pytheya.blogspot.com Webutation

৭ মার্চ, ২০১২

Battle of Hunayn: হুনায়েনের যুদ্ধ এবং আটককৃত হাওয়াজিন।

হাওয়াজিন, সকিফ ও অন্যান্য শক্তিশালী বেদুইন গোত্রগুলো মক্কার সীমান্তবর্তী রাজ্যসমূহে তাদের গবাদিপশু চরাত। মুসলমানদের কর্তৃক মক্কা বিজিত হওয়ায় এই সকল গোত্রসমূহের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করল। তারা ভাবল মক্কা বিজয়ের পর মুসলমানরা বিপুল শক্তি সঞ্চয় করেছে, আর তাদের পরবর্তী আক্রমণের লক্ষ্য হবে তায়েফ। এ কারণে তারা, মুসলমানরা আরও সু-সংগঠিত হবার পূর্বেই তাদেরকে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিল। 

এসব গোত্র বিনা বাঁধায় মুসলমানদের আনুগত্য স্বীকার করতে অনিচছুক ছিল। তাদের কোন কোন গোত্রের তায়েফের মত সুরক্ষিত দূর্গের শহর ছিল। সুতরাং তারা দ্রুত একটি সংঘবদ্ধ সৈন্যদল গঠন করল যেন মুহম্মদ প্রস্তুতি নিয়ে প্রতিহত করার পূর্বেই তাকে পর্যুদস্ত করা যায়। 

এই সকল গোত্রের এই অভিসন্ধি সম্পর্কে মুহম্মদ মক্কাতে থাকা অবস্থাতেই অবহিত হলেন। তখন তিনিও দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন এবং এই প্রস্তুতিতে তিনি কুরাইশদের কাছ থেকে যুদ্ধাস্ত্র ধারস্বরূপ গ্রহন করলেন। ধার নেয়া এই যুদ্ধাস্ত্র ছিল একশত লৌহবর্ম ও তিন হাজার বর্শা। 

যুদ্ধের প্রস্তুতি শেষে মুহম্মদ আত্তাব ইবনে আসাদকে মক্কার আমীর নিয়োগ করলেন এবং মু‘আজ ইবনে জাবালকে তার সাথে রাখলেন লোকদের ইসলামী তলীম দানের জন্যে। তারপর তিনি হাওয়াজিনদের দমনে চৌদ্দ হাজারের এক বাহিনী নিয়ে ৮ম হিজরীর ৬ই শাওয়াল, শুক্রবার যাত্রা করলেন- যাদের মধ্যে ছিল দশ হাজার আনসার ও মুহাজির- যারা মক্কা বিজয়ে মুহম্মদের সঙ্গে মদিনা থেকে এসেছিল ও চার হাজার ‘তোলাকা’ বা সাধারণ ক্ষমায় মুক্তিপ্রাপ্তরা অর্থাৎ যারা মক্কা বিজয়ের দিনে মুসলমান হয়েছিল। 

মক্কার প্রায় দশ মাইল উত্তর পূর্ব দিকে গভীর ও সংকীর্ণ গিরিপর্বত হুনায়েনের কাছে মুসলমানরা ছাউনি ফেলল। অদূরে সঙ্ঘবদ্ধ গোত্রসমূহ মালেক ইবনে আউফের নেতৃত্বে সেনা সমাবেশ করেছিল। এই দলে ছিল চার হাজার যোদ্ধার পরিবার পরিজনসহ প্রায় আঠাশ হাজার লোক। হাওয়াজিন গোত্রের দু‘টি শাখা বনি কাব ও বনি কালব এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করল না, কেনানা তারা বুঝতে পেরেছিল এই যুদ্ধে তারা পরাজিত হবে। হাওয়াজিনের বাকী সকল শাখা গোত্র তাদের সমস্ত সহায়-সম্পত্তি, স্ত্রী-পুত্র-কন্যাসহ যুদ্ধে এল এ কারণে যে, কেউ যেন তাদের সহায়-সম্পদ বা পরিবারের টানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে ফিরে চলে যেতে না পারে।

হাওয়াজিন গোত্রের সেনাপতি মালেক ইবনে আউফ তার স্বল্পসংখ্যক যোদ্ধাকে সুপরিকল্পিত ভাবে যুদ্ধের ময়দানে সমাবেশ করলেন। যাহোক পৌত্তলিকরা প্রভূত ক্ষতিসহকারে পরাজয়বরণ করেছিল। আর তাদের কিছু যোদ্ধা পালিয়ে তায়েফে আশ্রয় নিল। হাওয়াজিন পরিবারসমূহের পার্থিব ধন-সম্পদ পশুপালসহ মুসলমানদের হস্তগত হল। ৬ হাজার যুদ্ধবন্দীসহ বিপুল পরিমান এই গনিমতের মালের মধ্যে ছিল চব্বিশ হাজার উট, চব্বিশ হাজার বকরী এবং চার হাজার উকিয়া রৌপ্য।

পালিয়ে যাওয়া যোদ্ধাদের ধাওয়া করে মুহম্মদ তায়েফ অবরোধ করলেন। কিন্তু কয়েকদিন পর তিনি অবরোধ তুলে নিলেন। কেননা তার ধারণা হল তারা এমনিতেই আত্মসমর্পণ করবে।

তায়েফ অবরোধ শেষে, যেখানে হুনায়েনের যুদ্ধে (Battle of Hunayn) আটককৃত হাওয়াজিনদের নিরাপত্তার জন্যে রাখা হয়েছিল, সেখানে ফিরে এসে মুহম্মদ দেখতে পেলেন যে, হাওয়াজিন গোত্রের একটি প্রতিনিধিদল সবেমাত্র এসে তার আগমনের প্রতীক্ষা করছেন, তাদের পরিবার পরিজনদের ফিরিয়ে দেবার অনুরোধ নিয়ে। তারা বললেন, ‘হে মুহম্মদ! এই বন্দীদিগের মধ্যে আপনার দুধ-ভাই, দুধ-ভগ্নি এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। ছোটবেলায় আপনাকে আমরাই লালন-পালন করেছিলাম। এখন আপনি কত উচ্চ আর আমরা কত তুচ্ছ! অতীতের কথা মনে করে আজ আমাদের প্রতি সদয় হোন।’
প্রকৃতপক্ষে পূর্বাহ্নেই মুহম্মদ তার দুধ-ভগ্নি শায়মাকে চিনতে পেরেছিলেন এবং তৎক্ষণাৎ তাকে মুক্ত করে তার পরিবারের অন্যান্যদের কাছে উপঢৌকনসহ পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এই বেদুইন কন্যা শায়মা (সুমাইয়া), শৈশবে মুহম্মদকে লালন-পালনে তার মাতা হালিমাকে সাহায্য করতেন। আপন সহোদরের মত তাকে দোলা দিতে দিতে তিনি গাইতেন -

‘বেঁচে থাকুক মুহম্মদ-সে দীর্ঘজীবি হোক
চির-তরুণ, চির-কিশোর, চির-মধুর রো‘ক।
হয় যেন সে সর্দার আর পায় যেন সে মান,
শত্রু তার ধ্বংস হোক-ঘুচুক অকল্যাণ।
মুহম্মদের পানে খোদা করুণ চোখে চাও,
চিরস্থায়ী গৌরব যা-তাই তারে দাও।’

নিজেদের অধিকার সচেতনতা সম্পর্কে আরবদের স্বভাব-সংবেদতা মুহম্মদ অবহিত ছিলেন, সুতরাং তিনি বেদুইন প্রতিনিধিদেরকে বললেন, ‘আমি আমার লোকজনদেরকে বিজয়ের সমুদয় ফলাফল পরিত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব না। কাজেই যদি আপনারা আপনাদের পরিবার-পরিজনদেরকে ফিরে পেতে চান, তবে অন্ততঃপক্ষে আপনাদের দ্রব্য-সম্ভার দন্ড দিতে হবে।’ 

হাওয়াজিন প্রতিনিধিরা এতে আনন্দের সাথেই সম্মত হলেন। সুতরাং তারা পরদিন মুহম্মদ ও তার শিষ্যবৃন্দ যখন জোহরের নামাজ পড়ছিলেন তখন এসে এই অনুরোধ করলেন, ‘আমাদের নারী ও শিশুদের পুনর্বাসনের ব্যাপারে আমরা মুহম্মদকে মুসলমানদের সঙ্গে এবং মুসলমানদেরকে মুহম্মদের সঙ্গে মধ্যস্থতা করতে সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাচ্ছি।’
এতে মুহম্মদ মুসলমানদিগের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এদের কাছে আমি চিরঋণী।’ 
অতঃপর প্রতিনিধিদেরকে জবাব দিলেন, ‘আমার এবং আব্দুল মুত্তালিবের পুত্রদের ভাগে যেসব বন্দী পড়েছে আমি এই মূহুর্তে তাদেরকে মুক্তি দিলাম।’ 

শিষ্যবৃন্দ তার মনোভাব বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করলেন এবং এক মূহুর্তে ছয় হাজার বন্দী মুক্তিলাভ করল। এই মহানুভবতা অনেক সকিফদের অন্তর জয় করল, তারা আনুগত্য স্বীকার করল ও অনুরাগী মুসলমানে পরিণত হল।

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন