pytheya.blogspot.com Webutation

১৯ মার্চ, ২০১২

Concordat of Worms: ধর্মে রাষ্ট্রের ও রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাবের কূ-ফল।


খ্রীষ্ট ধর্মের উত্থান খুব সহজ ছিল না। ৩য় খ্রীষ্টাব্দের মাঝামাঝি পর্যন্ত মূলত: অশিক্ষিত, গরীব ও সমাজে অবহেলিত নীচু শ্রেণীর মানুষই এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়। অত:পর এ ধারায় পরিবর্তন আসে। শিক্ষিত ও ধনীক শ্রেণীর মধ্যে ক্রমান্বয়ে এই ধর্মের অনুপ্রবেশ ঘটতে থাকে। এর অন্যতম প্রধান কারণ হল তৎকালীন আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট। যুদ্ধ, অত্যাচার-অনাচার ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে আত্মরক্ষায় করতে মানুষ এই ধর্মের মধ্যে আশ্রয় খোঁজে।

ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা তাদের জীবন ধর্মের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেছিলেন। তারা আজীবন কৌমার্যব্রত পালন করতেন। প্রথমদিকে এরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে শিশু-কিশোর ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মাঝে ধর্মোপদেশ দিতেন। আর ধর্মানুসারীদের বিবাহ, আন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, প্রত্যাহিক অনুষ্ঠানসহ যাবতীয় ধর্মীয় ও সামাজিক নানা কাজে অংশগ্রহণ করতেন। অত:পর এই ধর্ম প্রতিষ্ঠানিক রূপ নিল।

পোপ ষোড়শ বেনেডিক্ট।
গ্রামে গঞ্জে ধর্ম প্রচারের কাজে নিয়োজিতদেরকে স্থানীয় গির্জার পুরোহিত তথা 'পাদ্রী'র দায়িত্বে সার্বক্ষণিক নিযুক্ত করা হল। অনেকগুলো গ্রামের গির্জা নিকটস্থ শহরের প্রধান গির্জার অধিনস্ত হল। শহরের এই প্রধান গির্জার প্রধান 'প্রেসবিটর' হিসেবে পরিচিত হলেন। তিনি আবার উর্দ্ধতন জেলা পর্যায়ের ধর্মীয় নেতা অর্থাৎ 'বিশপ' এর অধিনস্ত হলেন। এমনিভাবে জেলা বিশপগণ প্রাদেশিক প্রধান তথা 'আর্চবিশপ' এর অধীন হলেন। প্রাদেশিক আর্চবিশপদের উর্দ্ধে হলেন একজন 'প্যট্রিয়ার্কেট'। রোমান সাম্রাজ্যে এভাবে পাঁচজন প্যাট্রিয়ার্কেট ছিলেন।

যারা বিশপ নির্বাচিত হলেন, খ্রীষ্টান সম্প্রদায়ের নেতা হিসেবে আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক গভর্নরের কাছে তাদের ভূমিকা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই পাঁচজন থেকে একজন সর্বোচ্চ চার্চের প্রধান মনোনীত হলেন। এই প্রধানই 'পোপ'-খ্রীষ্টানদের সর্বোচ্চ ধর্মগুরু। ধর্মের কোন ব্যাখ্যা বা নুতন কোন ধর্মীয় বিধান জারি করার একমাত্র অধিকারী তিনিই। তার কার্য সংস্থা 'প্যাপাসি' (Papacy) বলে অভিহিত।

সামন্তবাদ প্রথা। 
খ্রীষ্টের বাণীতে রোম উজ্জ্বীবিত হল। ৩১৩ খ্রীষ্টাব্দে মিলান ঘোষণায় খ্রীষ্টধর্ম রোমান সাম্রাজ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত পৌত্তলিক ধর্ম তথা প্যাগান কাল্টের সমমর্যাদায় উন্নীত হয়। অত:পর এই ধর্ম সেখানে প্রধান ধর্মে রূপান্তরিত হয় এবং ক্রমে রাজনীতিতে এর অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে।রাষ্ট্র যত বেশী এই ধর্মের সাথে যুক্ত হয় ততই এ ধর্ম তার সরলতা ও অনাড়ম্বরতা হারাতে থাকে। শাসক শ্রেণী তাদের সামন্তবাদ তথা রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষের উপর প্রভাব বিস্তার করতে ধর্মকে ব্যাবহার করতে শুরু করলেন ধর্ম যাজকদের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায়।

পঞ্চম শতাব্দীতে সামন্তবাদের (ফিউডালিজম- লাতিন শব্দ ফিউডাম অর্থ ভূ-সম্পত্তি।) উত্থান ঘটে। এই সামন্তবাদ একটি আর্থ সামাজিক ব্যবস্থা বা প্রথা। এই প্রথার সূচণা ঘটে সর্বপ্রথম ইউরোপে।

সামন্তপ্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্র বা রাজাই সকল সম্পত্তির মালিক। রাজা কতিপয় শর্তের বিনিময়ে তার অধীনস্ত একটি গোষ্ঠির মাধ্যমে জমি চাষাবাদের জন্যে বিতরণ করতেন। রাজার অনুগত ঐ গোষ্ঠিই সামন্ত প্রভূ। সামন্ত ব্যবস্থায় রাজা ছিলেন লর্ড বা প্রভূ। রাজার ভ্যাসাল বা তার অধীনস্ত ছিলেন টেনান্ট ইন চিফ, টেন্যান্ট ইন চিফের অধীনস্ত ভ্যাসাল ছিলেন কাউন্ট, ডিউক, আর্ল বা মারগ্রেভ।

সামন্তবাদ প্রথা। 
আর এইসব ডিউক, কাউন্ট, আর্ল বা মারগ্রেভদের ভ্যাসাল ছিলেন ব্যারণ বা নাইটসগণ। আর নাইটদের অধীনে ছিল জমির মালিকানাবিহীন কৃষক। প্রত্যেক নাইটগণ নির্দিষ্ট পরিমান জমি (৩০০ -৪০০ একর) চাষাবাদের জন্যে পেতেন। অবশ্য এর বাইরে ছিল তাদের দূর্গ, চার্চের জমি, বনভূমি ইত্যাদি। কৃষকরা নাইটদের নিকট থেকে ভূমি অধিগ্রহণ করত। বিনিময়ে নাইটরা ফসলের বড় অংশ অথবা মোটা অঙ্কের অর্থ খাজনা হিসেবে পেতেন।

সামন্ত ব্যবস্থায় বিপুল পরিমান অনাবাদী জমি চাষাবাদের আওতায় আসে। ফলে কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব আনে। অতিরিক্ত করের বোঝার কথা মাথায় রেখে কৃষককূল নিজেদের জীবন ধারণ ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এসব জমিতে নানা ধরণের ফসল উৎপাদন করত। ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন ঘটে যা ক্রমশ: বাজার সৃষ্টি করে।

নাইটদের উপর কৃষকদের নির্ভরশীলতা ক্রমেই তাদেরকে নাইটদের ইচ্ছের পুতুলে পরিণত করে ফেলে। নাইট বা জমিদারদের গৃহস্থলীসহ সকল কাজই কৃষককে বা তাদের পরিবারের সদস্যদের করতে বাধ্য করা হত। জমিদারগণ এদেরকে নিজেদের ইচ্ছেমত ভোগ ও ব্যাবহার করতেন। ফলে ছোটখাট বিদ্রোহ শুরু হল। আর তাই এই পর্বে সামন্ত প্রভুগণ ঐসব বিদ্রোহ দমনে ধর্মীয় অনুভূতি ও মতাদর্শকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যাবহারের পরিকল্পণা করলেন। সুতরাং রাজা তার অনুগত ও বিশ্বাসভাজন যাজকদের মধ্যে থেকে পোপ ও অন্যান্য পদে নিয়োগ দিতে লাগলেন। আর এভাবেই শাসক শ্রেণী ধর্ম যাজকদেরকে সামন্তবাদের স্বার্থে ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরী করলেন।

সিটি স্টেট, ভ্যাটিকান।
যাজকগণ রাজার নিকট থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সুবিধা ভোগ করতে লাগলেন। আর যেহেতু অনুগত পোপের মাধ্যমে সকল যাজক নিয়োগ নিয়োগপ্রাপ্ত হতেন, সেহেতু এভাবে সকল যাজকগোষ্ঠীর উপর রাজার পরোক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। অর্থাৎ এখন এই সুবিধাভোগী যাজকগণ রাজার প্রতি প্রত্যক্ষ অনুগত হলেন। এক কথায় তারা সামন্তবাদ তথা রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সাধারণ মানুষকে প্রভাবান্বিত করতে লাগলেন ধর্মকে ব্যাবহার করে।

এভাবে রাষ্ট্র ও চার্চের মধ্যে মৈত্রী বন্ধন সুদৃঢ় হল। এই ধারাবাহিকতায় ৭৫১ খ্রীষ্টাব্দে পিস্পিন সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে চার্চ এতদিন যে সকল জমি বেনিফিকাম (Benificum) হিসেবে ভোগ করত সেগুলিকে চার্চের সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করলেন। অত:পর রোমকে আলাদা প্রদেশ করার পর ৭৫৬ খ্রীষ্টাব্দে পোপের জন্যে একটি আলাদা রাজ্য তথা প্যাপাল স্টেট (Papal State) ঘোষণা করা হল। সেইসময় থেকে সেইন্ট পিটারের আমলের নেভিকোলা (Navicula) স্বাধীনভাবে বিরাজ করতে থাকে। এখন ভ্যাটিকান (Vatican) একটি সিটি স্টেট (City State) হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে তার অবস্থান করে নিয়েছে।

সম্রাট ৪র্থ হেনরী পোপের সামনে হাঁটু গেঁড়ে
ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
পঞ্চম শতাব্দী থেকেই রাষ্ট্র চার্চের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক গড়ে তোলার নীতি অনুসরণ করতে শুরু করেছিল। ফলে ১০ম শতাব্দীতে এসে চার্চে মর্যাদা প্রাপ্ত অধিকাংশ ব্যক্তিই রাষ্ট্রের প্রশাসনিক, সামরিক ও কূটনৈতিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করছিলেন। অর্থাৎ দশম শতাব্দীতে ধর্মের প্রভাব রাষ্ট্রে নিরঙ্কুশ ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অত:পর পোপ নিজের ক্ষমতা সুসংহত দেখে রাজার ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক উত্থাপন করলেন। এরফলে রাজা ও পোপের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হল।

দশম শতাব্দীতে খ্রীষ্ট ধর্মাবলম্বীরা ফ্রান্সের বুরগুন্ডির ক্লুনি মঠে এক সম্মেলন আহবান করে। এই সম্মেলনে কৌমার্যব্রত, কেরানী কোটা রহিতকরণ এবং রাজার অধীনতা থেকে চার্চের মুক্তি দাবী করে একটি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ঘোষিত এই কর্মসূচিই ‘ক্লুনিয়াক কর্মসূচি’ হিসেবে পরিচিত। অত:পর চার্চগুলোর নৈতিক সম্মান উর্দ্ধে তুলে ধরার উপর গুরুত্ব আরোপ করে একটি আন্দোলনের ডাক দেয়া হয়। যাজকগণ এবং স্বয়ং পোপ এইসব দাবীর সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন দান করেন।

Worms-এর এই চার্চে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
১০৭৩ খ্রীষ্টাব্দে ব্রাদার হিন্ডার ব্রান্ড ৭ম গ্রেগরী উপাধি ধারণ করে পোপ নিযুক্ত হলেন। এই সময় ফ্রান্সের ৪র্থ হেনরীর শাসন চলছিল। পোপ ৭ম গ্রেগরী ক্লুনিয়াক কর্মসূচির বাস্তবায়ন ঘটাতে এক সম্মেলন আহবান করলেন। ল্যাটেরানে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হল। এই সম্মেলনে কোন সম্রাট কিম্বা শাসকের পক্ষে পোপ নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করার সুবিধা রহিতকরণে পোপ নির্বাচনের এবং সকল বিশপ ও মঠের অধ্যক্ষ নিয়োগ দানের এই পদ্ধতি অনুমোদিত হল যে, এখন থেকে চার্চের সর্বোচ্চ মর্যাদাধারী ব্যক্তিগণ তথা কার্ডিনাল থেকেই পোপ নির্বাচিত হবেন এবং পোপ কর্তৃক সকল বিশপ ও মঠের অধ্যক্ষগণ নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন।

Concordat of Worms-
Emperor Henry V with Pope Calistus II
নুতন এই নির্বাচন পদ্ধতির বাস্তবায়ন ঘটতে শুরু করলে পোপ এবং রাজার মধ্যে ক্ষমতা, প্রভাব ও আত্মসম্মান নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকল। এই অবস্থায় নিজের অবস্থান আরও সুসংহত করতে পোপ ধর্মীয় অনুভূতি ব্যাবহারের মাধ্যমে খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদেরকে তার প্রভাব বলয়ে ধরে রাখতে সচেষ্ট হলেন।

Pope Calistus II.
সম্রাট ৪র্থ হেনরী পোপ ৭ম গ্রেগরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিলে পোপ সম্রাটকে ধর্ম সম্প্রদায় থেকে বহি:স্কার এবং তার সম্রাট পদ থেকেও বঞ্চিত করার ঘোষণা প্রদান করলেন। এ সময় সম্রাট উপলব্ধি করলেন যে, রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব নিরঙ্কুশ ভাবে প্রতিষ্ঠিত। সুতরাং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে সম্রাট ৪র্থ হেনরীকে বাধ্য হয়ে ইতালিতে এসে পোপের সামনে হাঁটু গেঁড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হল। পোপ সম্রাটকে ক্ষমা করলেও সম্রাট মন থেকে পোপকে ক্ষমা করতে পারেননি।

অবশেষে সম্রাট ও প্যাপাসির মধ্যেকার এই  দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে ১১২২ খ্রীষ্টাব্দের ২৩ শে সেপ্টেম্বর  Worm's- এ এক চুক্তি (Concordat of Worms) স্বাক্ষরের মাধ্যমে। এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল তৎকালীন রোম সম্রাট হেনরী ৫ম (Henry V) ও পোপ ক্যালিস্টাস ২য় (Calistus II)-এর মধ্যে।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia,to-life.se.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন