pytheya.blogspot.com Webutation

৯ মার্চ, ২০১২

Abraham: ইব্রাহিমের ৪০ দিন অগ্নিকুন্ডে বাস।

কলদীয় দেশের উরে ছিল ইব্রাহিমের বাড়ী। পারস্য উপসাগরের নিকটবর্তীতে, ফোরাত নদীর তীরে ছিল এই শহর। তার পিতার নাম ছিল আজর। তিনি দেবমূর্ত্তি নির্মাণ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ইব্রাহিম (Abraham) ছাড়াও আজর এর আরও দুই পুত্রসন্তান ছিল নাহোর ও হারুণ নামে। হারুণ পুত্র লুতকে রেখে অল্পবয়সে মারা গিয়েছিলেন। 

খৃষ্টপূর্ব ৩য় শতকে মেসোপটেমিয়া।
বাল্যকাল থেকেই ইব্রাহিম আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। মহা বিজ্ঞানী আল্লাহ তাকে দিয়েছিলেন ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান। এ কারণে তিনি তার গোত্রের অন্যান্যদের মত অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না। 

একদিন তিনি দেখতে পেলেন তার পিতা অদ্ভূত এক মূর্ত্তি তৈরী করছেন। তিনি পিতাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমার পিতা, তুমি কি তৈরী করছ?’
পিতা - ‘দেবমূর্ত্তি।’

দেবমূর্ত্তিটার কান ছিল বেশ বড়। ইব্রাহিম বেশ কৌতুহলী হলেন এবং তার ধরে টানাটানি করতে লাগলেন। এ দেখে পিতা বললেন, ‘ওর সঙ্গে এমন কোরও না।’
ইব্রাহিম- ‘এ কার মূর্ত্তি? আর এর কান এত বড় কেন?’
পিতা- ‘ইনি মরদক, দেবতাদের দেবতা। আর এর বড় কান থেকে বোঝা যায় তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী।’
ইব্রাহিম হেসে ফেললেন। বললেন, ‘গাধার কানও তো বড় বাবা।’

ছোটবেলায় পিতার সাথে ইব্রাহিম অনেকবার দেবমন্দিরে গিয়েছেন। মন্দিরে হরেকরকম দেবতা ছিল। আকৃতি এবং প্রকতিতে সেগুলি ছিল বিভিন্ন রকম। লোকেরা মন্দিরে প্রবেশ রে দেবতার সামনে প্রাণিপাত করত। তিনি অবাক হতেন। নিজের হাতে মূর্ত্তি তৈরী করে সেই মূর্ত্তিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করাকে তিনি কখনও মন থেকে মেনে নিতে পারেননি। তিনি গভীরভাবে ভাবতেন প্রকৃতি এবং তার স্রষ্টাকে নিয়ে। যৌবনে পদার্পণ করে তিনি একদিন আকাশ ও পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থা গভীর মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করলেন। আর ভাবলেন এসবের নিশ্চয়ই একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন, যিনি এগুলোকে সুনিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছেন। অথচ তার সম্প্রদায় বৃক্ষ, প্রতিমা-মূর্ত্তি, নক্ষত্র, সূর্য্য ও চন্দ্রের পূজারী। 

উরের ধ্বংসাবশেষ।
একদিন রাতের বেলায় আকাশের নক্ষত্র দেখে তিনি তার সম্প্রদায়কে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন- ‘এই কি আমাদের প্রতিপালক!’ 
তারপর যখন তা অস্তমিত হল তখন তিনি বললেন, ‘যা অস্তমিত হয় এমন কিছু আমার প্রতিপালক হতে পারে না।’

তারপর যখন চাঁদকে উঠতে দেখলেন, তিনি আবার তাদেরকে শুনিয়ে বললেন, ‘এই আমার প্রতিপালক!’ 
যখন তাও অস্তমিত হল, তিনি বললেন, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে সৎপথ দেখাও।’ 
তারপর যখন তিনি সূর্য্যকে উঠতে দেখলেন তখন আবারও তার সম্প্রদায়কে শুনিয়ে বললেন, ‘এ-ই আমার প্রতিপালক! এ সবচেয়ে বড়।’

যখন তাও অস্তমিত হল তখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বললেন, ‘সৃষ্টিকর্তা তিনিই যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন।’
তারপর তিনি বললেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক কর, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই।’
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘নিশ্চয়ই ইব্রাহিম ছিল এক সম্প্রদায়ের প্রতীক। সে ছিল আল্লাহর অনুগত, একনিষ্ঠ আর সে অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল না।’(১৬:-১২৩) আমি তাকে পৃথিবীতে কল্যাণ দিয়েছিলাম ও পরকালেও সে তো সৎকর্মপরায়ণদের অন্যতম হবে।(১৬:-১২২)

আমি তো এরপূর্বে ইব্রাহিমকে ভাল-মন্দ বিচারের জ্ঞান দিয়েছিলাম ও আমি তার সম্বন্ধে ভাল করেই জানতাম।(২১:৫১-৭০) এভাবে ইব্রাহিমকে আকাশ ও পৃথিবীর পরিচালনা ব্যবস্থা দেখাই যেন সে দৃঢ়বিশ্বাসীদের একজন হয়।’ তারপর রাতের অন্ধকার যখন তাকে ছেয়ে ফেলল তখন নক্ষত্র দেখে বলল, ‘ও-ই আমাদের প্রতিপালক!’ 

তারপর যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, ‘যা অস্তমিত হয় তা আমি ভালবাসিনে।’ 
তারপর যখন সে চাঁদকে উঠতে দেখল সে বলল, ‘এ আমার প্রতিপালক!’ 
যখন তা অস্তমিত হল তখন সে বলল, ‘আমাকে আমার প্রতিপালক সৎপথ না দেখালে আমি তো পথভ্রষ্টদের শামিল হব।’ 
তারপর যখন সে সূর্য্যকে উঠতে দেখল তখন বলল, ‘এ-ই আমার প্রতিপালক! এ সবচেয়ে বড়।’ 
যখন তাও অস্তমিত হল তখন সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়, তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক কর, তার সাথে আমার সম্পর্ক নেই। নিশ্চয়ই আমি একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকে মুখ ফেরাচ্ছি যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন, আর আমি অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত নই।’(৬:৭৫-৭৯)

পূজার সময়। ইব্রাহিমের সম্প্রদায়ের এক বৃহৎ দল ঐ আচার অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাবার জন্যে একত্রিত হচ্ছে। ইব্রাহিম ইতিমধ্যে সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করেছেন। এখন তো আর তিনি তার পিতা এবং তার সম্প্রদায়কে বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতার মধ্যে থাকতে দিতে পারেন না। তিনি তাদেরকে একাজ থেকে বিরত থাকার আহবান জানানোর তাগিদ অনুভব করলেন। সুতরাং তিনি ঐ সমাবেশ স্থলে উপস্থিত হলেন। তার সম্প্রদায় তাকে উৎসবে সাদর আমন্ত্রণ জানাল।

ইব্রাহিম পিতা আজরকে ডেকে বললেন, ‘তুমি কি মূর্ত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর? আমি তো তোমাকে ও তোমার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভুল করতে দেখছি।’
তারপর উপস্থিত তার সম্প্রদায়কে বললেন, ‘এই যে মূর্ত্তিগুলো যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ, এগুলো কি? তোমরা কিসের উপাসনা কর?’
ওরা বলল, ‘আমরা প্রতিমার পূজা করি, আমরা নিষ্ঠার সাথে ওদের পূজা করে যাব। আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকেও এদের পূজা করতে দেখেছি।’

ইব্রাহিম বললেন, ‘তোমরা কি যার পূজা করছ তার সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ? তোমরা আর তোমাদের পূর্বের পিতৃপুরুষগণ যার পূজা করত? তোমরা নিজেরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ; আর তোমাদের পিতৃপুরুষগণও ছিল বিভ্রান্তিতে।’
ওরা বলল, ‘তুমি কি আমাদের কাছে সত্য এনেছ, না তুমি ঠাট্টা করছ?’
তিনি বললেন, ‘না, তোমাদের প্রতিপালক আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালক, তিনিই তো তোমাদের ও ওদের সৃষ্টি করেছেন আর এ বিষয়ে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি।’
লোকেরা তার আহবানকে অগ্রাহ্য করল। তখন তিনি তারকাদের দিকে একবার তাকালেন এবং বললেন, ‘আমার অসুখ করেছে মনে হচ্ছে।’ 

লোকেরা তাকে অসুস্থ্য এবং অপারগ মনে করে তাকে ফেলে রেখে চলে গেল। তাদের গমনপথের দিকে তাকিয়ে ইব্রাহিম মনে মনে বললেন, ‘আল্লাহর শপথ! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্ত্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’


এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘ইব্রাহিম তার পিতা আজরকে বলেছিল, ‘তুমি কি মূর্ত্তিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ কর? আমি তো তোমাকে ও তোমার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভুল করতে দেখছি।’(৬:৭৪) 
সে তার পিতা ও তার সম্প্রদায়কে বলল, ‘এ যে মূর্ত্তিগুলো যাদের পূজায় তোমরা রত রয়েছ, এগুলো কি?(২১:৫৩) তোমরা কিসের উপাসনা কর?’(২৬:৭০) 

ওরা বলল, ‘আমরা প্রতিমার পূজা করি, সারাদিন এদেরকেই নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি। (২৬:৭১) 
সে বলল, ‘তোমরা যখন আহবান কর, তখন তারা শোনে কি? অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিম্বা ক্ষতি করতে পারে?’
তারা বলল, ‘না, তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এদের পূজা করতে দেখেছি।’

সে বলল, ‘তোমরা কি যার পূজা করছ তার সম্বন্ধে ভেবে দেখেছ? তোমরা আর তোমাদের পূর্বের পিতৃপুরুষগণ যার পূজা করত?(২৬:৭২-৭৬) তোমরা নিজেরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছ; তোমাদের পিতৃপুরুষগণও ছিল (বিভ্রান্তিতে)।’(২১:৭০) 
ওরা বলল, ‘তুমি কি আমাদের কাছে সত্য এনেছ, না তুমি ঠাট্টা করছ?’

সে বলল, ‘না, তোমাদের প্রতিপালক আকাশ ও পৃথিবীর প্রতিপালক, তিনি তো ওদের সৃষ্টি করেছেন আর এ বিষয়ে আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি। আল্লাহর শপথ! তোমরা চলে গেলে আমি তোমাদের মূর্ত্তিগুলোর ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা নেব।’(২৬:৭৫)

ইব্রাহিম ওদের দেবমন্দিরে গেলেন। তারপর দেবতাদের কাছে গিয়ে তাদের মুখের সামনে খাবার রাখলেন। তারা যখন সেই আহার্য গ্রহণ করল না তখন তিনি তাদেরকে বললেন, ‘তোমরা খাচ্ছ না কেন? তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা কথা বলছ না?’ 

মন্দিরের এক কোনে একটা কুঠার ছিল। ইব্রাহিম হাতে ঐ কুঠার তুলে নিলেন। আর তা দিয়ে ওদের প্রধান দেবতার মূর্ত্তি ছাড়া অন্যান্য সব মূর্ত্তিকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিলেন। তারপর কুঠারটি প্রধান দেবতার গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে এলেন। লোকেরা যখন এই অবস্থা দেখল তখন তারা মর্মাহত হল এবং একে অন্যেকে বলল, ‘আমাদের দেবতাদের সাথে এরূপ ব্যাবহার কে করল? নিশ্চয়ই সে সীমালংঘনকারী।’
কেউ কেউ বলল, ‘এক যুবককে ওদের সমালোচনা করতে শুনেছি; সবাই তাকে ইব্রাহিম বলে ডাকে।’ 
ওরা বলল, ‘তাকে লোকজনের সামনে উপস্থিত কর, যেন ওরা সাক্ষ্য দিতে পারে।’

ইব্রাহিমকে ডেকে আনা হল। ওরা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘হে ইব্রাহিম! তুমিই কি আমাদের দেবতাদের এমন অবস্থা করেছ?’ 
ইব্রাহিমের দৃষ্টি নিবদ্ধ হল প্রধান দেবতার গলায় ঝুলান কুঠারের প্রতি। তারপর উপস্থিত লোকদেরকে বললেন, ‘আমার তো মনে হয় এদের এই প্রধানই একাজ করেছে। দেখছ না তার কাছেই রয়েছে কুঠার। আর সম্ভবত: তার এবাদতে এতগুলো অংশীদার দেখে রাগান্বিত হয়েই তা করেছে। এখন ওকেই জিজ্ঞেস করে দেখ না প্রকৃত ঘটনা কি!’ 
ওরা মনে মনে চিন্তা করে দেখল তারপর বলল, ‘তুমি তো ভাল করেই জান যে এরা কথা বলে না।’ 

ইব্রাহিম বললেন, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর যা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না; ক্ষতিও করতে পারে না? ধিক, তোমাদেরকে আর আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর তাদেরকে! এরপরও কি তোমাদের জ্ঞান হবে না?’

আর এ সম্পর্কে ইহুদি রাব্বানিক সাহিত্যে আছে এমন- "One day a woman came with a bowl of fine flour, and said, 'Set it before them;' but he took a staff and broke all the idols in pieces, and placed the staff in the hands of the largest of them. When his father returned, he inquired, 'Who has done this?' Abraham said, 'Why should I deny it? there was a woman here with a bowl of fine flour, and she directed me to set it before them. When I did so, every one of them would have eaten first; then arose the tallest, and demolished them with the staff.' Terah said, 'What fable art thou telling me! Have they any understanding!'
"Abraham replied, 'Do not thy ears hear what thy lips utter!' -Vide Geiger, i., p. 124.

আর এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- তারপর ইব্রাহিম তারকাদের দিকে একবার তাকাল এবং বলল, ‘আমার অসুখ করেছে মনে হচ্ছে।’ 

ওরা তখন তাকে পিছনে ফেলে রেখে চলে গেল। পরে সে ওদের দেবতাদের কাছে গিয়ে বলল, ‘তোমরা খাচ্ছ না কেন? তোমাদের কি হয়েছে যে তোমরা কথা বলছ না?’ 
তারপর সে ওদের প্রধান মূর্ত্তি ছাড়া অন্যান্য মূর্ত্তিকে ভেঙ্গেচুরে দিল, যেন ওরা তার স্মরাণাপন্ন হয়। 
ওরা বলল, ‘আমাদের দেবতাদের কে এমন করল? নিশ্চয়ই সে সীমালংঘনকারী।’

কেউ কেউ বলল, ‘এক যুবককে ওদের  সমালোচনা করতে শুনেছি; (সবাই) তাকে ইব্রাহিম বলে ডাকে।’ 
ওরা বলল, ‘তাকে লোকজনের সামনে উপস্থিত কর, যেন ওরা সাক্ষ্য দিতে পারে।’
ওরা বলল, ‘হে ইব্রাহিম! তুমিই কি আমাদের দেবতাদের এমন অবস্থা করেছ?’ 
সে বলল, ‘এদের এ প্রধানই তো এ কাজ করেছে। এদের জিজ্ঞেস করে দেখ না, যদি এরা কথা বলতে পারে।’ 

ওরা মনেমনে চিন্তা করে দেখল ও একে অপরকে বলতে লাগল, ‘(আমরাই তো সীমালংঘনকারী)!’ তারপর ওদের মাথা হেঁট হয়ে গেল ও ওরা বলল, ‘তুমি তো ভাল করেই জান যে এরা কথা বলে না।’ 
ইব্রাহিম বলল, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর উপাসনা কর যা তোমাদের কোন উপকার করতে পারে না; ক্ষতিও করতে পারে না? ধিক, তোমাদেরকে আর আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের উপাসনা কর তাদেরকে! তবুও কি তোমরা বুঝবে না?’(৩৭:৮৮-৯২)


তার সম্প্রদায় তার সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করল। তখন তিনি বললেন, ‘তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে তর্কে নামবে? তোমরা যাকে তাঁর শরিক কর তাকে আমি ভয় করিনে।’

লোকেরা ইব্রাহিমের সঙ্গে যুক্তিতে টিকতে পারছিল না। সুতরাং তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল না তার বিরুদ্ধে কি পদক্ষেপ তারা নেবে। এসময় ওদের কেউ কেউ বলল, ‘ওকে পুড়িয়ে ফেল; সাহায্য কর তোমাদের দেবতাদেরকে, যদি একান্তই কিছু করতে চাও।’

উপস্থিত সকলে ইব্রাহিমকে আগুনে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাবে একমত হল। তারা বলল, ‘এরজন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর; আর একে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দাও।’ 
ইব্রাহিম বললেন, ‘পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্যে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমাগুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ, কিন্তু শেষবিচারের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে ও অভিশাপ দেবে। তোমরা বাস করবে জাহান্নামে আর তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’

ইব্রাহিমকে যেখানে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয়।
এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ- তার সম্প্রদায় তার সঙ্গে তর্ক করতে শুরু করল। সে বলল, ‘তোমরা কি আল্লাহ সম্বন্ধে আমার সঙ্গে তর্কে নামবে? তিনি তো আমাকে সৎপথে পরিচালিত করেছেন। আমার প্রতিপালক অন্য ইচ্ছে না করলে তোমরা যাকে তাঁর শরিক কর তাকে আমি ভয় করিনে। সবকিছুই আমার প্রতিপালকের জানা, তবুও কি তোমরা বুঝবে না? 

তোমরা যাকে আল্লাহর শরিক কর আমি তাকে কেমন করে ভয় করব? যার বিষয়ে তিনি কোন সনদ দেননি তাকে তোমরা আল্লাহর শরিক করতে ভয় কর না? সুতরাং যদি তোমরা জান তবে বল দু’দলের মধ্যে নিরাপত্তা কোন দলের প্রাপ্য-যারা বিশ্বাস করেছে ও তাদের বিশ্বাসকে সীমালংঘন করে কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্যে এবং তারাই সৎপথ প্রাপ্ত।’(৬:৮০-৮২)

ওরা বলল, ‘তবে ওকে (ইব্রাহিম) পুড়িয়ে ফেল; সাহায্য কর তোমাদের দেবতাদেরকে, যদি (একান্তই) কিছু করতে চাও।’(১৯:৪২-৪৮)
ওরা বলল, ‘এরজন্যে এক অগ্নিকুন্ড তৈরী কর; আর একে জ্বলন্ত আগুনে ফেলে দাও।’(৩৭:৯৬) 

ইব্রাহিম বলল, ‘পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের জন্যে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে প্রতিমাগুলোকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছ, কিন্তু কেয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে ও অভিশাপ দেবে। তোমরা বাস করবে জাহান্নামে আর তোমাদের কোন সাহায্যকারী থাকবে না।’(২৯:২৫) 

 যে স্থান থেকে ইব্রাহিমকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হয় (পতাকা)।
লোকেরা স্বেচ্ছাশ্রমে লাকড়ি যোগাড় করল এবং সেগুলি এক জায়গায় স্তুপীকৃত করে তৈল ও ঘি ঢেলে তাতে অগ্নিসংযোগ করা হল। সাত দিন আগুনে তা দিয়ে পূর্ণ অগ্নিকুন্ড তৈরী করার পর তারা সমস্যায় পড়ল ঐ অগ্নিকুন্ডে ইব্রাহিমকে নিক্ষেপ করা নিয়ে। কেননা তীব্র উত্তাপের জন্যে আগুনের ধারে কাছে পৌঁছান কারও পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। 

এসময় সেখানে এক বৃদ্ধের বেশে ইবলিস হাযির হল। সে বলল, ‘আমি নজদ দেশের একজন পর্যটক। কারও বিপদের কথা শুনলে আমি আর স্থির থাকতে পারিনে। এখানে এসে তোমাদের বিপদের কথা শুনে তোমাদেরকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছি। এখন তোমাদের সমস্যাটা আমাকে বল।’
 
সব শুনে বৃদ্ধ বলল, ‘তোমরা তোমাদের দেবতাদের সাহায্যার্থে, ধর্ম রক্ষায় এক মহৎ উদ্যোগ নিয়েছ। সুতরাং কেনভাবেই এই সমবেত উদ্যোগকে বিফল হতে দেয়া যায় না। চড়ক গাছ! হ্যাঁ, একটা চড়ক গাছ তৈরী কর। তারপর তাতে ঝুলিয়ে তাকে নিক্ষেপ কর আগুনে।’

তখন তার তত্ত্বাবধানে ও পরামর্শমত একটি চড়কগাছ নির্মাণ করে তার সাহায্যে ইব্রাহিমকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হল। এসময় ঐ বৃদ্ধ সমবেত জনতাকে বলল, ‘তোমাদের এই মহতী উদ্যোগে অংশগ্রহণ করতে পেরে এবং তা সফল হতে দেখে আমি বড়ই আনন্দিত।’

ফেরেস্তাগণ আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করল, ‘হে মাবুদ, এই বিপদে ইব্রাহিমকে সাহায্য করতে আমরা তোমার অনুমতি প্রার্থী।’
আল্লাহ বললেন, ‘অনুমতি দেয়া হল সাহায্য করার যদি সে তোমাদের কাছে সাহায্য প্রার্থী হয়।’

ফেরেস্তাগণ ইব্রাহিমকে বলল, ‘হে ইব্রাহিম, তুমি বললে মূহুর্তেই আমরা এই আগুন নিভিয়ে ফেলব।’ 
তিনি বললেন, ‘তোমাদের কোন সাহায্যের আমার দরকার নেই, সাহায্য করার মালিক একমাত্র আল্লাহ।’
এসময় আল্লাহ বললেন, ‘হে অগ্নি, তুমি ইব্রাহিমের জন্যে শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’(৩৭:৯৭) 
অগ্নি তার জন্যে শীতল হয়ে গেল। 

ইব্রাহিম চল্লিশ দিন ঐ অগ্নিকুন্ডে ছিলেন। এই দীর্ঘসময় ধরে লোকেরা পালাক্রমে ঐ অগ্নিকুন্ড পাহারা দিয়েছিল। অবশ্য ইতিমধ্যে লোকেদের পাহারা যথেষ্ট শিথিল হয়েছিল। কেননা তারা ভেবেছিল সে আর বেঁচে নেই। অতঃপর লোকেরা যখন তাকে পুনরায় সুস্থ্য অবস্থায় চলতে ফিরতে দেখতে পেল তখন তারা ভীত হল বটে, কিন্তু তারা তাকে বিশ্বাস করল না, লুত ব্যাতিত। ইব্রাহিমের ভ্রাতৃষ্পুত্র লুত খোদায়ী এই কুদরত দেখামাত্র তার উপর ঈমান এনেছিলেন। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, travel-images, mesacc.edu.

1 টি মন্তব্য: