pytheya.blogspot.com Webutation

৭ মার্চ, ২০১২

Hajj: পৌত্তলিকদের হজ্জ্ব নিষিদ্ধ।

জাহেলিয়াত যুগে শয়তান মানুষকে যেসব লজ্জাজনক ও অর্থহীন কূ-প্রথায় লিপ্ত করেছিল, তন্মধ্যে একটি হল হজ্জ্ব (Hajj) পদ্ধতি। কুরাইশ ছাড়া (হরমের সেবক হওয়ার সুবাদে তারা এ আইনের ব্যতিক্রম ছিল) কোন ব্যক্তি নিজবস্ত্র পরিহিত অবস্থায় কা‘বাগৃহ তাওয়াফ করতে পারত না। তাকে কুরাইশ গোত্রের কোন না কোন ব্যক্তির কাছ থেকে বস্ত্র ধার করতে হত। কিন্তু হজ্জ্বে আগত সব মানুষকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বস্ত্র প্রদান করা সম্ভবপর ছিল না। তাই আগত পুরুষ ও মহিলাদের প্রায় সকলেই উলঙ্গ অবস্থায় তাওয়াফ করত। মহিলারা সাধারণতঃ রাতের বেলায় তাওয়াফের কাজটা সারত। আর তাদের এই তাওয়াফ ছিল, শিস বাজাতে বাজাতে এবং তালি দিতে দিতে কাবাগৃহ প্রদক্ষিণ করা। উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করার বৈধতার প্রশ্নে তারা বলত, ‘আল্লাহই আমাদের এই নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদের বাপ-দাদাদের তরিকাও এটা।’

মূর্খ বাপ-দাদার অনুসরণ করার মধ্যে কোন যৌক্তিকতা নেই। কোন তরিকার বৈধতার পক্ষে এটা কোন প্রমান হতে পারে না যে, বাপ-দাদারা এরূপ করত। কেননা বাপ-দাদার তরিকা হওয়া যদি কোন তরিকার বিশুদ্ধতার জন্যে যথেষ্ট হয়, তবে দুনিয়াতে বিভিন্ন লোকের বাপ-দাদার বিভিন্ন ও পরস্পর বিরোধী তরিকা ছিল এবং এ যুক্তির ফলে জগতের সব ভ্রান্ত তরিকাও বৈধ ও বিশুদ্ধ প্রমাণিত হয়ে যায়।

আবার অনেকে বলত, ‘যে সব পোষাক পরিধান করে আমরা পাপ কাজ করি, সেগুলো পরিধান করে আল্লাহর গৃহ প্রদক্ষিণ করা বেয়াদবী।’
এই জ্ঞানপাপীরা এ বিষয়টি বুঝত না যে, উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ করা আরও বেশী বেয়াদবীর কাজ।

এদের এই নির্লজ্জ প্রথা ও কথার জবাবে এই আয়াত নাযিল হয়েছিল- আর কা‘বার কাছে তাদের নামাজ বলতে শিস দেয়া ও তালি বাজান ছাড়া আর অন্যকোন কিছুই ছিল না।(৮:৩৫) 
তারা যখন কোন মন্দকাজ করে, তখন বলে, আমরা বাপ-দাদাকে এমনি করতে দেখেছি এবং আল্লাহ আমদেরকে এই নির্দেশই দিয়েছেন।’
আল্লাহ মন্দ কাজের আদেশ দেন না। এমন কথা আল্লাহর প্রতি কেন আরোপ কর, যা তোমরা জান না।(৭:২৮)
তুমি বলে দাও, আমার পালনকর্তা কেবল অশ্লীল বিষয়সমূহ হারাম করেছেন-যা প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য এবং হারাম করেছেন গোনাহ, অন্যায় অত্যাচার, আল্লাহর সাথে এমন বস্তুকে শরীক করা, তিনি যার কোন সনদ অবতীর্ণ করেননি এবং আল্লাহর প্রতি এমন কথা আরোপ করা, যা তোমরা জান না।(৭:৩৩)

এসময় পর্যন্ত পৌত্তলিকদের কা’বাগৃহে প্রবেশ কিংবা এর প্রাঙ্গনে পৌত্তলিক প্রথা অনুষ্ঠানের উপর কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়নি। কিন্তু এখন এই আয়াতসমূহ নাযিল হল- ‘হে বিশ্বাসীরা! পৌত্তলিকরা অপবিত্র, তাই এ-বৎসরের পর তারা যেন মসজিদ উল হারামের কাছে না আসে।’(৯:২৮) 
আর মহান হজ্জ্বের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা করে দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়িত্বমুক্ত এবং তাঁর রসূলও। অবশ্য যদি তোমরা তওবা কর তবে তা তোমাদের জন্যে কল্যাণকর, আর যদি মুখ ফেরাও, তবে জেনে রেখ, আল্লাহকে তোমরা পরাভূত করতে পারবে না। আর কাফেরদেরকে মর্মান্তিক শাস্তির সংবাদ দাও।(৯:৩)
অতঃপর তোমরা পরিভ্রমণ কর এ দেশে চার মাস কাল। আর জেনে রেখ, তোমরা আল্লাহকে পরাভূত করতে পারে না, আর নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদেরকে লাঞ্ছিত করে থাকেন।(৯:২)

তবে যে মুশরিকদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ অতঃপর যারা তোমাদের ব্যাপারে কোন ত্রুটি করেনি এবং তোমাদের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করেনি, তাদের সাথে কৃতচুক্তিকে তাদের দেয়া মেয়াদ পর্যন্ত পূর্ণ কর। অবশ্যই আল্লাহ সাবধানীদের পছন্দ করেন। অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদের হত্যা কর যেখানে তাদের পাও, তাদের বন্দী কর এবং অবরোধ কর। আর প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের সন্ধানে ওঁৎ পেতে থাক। কিন্তু যদি তারা তওবা করে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থণা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।(৯:৪-৬) 

- এই আয়াতসমূহে মক্কা ও তার আশেপাশের সকলের নিরাপত্তার খাতিরে মুশরিকদের চুক্তিভঙ্গ ও বিশ্বাসঘাতকতার তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে ভবিষ্যতে তাদের সাথে আর কোন চুক্তি না করার এবং ইতিপূর্বে যাদের সাথে চুক্তি করা হয়েছে এবং যারা চুক্তিভঙ্গ করেনি, তাদের মেয়াদপূর্ণ হওয়া অবধি চুক্তি রক্ষার জন্যে মুসলমানদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে। আর যাদের সাথে কোন চুক্তি হয়নি, তাদের সাথে এই অনুকম্পা করা হয়েছে যে, তড়িৎ মক্কা ত্যাগের আদেশের স্থলে চার মাসের সময় দেয়া হয়েছে- যাতে এই অবসরে যেদিকে সুবিধা চলে যেতে পারে। অথবা এই সময়ে ইসলামের সত্যতা উপলব্ধি করে মুসলমান হতে পারে। আল্লাহর এই সকল আদেশের উদ্দেশ্য হল, আগামী সাল নাগাদ যেন মক্কা এসকল বিশ্বাসঘাতক মুশরিকদের থেকে পবিত্র হয়ে যায়। তবে এ ব্যবস্থা যেহেতু প্রতিশোধমূলক নয়; বরং তাদের একটানা বিশ্বাসঘাতকতার প্রেক্ষিতে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যে নেয়া, সেহেতু তাদের সংশোধন ও মঙ্গল লাভের দরজা খোলা রাখা হয়েছে।

উপরের আয়াতসমূহ নাযিল হবার পর পৌত্তলিক ও মুসলমানদের এই মিশ্র অবস্থা বন্ধ করার জন্যে এবং যারা বিশুদ্ধ ইসলাম কিছুটা হাল্কাভাবে গ্রহণ করেছে তাদের ক্ষেত্রে পৌত্তলিকতার সম্ভবনার চির অবসান ঘটানোর জন্যে সিদ্ধান্ত গৃহীত হল। সেই অনুসারে বৎসরের শেষদিকে হজ্জ্বের মাসে কোরবাণীর দিনে জনতার উদ্দেশ্যে একটি ঘোষণাপত্র পাঠ করার জন্যে আলীকে নিযুক্ত করা হল। 

আলী দূর-দূরান্ত থেকে আগত সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বজ্রকন্ঠে এই ঘোষণা পাঠ করলেন- ‘এই বৎসরের পরে কোন পৌত্তলিক কা’বাগৃহে হজ্জ্ব করতে পারবে না, আর নগ্ন অবস্থায় কেউ এ গৃহ প্রদক্ষিণ করতে পারবে না। যাদের সঙ্গে সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে তাদের ক্ষেত্রে সন্ধির শেষসীমা পর্যন্ত এটা বলবৎ থাকবে। অবশিষ্ট লোকদের ক্ষেত্রে দেশে ফেরার জন্যে চার মাস সময় দেয়া হল। অতঃপর যাদের সঙ্গে সন্ধিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তাদের ছাড়া আর কারও প্রতি মুহম্মদের বাধ্যবাধকতা থাকবে না।’
-এই ঘোষণা সরাসরি পৌত্তলিকতা এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় অনৈতিক কার্যকলাপের মর্মমূলে আঘাত হানল। 

এই ঘোষণা মুহম্মদের দূরদৃষ্টি ও প্রজ্ঞার প্রকাশ। যদি বৎসরের পর বৎসর পৌত্তলিক তীর্থযাত্রীরা মুসলমান তীর্থযাত্রীদের সঙ্গে মিশে তাদের ধর্মমতের কামুকতাপূর্ণ ও অধোগামী প্রথাসমূহ অনুষ্ঠিত ও অনুমোদিত হত, তবে তার কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমে যা সম্পাদন করেছিলেন তা শীঘ্রই নির্মূল হয়ে যেত। তিনি এটা অনুভব করেছিলেন এবং আপাতঃ দৃষ্টিতে তিনি কঠোর উপায় অবলম্বণ করলেন, যাছিল চূড়ান্তভাবে কল্যাণকর প্রবণতায় পরিপূর্ণ। যে বিশাল জনতা আলীর ঘোষণা শুনেছিল তারা দেশে ফিরে গেল এবং পরবর্তী বৎসর শেষ হবার পূর্বেই তাদের অধিকাংশ ইসলাম গ্রহণ করল।

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন