকার বৈধতার পক্ষে এটা কোন প্রমান হতে পারে না যে, বাপ-দাদারা এরূপ করত। কেননা বাপ-দাদার তরিকা হওয়া যদি কোন তরিকার বিশুদ্ধতার জন্যে যথেষ্ট হয়, তবে দুনিয়াতে বিভিন্ন লোকের বাপ-দাদার বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী তরিকা ছিল এবং এ যুক্তির ফলে জগতের সব ভ্রান্ত তরিকাও বৈধ ও বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়ে যায়।

আবার অনেকে বলত, ‘যে সব পোষাক পরিধান করে আমরা পাপ কাজ করি, সেগুলো পরিধান করে আল্লাহর গৃহ প্রদক্ষিণ করা বেয়াদবী।’
এই জ্ঞানপাপীরা এ বিষয়টি বুঝত না যে, উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা আরও বেশী বেয়াদবীর কাজ।

এদের এই নির্লজ্জ প্রথা ও কথার জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- আর কা‘বার কাছে তাদের নামাজ বলতে শিস দেয়া ও তালি বাজান ছাড়া আর অন্যকোন কিছুই ছিল না।(৮:৩৫)
তারা যখন কোন মন্দকাজ করে, তখন বলে, আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহ আমদেরকে এই নির্দেশই দিয়েছেন।’
আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না।(৭:২৮)

তুমি বলে দাও, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন-যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায় অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে শরীক করা, তিনি যার কোন সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।(৭:৩৩)

যাইহোক এখন হজ্জ্বকে ফরজ করা হলে আ‘কবা ইবনে হারেস প্রশ্ন করলেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ! আমাদের জন্যে কি প্রতি বৎসরই হজ্জ্ব করা ফরজ?’
মুহম্মদ এই প্রশ্নের কোন উত্তর দিলেন না। এতে তিনি পুনর্বার ঐ একই প্রশ্ন রাখলেন। মুহম্মদ এবারও চুপ। প্রশ্নকারী ৩য়বার ঐ একই প্রশ্ন রাখলে তিনি বললেন, ‘আমি যদি তোমার প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বলতাম, তবে প্রতি বৎসরই হজ্জ্ব ফরয হয়ে যেত। কিন্তু তুমি নিজেও এই আদেশ পালন করতে পারতে না। সুতরাং যে সব বিষয়ে আমি নিরব থাকি সেগুলি নিয়ে বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করবে না।’

এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- ইতিপূর্বে মূসা যেমন জিজ্ঞাসিত হয়েছিল, (মুসলমানগণ) তোমরাও কি তোমাদের রসূলকে তেমনি প্রশ্ন করতে চাও?(২:১০৮)
হে মুমিনগণ! এমন কথাবার্তা জিজ্ঞেস কোরও না, যা তোমাদের কাছে পরিব্যক্ত হলে তোমাদের খারাপ লাগবে। যদি কোরআন অবতরণকালে তোমরা এসব বিষয় জিজ্ঞেস কর, তবে তা তোমাদের জন্যে প্রকাশ করা হবে। অতীত বিষয় আল্লাহ ক্ষমা করেছেন আল্লাহ ক্ষমাশীল, সহনশীল। এরূপ কথাবার্তা তোমাদের পূর্বে এক সম্প্রদায় জিজ্ঞেস করেছিল। এরপর তারা এসব বিষয়ে অবিশ্বাসী হয়ে গেল।(৫:১০১-১০২)

মকামে ইব্রাহিম।
যাইহোক হজ্জ্ব ফরজ হবার পর হজ্জ্বের বিধিবিধান সম্বলিত এই ৮টি আয়াত নাযিল হল- আর তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ্জ্ব ও ওমরাহ পরিপূর্ণভাবে পালন কর। যদি তোমরা বয়োপ্রাপ্ত হও, তাহলে কোরবাণীর জন্যে যা কিছু সহজলভ্য, তাই তোমাদের উপর ধার্য্য। আর তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত মাথা মুন্ডন করবে না, যতক্ষণ না কোরবানী যথাস্থানে পৌঁছে যাবে। যারা তোমাদের মধ্যে অসুস্থ্য হয়ে পড়বে, কিম্বা মাথায় যদি কোন কষ্ট থাকে, তাহলে তার পরিবর্তে রোজা করবে, কিম্বা খয়রাত দেবে অথবা কোরবাণী করবে। 

আর তোমাদের মধ্যে যারা হজ্জ্ব ও ওমরাহ একত্রে একই সাথে পালন করবে চাও, তবে যা কিছু সহজলভ্য, তা দিয়ে কোরবাণী করাই তার উপর কর্তব্য। বস্তুতঃ যারা কোরবাণীর পশু পাবে না, তারা হজ্জ্বে দিনগুলোর মধ্যে রোজা রাখবে তিনটি আর সাতটি রোজা রাখবে ফিরে যাবার পর। এভাবে দশটি রোজা পূর্ণ হয়ে যাবে। এ নির্দেশটি তাদের জন্যে, যাদের পরিবার পরিজন মসজিদুল হারামের আশেপাশে বসবাস করে না। আর আল্লাহকে ভয় করতে থাক। সন্দেহাতীতভাবে জেন যে, আল্লাহর আযাব বড়ই কঠিন।

হজ্জ্বের কয়েকটি মাস আছে সুবিদিত। এসব মাসে যে লোক হজ্জ্বের পরিপূর্ণ নিয়ত করবে, তার পক্ষে স্ত্রীও নিরাভরণ হওয়া জায়েজ নয়। না অশোভন কোন কাজ করা, না ঝগড়া বিবাদ করা হজ্জ্বের সেই সময় জায়েজ নয়। আর তোমরা যাকিছু সৎকাজ কর, আল্লাহ তা জানেন। আর তোমরা পাথেয় সাথে নিয়ে নাও। নিঃসন্দেহে সর্বেত্তম পাথেয় হচ্ছে আল্লাহর ভয়। আর আমাকে ভয় করতে থাক, হে বুদ্ধিমানরা! তোমাদের উপর তোমাদের পালনকর্তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করায় কোন পাপ নেই। 

সাফা ও মারওয়া পর্বতদ্বয় বর্তমানে কাবা কমপ্লেক্সের 
অংশ বিশেষ, মধ্যবর্তী দূরত্ব ৪৫০ মি.।
অতঃপর যখন তাওয়াফের জন্যে ফিরে আসবে আরাফাত থেকে, তখন মাশ’ আরে হারামের কাছে আল্লাহকে স্মরণকর। আর তাঁকে স্মরণকর তেমনি করে, যেমন তোমাদিগকে হেদায়েত করা হয়েছে--আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে তোমরা ছিলে অজ্ঞ। অতঃপর তাওয়াফের জন্যে দ্রুত গতিতে সেখান থেকে ফিরে আস, যেখান থেকে সবাই ফিরে। আর আল্লাহর কাছে মাগফেরাত কামনা কর। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাকারী, করুণাময়।

আর অতঃপর যখন হজ্জ্বে যাবতীয় অনুষ্ঠান ক্রিয়াদি সমাপ্ত করে সারবে, তখন স্মরণ করবে আল্লাহকে, যেমন করে তোমরা স্মরণ করতে নিজেদের বাপ-দাদাদেরকে, বরং তারচেয়েও বেশী স্মরণ করবে। তারপর অনেকে তো বলে যে, হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে দান কর। অথচ তার জন্যে পরকালে কোন অংশ নেই। আর তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলে, হে পরওয়ারদেগার! আমাদিগকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান কর এবং আখেরাতেও কল্যাণ দান কর এবং আমাদিগকে দোযখের আযাব থেকে রক্ষা কর। এদেরই জন্যে অংশ রয়েছে নিজেদের উপার্জিত সম্পদের। আর আল্লাহ দ্রুত হিসেবগ্রহণকারী। আর স্মরণকর আল্লাহকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কয়েকটি দিনে। অতঃপর যে লোক তাড়াহুড়ো করে চলে যাবে শুধু দু‘দিনের মধ্যে, তার জন্যে কোন পাপ নেই, অবশ্য যারা ভয় করে। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় করতে থাক এবং নিশ্চিত জেনে রাখ, তোমরা সবাই তাঁর সামনে সমবেত হবে।(২:১৯৬-২০৩) 

এ ছাড়াও হজ্জ্ব সংক্রান্ত আরও কয়েকটি আয়াত রয়েছে-নিঃসন্দেহে সাফা ও মারওয়া আল্লাহর নিদর্শণগুলোর মধ্যে অন্যতম। সুতরাং যারা কা‘বা গৃহে হজ্জ্ব বা ওমরাহ পালন করে, তাদের পক্ষে এ দু‘টিতে প্রদক্ষিণ করাতে কোন দোষ নেই। বরং কেই যদি স্বেচ্ছায় কিছু নেকীর কাজ করে, তবে আল্লাহ অবশ্যই তা অবগত হবেন এবং তার সে আমলের সঠিক মূল্য দেবেন। (২:১৫৮)

জামরাতে শয়তানের প্রতীক।
এবং কা‘বার জন্যে উৎসর্গীতকৃত উটকে আমি তোমাদের জন্যে আল্লাহর অন্যতম নিদর্শণ করেছি। এতে তোমাদের জন্যে মঙ্গল রয়েছে। সুতরাং সাঁরিবদ্ধভাবে বাঁধা অবস্থায় তাদের জবেহ করার সময় তোমরা আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর। অতঃপর যখন তারা কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে তোমরা আহার কর এবং আহার করাও যে কিছু যাঞ্ছা করে না তাকে এবং যে যাঞ্ছা করে তাকে। এমনিভাবে আমি এগুলিকে তোমাদের বশীভূত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। এগুলোর মাংস ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শণ করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও।(২২:৩৬-৩৭)

প্রতি বৎসর লক্ষ লক্ষ লোক হজ্জ্ব করতে আসেন। প্রত্যেক হাজী জামরাত নামক স্থানে একটি প্রতীক (শয়তানের) লক্ষ্য করে দৈনিক সাতটি করে কঙ্কর তিনদিন পর্যন্ত নিক্ষেপ করেন। সরকারের পক্ষ থেকে এসব কঙ্কর সরিয়ে নেবার কোন ব্যবস্থা নেই। যদি এসব কঙ্কর সেখানেই জমা থাকত, তবে এক বৎসরেই কঙ্করের স্তুপের নীচে জামরাত অদৃশ্য হয়ে যেত। অথচ হজ্জ্বের তিনদিন অতিবাহিত হবার পরেও সেখানে কঙ্কর খুব একটা দেখা যায় না। এর কারণ সম্বন্ধে মুহম্মদ বলেছেন, ‘ফেরেস্তারা এসব কঙ্কর তুলে নেয় এবং যাদের হজ্জ্ব কবুল হয় না, শুধু তাদের কঙ্করই এখানে থেকে যায়।’

এই কারণেই জামরাত থেকে কঙ্কর তুলে নিক্ষেপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা এগুলো কবুল করা হয়নি।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, go-makkah, thekeytoislam.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন