pytheya.blogspot.com Webutation

১১ মার্চ, ২০১২

Hammurabi: হাম্বুরাবি ও তার অনুশাসন।


ইউফ্রেটিস নদীর তীরে, যেখানে নদীটি টাইগ্রিসের খুব কাছাকাছি এসে গেছে, সেখানে ব্যাবিলন নগর গড়ে ওঠে। যে জায়গায় নগরটি অবস্থিত, স্থান হিসেবে তার অনেক সুযোগ সুবিধা ছিল। নদীপথে বণিকেরা নৌকায় এবং ভেলায় করে নগরবাসীদের প্রয়োজনীয় মালপত্র নিয়ে শহরে আসত। নগরের উপর দিয়েই চলে গিয়েছিল মেসোপটেমিয়ার সর্বপ্রধান স্থলপথ, তার উপর দিয়ে দলে দলে কাফেলা চলে যেত গাধার উপরে ভারে ভারে পণ্যদ্রব্য চাপিয়ে।

ব্যাবিলন হাম্বুরাবির সময়ে।
খ্রী:পূ: ১৭৯২ অব্দে ব্যাবিলন সাম্রাজ্যের সম্রাট হলেন হাম্বুরাবি (Hammurabi)। ব্যাবিলনে প্রচুর ধনসম্পদ থাকায় এই সম্রাটের পক্ষে বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করা সম্ভব হয়েছিল। মেসোপটেমিয়ার বিভিন্ন রাজাদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদকে সুকৌশলে তিনি নিজের স্বার্থে ব্যাবহার করেছিলেন। তিনি তাদের মধ্যে একটির সাথে প্রথমে বন্ধুত্ব পাতিয়ে তার সাথে জোট বেঁধে অন্যান্য শত্রু নগর বা রাষ্ট্র দখল করেন। তারপর তিনি আকস্মিকভাবে নিজের সাম্প্রতিক মিত্র নগর রাষ্ট্রের উপর ঝাপিয়ে পড়ে তা অধিকার করে নেন।

এইভাবে ক্ষমতা ও কূট-বুদ্ধির প্রয়োগের ফলে সমগ্র মেসোপটেমিয়া তার পদানত হয় এবং তাতে তার শাসনাধীনে এক শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে।

ব্যবিলনের শূণ্য উদ্যান।
হাম্বুরাবি ব্যাবিলনের ষষ্ঠ অম্রাইত সম্রাট। Hammurabi এ্ই নামটি আক্কাডিয়ান। এটি এসেছে মূলত: অম্রাইত (Amorite) 'Ammurapi থেকে যার অর্থ "the kinsman is a Healer"। ১৭৯২ বিসিতে তার পিতা Sin Muballit রোগ শয্যায় মৃত্যুবরণ করলে তিনি পিতার স্থলাভিষিক্ত হন এবং প্রথম কয়েক দশক শান্তিপূর্ণভাবে রাজত্ব করেন। তারপর তিনি মনোনিবেশ করেন সাম্রাজ্য বিস্তারে। ১৭৫৯ বিসিতে তার মৃত্যুর পর তার পুত্র Samsu Iluna তার স্থলাভিষিক্ত হন। 

হাম্বুরাবির শাসনামলে ব্যাবিলনীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা মিসরের মতই দাস মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণে গড়ে উঠেছিল। আর তার সময়ই মানব ইতিহাসের সর্বপ্রথম কোন আইন লিখিত আকারে প্রণীত হল। মানুষের দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশী দৈর্ঘ্যের একটি কাল পাথরের স্তম্ভে হাম্বুরাবির এই অনুশাসন খোঁদিত হয়েছিল এবং অনুশাসনের উপরিভাগে অঙ্কিত ছিল সম্রাটের মূর্ত্তি। সম্রাট হাম্বুরাবির ঐ লিখিত অনুশাসন (Code of Hummurabi) ছিল-

স্তম্ভে হাম্বুরাবির অনুশাসন।
"আমি, হাম্বুরাবি, দেবগণ কর্তৃক নির্ধারিত নেতা, সম্রাটদের মধ্যে সর্বপ্রথম সমগ্র ইউফ্রেটিস অঞ্চলের বিজয়ী, আমি আমার দেশের কানে সত্য ও ন্যায়নীতির মন্ত্র দান করলাম এবং জনগণকে দান করলাম সমৃদ্ধি। এখন হতে-

  • যদি কোন ব্যক্তি মন্দির বা সম্রাটের সম্পত্তি চুরি করে, তবে তার প্রাণদন্ড হবে; চুরির মাল যার নিকট পাওয়া যাবে, তারও শাস্তি প্রাণদন্ড। 
  • যদি কোন ব্যক্তি কারও দাস বা দাসী হরণ করে, তবে তার প্রাণদন্ড হবে।
  • যদি পলাতক দাসকে কেহ আশ্রয় দেয়, তবে তার প্রাণদন্ড হবে।
  • যদি কেহ কোন দাসের দেহ হতে উল্কি মুছে ফেলে, তবে তার অঙ্গুলি কর্তন করা হবে।

  • যদি কেহ অন্য কোন ব্যক্তির দাসের মৃত্যুর কারণ হয়, তবে সে ঐ মৃত দাসের বিনিময়ে নিজের একজন দাস দিতে বাধ্য থাকবে।
  • যদি কেহ অন্য কোন ব্যক্তির ষাঁড়ের মৃত্যুর কারণ হয়, তবে সে ষাঁড়ের বদলে ষাঁড় দিতে বাধ্য থাকবে।
  • যদি কেহ ঋণজালে আবদ্ধ থাকে, তবে তার স্ত্রী, পুত্র বা কন্যা ৩ বৎসর দাস জীবন-যাপন করতে বাধ্য থাকবে।
  • যদি কেহ নিজের সমতুল্য কোন ব্যক্তির গন্ডদেশে আঘাত করে, তবে তার জন্যে তাকে জরিমানা দিতে হবে। 
  • যদি কেহ নিজ অপেক্ষা উচ্চ শ্রেণীর ব্যক্তির গন্ডদেশে আঘাত করে, তবে তাকে গোচর্ম নির্মিত চাবুক দ্বারা ৬০টি বেত্রাঘাত করা হবে।

ব্যবিলনের শূণ্য উদ্যান।
-আমি, হাম্বুরাবি, ন্যায়নিষ্ঠ সম্রাট, সূর্যদেবের নিকট হতে এই আইনাবলী পেয়েছি। আমার বচন অপূর্ব সুন্দর, আমার কর্ম তুলনারহিত..."

যাইহোক, হাম্বুরাবির পরবর্তীতে পারস্য সম্রাট নেবু চাঁদ নেজ্জার ব্যাবিলন নগরীকে তার রাজ্যের রাজধানী করেন এবং অপূর্ব শোভামন্ডিত করে গড়ে তোলেন। তার সময়ে এই নগরের চারিদিকে প্রাচীর বেষ্টিত করা হয়েছিল, যার প্রত্যেকটির দৈর্ঘ্য ছিল পনের মাইল। উত্তর ও দক্ষিণ অভিমুখী ছিল চব্বিশটি রাস্তা এবং একই সংখ্যক ছিল পূর্ব এবং পশ্চিম অভিমুখী।

এভাবে প্রতিটি রাস্তা, এক একটি ফটকে গিয়ে মিশেছিল এবং এভাবে নগরটি ছয়টিরও বেশী স্কোয়ার ব্লকসমূহ দ্বারা নির্মিত হয়েছিল। প্রতিটি স্কোয়ারের কেন্দ্রস্থলে একটি করে বাগান ছিল। নগরীতে রাজপ্রাসাদ এবং মন্দির সমূহের মত অনেক বিশাল জাঁকজমকপূর্ণ দালান কোঠা ছিল।

ব্যবিলনের শূণ্য উদ্যান।
ব্যাবিলন অতি উন্নত কৃষ্টি এবং শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যেও বিখ্যাত, যেখানে এর লোকেরা সফলতা অর্জন করেছিল। এখানে পন্ডিতবর্গ ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। জ্ঞানের বহু গ্রন্থাগার এবং উন্নত সাহিত্য ছিল। তারা মৃৎ-শিল্পে এবং বস্ত্রনির্মাণ শিল্পে ছিল অত্যন্ত পারদর্শী।

সম্রাট নেবু চাঁদ নেজ্জার তার স্ত্রীর পাবর্ত্যময় মাতৃভূমির জন্যে, তার গৃহকাতরতা দূর করার উদ্দেশ্যে বিশাল অংকের অর্থব্যয়ে, সুবিখ্যাত ঝুলন্ত উদ্যান নির্মাণ করেন। বাস্তবে এগুলি ছিল নগর দেয়াল সমান উচ্চতা বিশিষ্ট একটির উপর একটি স্থাপিত বিশাল বিশাল চত্বরের সমষ্টি। এগুলিতে সুন্দর সুন্দর ঝোপ এবং ফুলের গাছ লাগান হয়েছিল। মোটকথা এই মহানগরীটি ছিল প্রাচীন কালের অন্যতম সবচেয়ে সুন্দর এবং বিখ্যাত নগরী।

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia, Internet.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন