pytheya.blogspot.com Webutation

৬ মার্চ, ২০১২

Muhammad: ইসলামের বাণী নিয়ে তায়েফবাসীর মাঝে মুহম্মদ।


কুরাইশদের পৌত্তলিকতা থেকে ফেরানোর কাজে হতাশ হলেও দুঃখপূর্ণ ও বিশ্বাস উদ্দীপ্ত হৃদয়ে মুহম্মদ (Muhammad) অন্যত্র তার প্রচার কাজ চালানোর সংকল্প গ্রহণ করলেন। মক্কা তার বাণীকে প্রত্যাখান করেছে, তায়েফ হয়তঃ তার বাণী শুনতে পারে এই আশা নিয়ে তিনি জায়েদকে সঙ্গে নিয়ে তায়েফবাসীদের মধ্যে উপস্থিত হলেন। 

উইলিয়াম মূয়ির মুহম্মদের এই কঠিন আত্মপ্রত্যয় নিয়ে তায়েফ গমন প্রসঙ্গে লিখেছেন- There is something lofty and heroic in this journey of Muhammad to At-Ta’if; a solitary man, despised and rejected by his own people, going boldly forth in the name of God, like Jonah to Nineveh, and summoning an idolatrous city to repent and support his mission. It sheds a strong light on the intensity of his belief in the divine origin of his calling. (Life of Muhammadsa by Sir W. Muir, pp. 112-113).

ম্যাপে তায়েফ এর অবস্থান।
আবদে ইলিল, মাসউদ ও হাবিব এ ভ্রাতৃত্রয় সকিফ বংশের প্রধান ও সমাজপতি। মুহম্মদ সর্বপ্রথমে তাদের কাছে গেলেন। কুরাইশদের একটি কন্যার এই বাড়ীতে বিবাহ হয়েছিল। যাইহোক, মুহম্মদ তাদেরকে তার নব্যুয়তের কথা বললেন; তাদের পাপাচারের বিষয় শোনালেন এবং এক আল্লাহর উপাসনা করার জন্যে আহবান জানালেন। 
মক্কা ও তায়েফবাসীর ধর্ম বিশ্বাসে মূলতঃ কোন পার্থক্য ছিল না। মক্কায় দেবী উজ্জার মত তায়েফ নগরেও দেবী লাতের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠিত ছিল। কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের দিক দিয়েও তারা মক্কাবাসীর ন্যায় ছিল। মুহম্মদের বক্তব্য শ্রবণ করে সকিফ প্রধানদের একজন বললেন, ‘তুমি বেশ রসূল বটে! তুমি তো কা’বার গিলাফ ছিন্ন করতে বসেছ।’

অন্যজন বললেন, ‘আল্লাহ তো আর মানুষ খুঁজে পেল না, তাই তোমার মত একজনকে নিজের রসূল করে পাঠিয়েছে!’
তৃতীয়জন ব্যঙ্গ করে বললেন, ‘আমি তোমার সাথে বাক্যালাপ করতে প্রস্তুত নই। কারণ তুমি যদি সত্যিই আল্লাহর রসূল হও, তাহলে তোমার সাথে কথা বলা বেয়াদবী হবে। পক্ষান্তরে তুমি যদি ভন্ড ও মিথ্যেবাদী হও, তাহলেও ভন্ডলোকের সাথে কথা বলা অসঙ্গত।’ 

সারায়ত পর্বত, তায়েফ।
সকিফ প্রধানরা আল্লাহর বাণীকে প্রত্যাখ্যান করছেন, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ দ্বারা সত্যের অমর্যাদা করছেন দেখে মুহম্মদ তাদের আশা ত্যাগ করলেন। তিনি মনে করলেন-এরাই বংশের প্রধান, এরা যদি নিজেদের এসকল অভিমত অন্যের কাছে ব্যক্ত করেন, অথবা তাদেরকে তার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলেন, তাহলে জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করা দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। তাই তিনি তাদেরকে নিরপেক্ষ থাকতে অনুরোধ করলেন। 

কিন্তু তারা তার এই অনুরোধটিও রক্ষা করলেন না। তাদের উস্কানিতে তায়েফবাসীরাও তার আহবানে ভীষণ ক্ষিপ্ত হল। তারা বলল, ‘কে এই উম্মাদ যে আমাদের সুন্দর উপাস্য দেবতাদের প্রত্যাখ্যান করার জন্যে আমাদেরকে আহবান জানাচ্ছে, ভারমুক্ত হৃদয় ও নৈতিক স্বাধীনতার মধ্যে দিয়ে আমরা যাদের উপাসনা করে আসছি?’ 
প্রাচীন তায়েফ নগরী।
তারা শহর থেকে মুহম্মদকে বের করে দিল-তারা তাকে গালিগালাজ ও প্রস্তর নিক্ষেপ করতে করতে সারা শহর তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতে লাগল। প্রস্তরাঘাতে মুহম্মদের চরণ যুগল ক্ষত-বিক্ষত হল। আঘাতের যন্ত্রণায় তিনি যখন অবসন্ন হয়ে কোথাও বসে পড়তেন দুর্বৃত্তরা তখন দুই হাত ধরে তাকে তুলে দিত এবং ত্যক্ত-বিরক্ত লোকদের অনেকে বলত, ‘এ কি সে, যাকে আল্লাহ রসূল করে প্রেরণ করেছেন? সে তো আমাদেরকে আমাদের উপাস্যগণের সান্নিধ্য থেকে সরিয়েই দিত, যদি না আমরা তাদেরকে আঁকড়ে ধরে থাকতাম।’

মুহম্মদ চলতে আরম্ভ করলে তারা পুনঃরায় প্রস্তর নিক্ষেপ শুরু করত যতক্ষণ না তিনি শহর থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় নিজ পথে চলা শুরু করতেন। 
এরূপ নির্মম অত্যাচারেও মুহম্মদ একটুও দমলেন না। তিনি পূর্ণ উৎসাহে পরের দিন বেরিয়ে পড়তেন এবং দিন শেষে আহত ও রক্তাপ্লুত অবস্থায় শহরের বাইরে অবস্থান করতেন। প্রচারের সময় কোন একটা খেজুরের বাগানে নামাজের জন্যে প্রবেশ করতেন।

তায়েফের ধ্বংসাবশেষ।
দীর্ঘ দশ দিনের অত্যাচারের পর মুহম্মদের অচেতন অবস্থা দেখে জায়েদ ভীত ও ত্রস্ত হলেন। তিনি তাকে রক্ষা করার সর্বত চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু এত লোকের আক্রমণ থেকে একজনের পক্ষে তাকে রক্ষা করা অসম্ভব ছিল। উপরন্তু তিনি নিজেও আহত হয়েছিলেন। তার এই অবস্থা দেখে জায়েদ তাকে কাঁধে তুলে দ্রুত পায়ে নগরের বাইরে চলে এলেন। এরপর পথিপার্শ্বের এক খেজুর বাগানে আশ্রয় নিয়ে পরম যত্নে তার সেবায় লিপ্ত হলেন। সেবার পর কিছুটা সুস্থ্য হলে মুহম্মদ নামাজ আদায় করলেন।

নামাজ শেষে তিনি হাত তুলে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করলেন, ‘হে প্রভু! আমার দীনতা ও বঞ্চনার ঔদ্ধত্যের জন্যে আমি তোমার কাছে নালিশ জানাচ্ছি যে, আমি মানুষের দৃষ্টিতে তুচ্ছ। হে পরম করুণাময়, হে দীনজনের প্রভূ, তুমি আমার প্রতিপালক, তুমি আমাকে পরিত্যাগ কোরও না। তুমি আমাকে পরিচিত লোক ও আমার দুশমনদের শিকারে পরিণত কোরও না। যদি তুমি আমার প্রতি অখুশী না হও তবে আমি নিরাপদ। তুমি আমার প্রতি প্রসন্ন হও যেন সব অন্ধকার দূরীভূত হয়ে ইহজগতে ও পরজগতে শান্তি নেমে আসে। তুমি আমার উপর রুষ্ট হইও না। যেভাবে তুমি সন্তুষ্ট হও, সেভাবেই আমার সমস্যাগুলি সমাধান কর। তুমি ছাড়া আমার কোন শক্তিবল, কোন সাহায্য, আশ্রয় নেই।’

অত্যন্ত ব্যাথাহত হৃদয়ে মুহম্মদ মক্কায় প্রত্যাবর্তনের সিদ্ধান্ত নিলেন। তার এই বিহ্বলতার মূহুর্তে এই আয়াতদ্বয় নাযিল হলঃ ‘ধৈর্য্য ধর-চরম ধৈর্য্য। নিশ্চয়ই তারা (অবিশ্বাসীরা) দেখছে-এ (বিজয়) সুদূর পরাহত, কিন্তু আমি দেখছি-এ নিকটবর্তী।’(৭০:৫-৭) 

গভীর আশ্বাসে মুহম্মদের হৃদয় ভরে গেল। তিনি খুশী মনে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং মক্কার নিকটবর্তী নাখালা নামক স্থানে বিশ্রামের জন্যে থামলেন। 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia,saudiembassy, flickr

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন