pytheya.blogspot.com Webutation

৮ মার্চ, ২০১২

Islam: ইসলামের প্রচার- ষড়যন্ত্র, বিদ্বেষ এবং বিশ্বাসীদের রক্ত রঞ্জিত।

নজদ এলাকায় রেল, যাকওয়ান, ওসাইয়া ও বনি আমের গোত্র বসবাস করত। বদর যুদ্ধের পর মদিনার এই প্রতিবেশী গোত্রসমূহের পক্ষ থেকে বনি আমের গোত্রের নেতা বারা আমের মুহম্মদ সমীপে উপনীত হয়ে ইসলাম প্রচারকদেরকে তাদের মধ্যে গমন করতে প্রলুদ্ধ করলেন। তিনি মুহম্মদকে বলেছিলেন, ‘ও রসূলুল্লাহ! আমি নিজে এবং আমার এলাকাবাসী ইসলামের প্রতি আগ্রহী। আপনি আমাদের মধ্যে কিছু ইসলাম (Islam) প্রচারক পাঠালে আমরা ইসলাম গ্রহণ করব।’

বারা আমেরের কথায় মুহম্মদ সেখানে কিছু প্রচারক পাঠাতে সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে গমনে ইচ্ছুক সাহাবীদের অনেকে ঐ সকল এলাকাবাসী কর্তৃক তাদের অনিষ্টের আশঙ্কা তার কাছে ব্যক্ত করলেন। অতঃপর এই আশঙ্কার কথা তিনি বারা আমেরের কাছে তুলে ধরলে তিনি বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার পাঠান প্রচারকদের দায়িত্ব নিচ্ছি। আপনি বিনা দ্বিধায় তাদেরকে পাঠান।’
তার কথায় মুহম্মদ আশ্বস্থ হয়ে ‘আসহাবে সুফফা’র সত্তুরজন কোরআন বিশেষজ্ঞ মুসলমানকে সেখানে পাঠিয়ে দিলেন।

বনি আমের গোত্রের দলপতি বারা আমেরের ভ্রাতুষ্পুত্র আবু আমের ছিলেন দ্বিতীয় গোত্র প্রধান। তিনি বারার মদিনায় আগমনের কিছু পূর্বে একবার মুহম্মদ সমীপে হাজির হয়ে কতিপয় দাবী উত্থাপন করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘হে মুহম্মদ! আমার ও আপনার মধ্যে এই তিনটি বিষয়ের যে কোন একটি স্থির হওয়া প্রয়োজন-

ক) আপনি পল্লী এলাকার এবং আমি শহর এলাকার নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত থাকব।
খ) আপনার অবর্তমানে আমি আপনার স্থলাভিষিক্ত হব।
গ) এই দু‘টি প্রস্তাবের কোন একটিকে আপনি মেনে না নিলে আমি হাজার হাজার সৈন্য নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হব।

মুহম্মদ আবু আমেরের প্রস্তাবের একটিও গ্রহণ করেননি। ফলে সে বিদ্বেষ নিয়ে মদিনা ত্যাগ করেছিল এবং নিজ গোত্রে ফিরে গিয়ে মুসলমানদের ধ্বংস সাধনের জন্যে প্রহর গুনছিল। 

এদিকে প্রচারকদের দায়িত্ব বারা আমের গ্রহণ করলেও মুহম্মদ কিন্তু পরিপূর্ণ আশ্বস্ত ছিলেন না। সুতরাং তিনি প্রচারকদের হাতে আবু আমেরের উদ্দেশ্যে একটি চিঠিও প্রেরণ করেছিলেন। এই দলটি যখন রিবমাউনা নামক ছোট নদীর কাছে বনি আমের ও বনি সুলায়েমদের রাজত্বের মধ্যে এসে পৌঁছিল, তখন হারাম বিন মেলহান সঙ্গীদেরকে বললেন, ‘একজন সঙ্গীসহ আমি রসূলুল্লাহর চিঠি নিয়ে আবু আমেরের সাথে দেখা করি। আমরা ভালোয় ভালোয় ফিরে না এলে তোমরা আর সম্মুখে পা না বাড়িয়ে মদিনাতে প্রত্যাবর্তণ করবে।’

হারাম আবু আমেরের সাথে সাক্ষাৎ করে তাকে বললেন, ‘আমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বাণী প্রচারে আপনাদের নিরাপত্তা পাব কি?’এ সময় আবু আমেরের ঈশারায় তার একজন অনুগত ব্যক্তি বর্শা দ্বারা হারামকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল। এ দেখে হারামের সঙ্গী পালিয়ে এসে অপেক্ষমানদেরকে তার হত্যার কথা বর্ণনা করলেন। তখন দলের সকলেই প্রত্যাবর্তণের সিদ্ধান্ত নিল।

অত:পর তারা যখন ফিরে যাচ্ছিল সেইসময় আবু আমেরের কয়েক‘শ অনুগত অস্ত্রধারী ব্যক্তি তাদেরকে ঘিরে ফেলল এবং আক্রমণ করে বসল। অগত্যা প্রচারক দল অস্ত্রধারণ করতে বাধ্য হল। কিন্তু অস্ত্র ছিল নগণ্য। আরবের ঐতিহ্য মোতাবেক তাদের সাথে কেবল একখান করে তরবারী ছিল। তাছাড়া তারা তো আর যুদ্ধের জন্যে আগমন করেনি, এসেছে ইসলাম প্রচারের জন্যে। সুতরাং এই সামান্য রসদ নিয়ে বিপুল সংখ্যক শত্রুর মোকাবেলা করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে একে একে তারা সকলেই নিহত হল একজন ব্যতিত। এই ব্যক্তি আমর ইবনে জামরী দল থেকে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল।

বনি আমের গোত্রের আমের বিন তোফায়েল, আমর ইবনে উমাইয়া জামরীকে হত্যা না করে বন্দী করল- কেননা তার একটি ক্রীতদাস মুক্ত করার মানত ছিল। সুতরাং সে আমরের মাথার চুল কেটে মানত পূরণের উদ্দেশ্যে তাকে মুক্ত করে দিল।

ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া আমর ইবনে জামরী হেঁটে মদিনার দিকে অগ্রসর হতে লাগল। পথিমধ্যে একসময় স্বীয় ক্লান্তি দূর করতে সে এক বৃক্ষতলে আশ্রয় নিল। বৃক্ষছায়ায় পূর্ব থেকেই দু‘টি লোক বসে বিশ্রাম নিচিছল। এই দু‘ব্যক্তি মুহম্মদের সাথে শান্তি চুক্তি শেষে নিজ গোত্র মাঝে ফিরে যাচ্ছিল।

পারস্পারিক আলাপচরিতার একপর্যায়ে আমর জানতে পারল লোক দু‘জন বনি আমের গোত্রের বংশোদ্ভূত। যে এইমাত্র অবিশ্বাসী গোত্রের বিশ্বাসঘাতকতায় ৬৯ জন সঙ্গীর নৃশংস হত্যাকান্ড স্বচক্ষে দেখে এসেছে, সেই অবিশ্বাসী গোত্রের লোকদের মোকাবেলায় তার মনোবৃত্তি কি হবে তা অনুমান করা কারও পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। তাছাড়া সে জানত না ঐ দু‘জন মুহম্মদের সাথে নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ। সুতরাং সে তৎক্ষণাৎ ঐ দু‘জনকে তার প্রাণের শত্রু মনে করল এবং প্রতিহিংসা গ্রহণ করতে বদ্ধপরিকর হল। কিন্তু তার কাছে কোন অস্ত্র নেই, সুতরাং সে ঐ দু‘জনের একজনের তরবারী হাতিয়ে নেবার মতলব করল। এই অভিলাষ পূরণে সে তাদের একজনের তরবারী দেখিয়ে তাকে বলল, ‘আপনার তরবারীটা তো খুবই সুন্দর! আমি কি হাতে নিয়ে একটু দেখতে পারি?’
সে বলল, ‘এতে আপত্তির কি আছে?’- তরবারীখানা তিনি আমরের হাতে দিল। 

আমর তরবারী হাতে নিয়েই তা কোষমুক্ত করে ফেলল। পরমুহুর্তেই তা দিয়ে সজোরে একজনের গর্দান লক্ষ্য করে আঘাত করল। এতে ঐ ব্যক্তির মস্তক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছিঁটকে পড়ল। ঐসময় নিহতের সঙ্গী তীব্র অবিশ্বাস নিয়ে কর্তিত মস্তকের দিকে ক্ষণকাল তাকিয়ে রইল। অতঃপর সম্বিত ফিরে পেয়ে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করল। আমর পিছু ধাওয়া করে তাকেও হত্যা করল। তারপর সে তাদের উট দু‘টি ও অন্যান্য জিনিষপত্র নিয়ে দ্রুত মদিনার পথে যাত্রা করল।

আমর একসময় মদিনাতে এসে পৌঁছিল। অতঃপর সকল ঘটনা মুহম্মদকে অবহিত করল। যখন মুহম্মদ প্রচারকদের হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারলেন তখন তিনি দুঃখিত হলেন এবং যখন আমের গোত্রের লোক দু‘জনের হত্যাকান্ডের কথা জানতে পারলেন তখন তিনি আরও দুঃখিত হলেন। 

যাহোক নিরাপত্তা প্রদত্ত নিহত ব্যক্তিদ্বয়ের আত্মীয়-স্বজনেরা প্রতিকারের দাবীদার। কিন্তু দু‘জনের রক্তঋণ দু‘শ উট প্রদানের ক্ষমতা মুসলমানদের নেই। কাজেই মুসলমান এবং সনদ গ্রহণকারী অন্যান্য লোকদের কাছ থেকে রক্তপণ সংগ্রহ করার আদেশ দেয়া হল। বনি নাজির, বনি কুরাইজা ও অন্যান্য গোত্রের লোকেরাও মুসলমানদের সঙ্গে সমভাবে এই পণ প্রদানের ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ ছিল। সুতরাং মুহম্মদ কতিপয় শিষ্য সঙ্গে নিয়ে বনি নাজির গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন এবং তাদের কাছে তাদের দেয় পণের ভাগ দাবী করলেন। নাজির গোত্র দেখল যে, মুহম্মদকে হত্যা করার এই একটা উপযুক্ত ক্ষণ। তাই তারা তাকে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার জন্যে অনুরোধ করল। এতে মুহম্মদ একটি বাড়ীর দেয়ালের সঙ্গে পিঠ রেখে অপেক্ষা করতে লাগলেন।

এদিকে নাজির গোত্রের কতিপয় লোক গোপনে পরামর্শ করে স্থির করল, একজন লোক (ওমর ইবনে জাহস) প্রাচীরের উপরে উঠে একটা বড় পাথরখন্ড উপর থেকে গড়িয়ে মুহম্মদের উপর ফেলবে, যাতে তিনি নিহত হন। এসময় স্থানীয় বাসিন্দাদের কানাকানি লক্ষ্য করে মুহম্মদ তাদের কু-মতলব আঁচ করলেন। অতঃপর জিব্রাইলের মাধ্যমে তিনি তাদের হত্যার অভিসন্ধি সম্পর্কে অবগত হলেন। তিনি তৎক্ষণাৎ ইহুদিদের সন্দেহের উদ্রেক না করেই তার শিষ্যদের সেখানে রেখে অবিলম্বে সেইস্থান ত্যাগ করলেন। ইহুদিরা ভেবেছিল যে, তিনি বেশী দূরে যাননি এবং তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। এভাবে মুহম্মদ নিজেকে ও তার শিষ্যদেরকে প্রায় নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করলেন। এদিকে শিষ্যেরা তারজন্যে অনেকক্ষণ অপেক্ষা শেষে একসময় ফিরে এল।

পরবর্তীতে মুহম্মদ উদারতাবশতঃ এমন একটা হীন ষড়যন্ত্রের পরও নাজির গোত্রের বিরুদ্ধে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এমনকি তিনি যে তাদের ষড়যন্ত্রের বিষয়টা অবহিত হয়েছেন, তাও কখনও কোন আলোচনায় উল্লেখ করেননি। কিন্তু এতে বনি নাজিরদের স্বভাবের কোন পরিবর্তন হল না। তারা নুতন করে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল।

সমাপ্ত।

1 টি মন্তব্য: