pytheya.blogspot.com Webutation

৮ মার্চ, ২০১২

Conquest of Mecca: পটভূমি, ঘটনাসমূহ ও পরিণতি।


নবী মুহম্মদ, তার প্রচারিত ধর্ম সর্বমানবের কাছে পৌঁছিবে-যে উদার বাসনা দ্বারা তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন তার অনুসরণে তিনি প্রতিবেশী রাজন্যবর্গ ও তাদের প্রজাকূলকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে কতিপয় দূত প্রেরণ করেছিলেন। এদের মধ্যে গ্রীকসম্রাট হেরাক্লিয়াস ও পারস্য সম্রাট খসরু পারভেজও ছিলেন।

মক্কার একজন দেশত্যাগী সমতার ভিত্তিতে তাকে মহান খসরু বলে অভিহিত না করার স্পর্ধার জন্যে খসরু বিস্ময় প্রকাশ করেন এবং তার পত্রের ঔদ্ধত্যের জন্যে ক্রোধান্বিত হন, পত্র ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলেন এবং ঘৃণার সঙ্গে দূতকে তাড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে, হেরাক্লিয়াস ছিলেন অধিকতর নম্র ও শ্রদ্ধাবনত। তিনি দূতের প্রতি প্রভূত সম্মান দেখান এবং পত্রের একটি সদয় ও সযত্ন উত্তর প্রদান করেন। মুহম্মদ কর্তৃক দূত দেহইয়া ইবনে খলফের মাধ্যমে হেরাক্লিয়াসের কাছে প্রেরিত পত্রটি ছিল এরূপঃ

 
বিসমিল্লাহির রাহমানুর রহিম -
আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহম্মদের পক্ষ হতে রোমের প্রধান পুরুষ হেরাক্লিয়াস সমীপে-

‘সত্যের অনুসরণকারীদের প্রতি সালাম। অতঃপর আমি আপনাকে ইসলামের দিকে আহবান করছি। ইসলাম কবুল করুন, আপনার কল্যাণ হবে। ইসলাম গ্রহণ করলে আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কৃত করবেন। অন্যথায় প্রজা সাধারণের পাপের জন্যে আপনি দায়ী হবেন।’


‘বল, ‘হে গ্রন্থধারীরা! এস, আমরা ও তোমরা এক যোগে সেই সাধারণ সত্যকে অবলম্বন করি; আমরা কেউই আল্লাহ ব্যতিত অন্য কাউকে পূজা করব না এবং আল্লাহর সাথে কাউকে অংশীদার করব না বা নিজেদের মধ্যে হতে কাউকেও আল্লাহর আসনে বসাব না।’ কিন্তু যদি তারা এ কথা না মানে তবে বলে দাও যে, আমরা মুসলমান; তোমরা এ কথার স্বাক্ষী থেক।’ -(৩ঃ৬৩)


(মোহর): মুহম্মদ-রসূল-আল্লাহ


সিরিয়া ত্যাগের পূর্বে হেরাক্লিয়াস পত্র প্রেরক ব্যক্তির সম্পর্কে জানার জন্যে সচেষ্ট হলেন। এই উদ্দেশ্য তিনি আরব থেকে আগত গাজাতে উপস্থিত কাফেলার কয়েকজন ব্যবসায়ীকে ডেকে পাঠান। তাদের মধ্যে ছিলেন আবু সুফিয়ান, যিনি তখন ছিলেন ইসলামের চরমতম দুশমন।


হেরাক্লিয়াস আবু সুফিয়ানকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘কি মতবাদ মুহম্মদ উপস্থাপিত করছে?’

তার উত্তর ছিল, ‘তিনি গবীর-দুঃখীকে সাহায্য করতে, সত্য ও শূচিতার অনুশীলন করতে, ব্যভিচার, পাপ ও মানুষকে ঘৃণা করা থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন।’ 
তার শিষ্য সংখ্যা বাড়ছে কিংবা কমছে জিজ্ঞেস করা হলে উত্তর এল, ‘তার শিষ্য সংখ্যা বিরামহীনভাবে বেড়ে চলেছে এবং তার একজন শিষ্যও তাকে পরিত্যাগ করেনি।’

তৃতীয় পত্র প্রেরিত হয়েছিল, আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর কাছে। এই ন্যায়পরায়ণ হাবসী সম্রাট মুসলমানদের বিপদের সময় তাদেরকে নিজ রাজ্যে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এমনকি পত্র প্রেরণের সময়ও সেখানে একদল মুসলমান অবস্থান করছিল। নাজ্জাসী এই পত্রের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শণ করেন। 

মিসরের রোমান শাসনকর্তা মুকাউকিসের কাছেও মুহম্মদের আহ্বান পৌঁছেছিল। তিনি বিনয় নম্র ভাষায় এর উত্তর দিয়েছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণ ও বশ্যতার নিদর্শণস্বরূপ তার কাছে মেরী ও শিরী নাম্নী-দু‘জন খ্রীষ্টান কন্যা ও একটি দুষ্প্রাপ্য শ্বেতবর্ণের অশ্ব (দুলদুল) উপঢৌকন হিসেবে পাঠিয়েছিলেন।

অতঃপর দামেস্কের নিকটবর্তী বসরায় অবস্থানকারী হেরাক্লিয়াসের জায়গীর ভোগী ঘাসানিয়া যুবরাজের কাছে অপর একজন দূত প্রেরিত হয়। দূতের প্রাপ্ত সম্মান দেবার পরিবর্তে রাজপরিবারেরই একজন তাকে হত্যা করে। এই যথেচ্ছ ও প্রকাশ্য অত্যাচার-অবমাননার ঘটনা ক্রমেই সেই কারণ হয়েছিল, যা ইসলামকে সমগ্র খ্রীষ্টান জগতের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত করেছিল। 

গ্রীক সম্রাটের জায়গীর ভোগী কর্তৃক দূত নিধন এমন একটি প্রকাশ্য অন্যায় এবং প্রচলিত নিয়মের অবমাননা যা কোনভাবে নীরব বা শাস্তিবিহীন অবস্থায় যেতে পারে না। সুতরাং ঘাসানিয়া যুবরাজ আমরের পুত্র সুহাবিলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের লক্ষ্যে, আগস্ট ৬২৯ সনে, তিন সহস্র মুসলিম মুজাহিদের একটি দল প্রেরিত হল। বাইজান্টাইন সম্রাটের সেনাধ্যক্ষগণ অপরাধ স্বীকার করার পরিবর্তে তা গ্রহণ করে নিল এবং গোলমালটিকে রাজকীয় পর্যায়ে উন্নীত করল। অত:পর ঐক্যবদ্ধভাবে তারা কায়সারের নেতৃত্বে লক্ষাধিক সৈন্যসহ সিরিয়ার বলখ থেকে দূরে নয় এমন একটি গ্রাম যেখানে হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছিল, তার নিকটবর্তী স্থানে মুসলমানদের মোকাবেলার জন্যে প্রস্তুত হল।

বিশাল এই সেনাবাহিনী মোকাবেলায় মুসলমানরা ইতিকর্তব্য সম্বন্ধে সিদ্ধান্তে পরামর্শে বসেন। কেননা বিশাল সৈন্য পার্থক্যের কারণে এই যুদ্ধে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় জীবন উৎসর্গ ছাড়া জয়লাভের বিন্দুমাত্র আশা ছিল না। সুতরাং অনেকে মদিনায় সংবাদ পাঠানো অথবা ফিরে যাওয়া সমীচীন মনে করেন। কিন্তু আব্দুল্লাহ-বিন-রওয়াহা দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, ‘আসবার সময় আমরা লাভ লোকসানের খতিয়ান করে আসিনি। আমরা এসেছি অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে। আমাদের কাম্য জয়লাভ করা অথবা শহীদ হওয়া। সুতরাং ফলাফল যাই হোক না কেন তিন সহস্র যোদ্ধা নিয়েই আমরা এক লক্ষের বিরুদ্ধে লড়ব।’

বাইজান্টাইনদের মুসলিম বাহিনীর মনোভাব, সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠায় তাদের মনোবলের শক্তি প্রদর্শণে সর্বসম্মতিক্রমে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হলে উভয়পক্ষ পরস্পরের সম্মুখীন হয়। এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি ছিলেন জায়েদ বিন হারিস, মুহম্মদের (পূর্বের পালিত পুত্র) ধর্মীয় ভ্রাতা। তিনি নিহত হলেন। অতঃপর সেনাপতি মনোনীত হন মুহম্মদের পিতৃব্য পুত্র ও আলীর ভ্রাতা জাফর বিন আবু তালিব। খায়বর বিজয়ের দিনে তিনি আবিসিনিয়া থেকে মদিনায় ফিরেছিলেন এবং অতঃপর এই অভিযানে চলে আসেন। জাফর নিহত হবার পর সকলের মনোনয়নে খালিদ বিন ওয়ালিদ সেনাপতির পদ লাভ করেন।

খালিদের কূশলী নেতৃত্বের কারণে বাইজান্টাইন ও তাদের মিত্রদের প্রতিহত করা গেল। কিন্তু দু‘দলের মধ্যে সৈন্য পার্থক্য ছিল বিশাল। তাই মুসলিম যোদ্ধারা শেষপর্যন্ত মদিনায় ফিরে আসে। 

প্রায় একই সময়ে বনি বকররা বনি খোজাদের আক্রমণ করে বসল। বনি খোজারা মুসলমানদের সঙ্গে তাদের রক্ষণাবেক্ষণে চুক্তিসূত্রে আবদ্ধ ছিল। কুরাইশরা হুদাইবিয়ার সন্ধি ভঙ্গ করে গোপনে বনি বকরদেরকে যোদ্ধা ও অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে। তাদের সহযোগিতায় পুষ্ট হয়ে বনি বকররা বনি খোজাদেরকে আক্রমণ করে রাতের অাঁধারে। এতে অধিকাংশ খোজা নিহত হয় এবং অল্পকিছু পলিয়ে যায়। 

কুরাইশরা ভেবেছিল নৈশ অভিযানে বনি বকরদেরকে গোপনে সাহায্য করার এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ সূদূরে অবস্থানরত নবী মুহম্মদ বা মুসলমানরা কখনও জানতে পারবে না। কিন্তু তাদের ভাবনাকে মিথ্যে প্রমাণিত করে পালিয়ে যাওয়া ঐসব বনি খোজারা পায়ে হেঁটে মরুভূমি পাড়ি দিয়ে অতিকষ্টে মদিনায় এসে পৌঁছে। অতঃপর তারা নবী মুহম্মদের কাছে অভিযোগ করে এবং ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে ন্যায়বিচার প্রার্থনা করে। তারা তাদের অভিযোগে বলেছিল-

‘হে রসূলুল্লাহ! কুরাইশরা আপনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তারা আপনার সেই সূদৃঢ় প্রতিজ্ঞাপত্রখানা বাতিল করে দিয়েছে। রজনীর অন্ধকারে অতর্কিতভাবে তারা বনি বকরদের সাথে আমাদের ‘অরক্ষিত’ আবাসগুলি আক্রমণ করেছে এবং আমাদেরকে শায়িত ও উপবিষ্ট অবস্থায় নির্দয়ভাবে হত্যা করেছে।’

কুরাইশ ও বনি বকরের এই পৈচাশিক অত্যাচারের ও মিত্র খোজা বংশের এই মর্মন্তুদ হত্যাযজ্ঞের কথা শ্রবণে নবীজী যার পর নাই মর্মাহত হন। এ সময় এই আয়াতসমূহ নাযিল হয়- ‘সম্পর্কচ্ছেদ করা হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পক্ষ থেকে সেই মুশরিকদের সাথে, যাদের সাথে তোমরা চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলে।’-(৯ঃ১) সুতরাং নবীজী অন্যায় ও অত্যাচার প্রতিকারের সিদ্ধান্ত নেন এবং গোপনে প্রস্তুতি শুরু করে দেন।

এদিকে বনি খোজাদের কিছু লোকের পালিয়ে মদিনায় গমনের সংবাদ কুরাইশদের কাছে শীঘ্রই পৌঁছে গেল। তারা বদর, ওহোদ ও আহযাব যুদ্ধে মুসলমানদের গায়েবী সাহায্য লাভের বিষয়টি আঁচ করে এমনিতে হীনবল হয়ে পড়েছিল। তার উপরে চুক্তিভঙ্গের বর্তমান ঘটনায় তাদের কাছে মুসলমানদের যুদ্ধ প্রস্তুতির আশঙ্কা বৃদ্ধি পেয়েছিল। অতঃপর নবী মুহম্মদ ও মুসলমানদের পূর্ণ নীরবতা তাদের এই আশঙ্কাকে আরও ঘনীভূত করল। সুতরাং কুরাইশ দলপতি আবু সুফিয়ান মুহম্মদ ও মুসলমানদের মনোভাব জানতে তাড়াতাড়ি মদিনায় হাজির হলেন।

মদিনায় এসে আবু সুফিয়ান স্বীয় কন্যা, নবী পত্নী উম্মে হাবিবার হুজরায় উপনীত হন। পিতাকে দেখে হাবিবা তাড়াতাড়ি হযরত যে বিছানায় উপবেশন করতেন তা গুটিয়ে রাখেন। এ দেখে আবু সুফিয়ান বলেন, ‘এই বিছানার মর্যাদা কি তোমার পিতার চাইতেও বেশী।’
হাবিবা বলেন, ‘এই শয্যায় আল্লাহর রসূল উপবেশন করেন, আর তুমি হলে মুশরিক।’
কন্যার এই উত্তর শুনে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ‘মুহম্মদ আমার এই স্নেহের কন্যাটিকে যাদুর জালে আবদ্ধ করে আমার প্রতি এরূপ বীতশ্রদ্ধ করে রেখেছে!’

কন্যা হাবিবার হুজরা থেকে বেরিয়ে আবু সুফিয়ান মদিনায় ইতস্ততঃ ঘুরে বেড়ান। কিন্তু কোথাও কোন যুদ্ধ প্রস্তুতি নেই- তা নিশ্চিত হয়ে তিনি অতঃপর নবী মুহম্মদের দরবারে হাযির হন। নবীজী তার মদিনায় আগমনের উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, ‘হুদাইবিয়ার সন্ধি আমাদের পক্ষ থেকে ভেঙ্গে গিয়েছে। সুতরাং পুনঃরায় সন্ধি স্থাপনের উদ্দেশ্য নিয়ে আমি আগমন করেছি।’

নবীজী তার কথার কোন উত্তর না দিয়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেন। এতে তার মনোভাব বুঝতে পেরে শঙ্কিত হয়ে আবু সুফিয়ান দরবার থেকে বেরিয়ে গণ্যমান্য কয়েকজন সাহাবীর কাছে আবেদন রাখেন যেন তারা নবী মুহম্মদের নিকট চুক্তি বলবৎ রাখার সুপারিশ করেন। কিন্তু সাহাবীদের সকলেই কুরাইশদের পূর্ববর্তী ও উপস্থিত ঘটনাবলীর তিক্ত অভিজ্ঞতার দরুণ প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন। ফলে ব্যর্থ মনোরথ হয়ে মক্কায় ফিরে আসেন আবু সুফিয়ান।

আবু সুফিয়ানের মক্কায় প্রত্যাবর্তণের পর এই সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে, সন্ধি নবায়িত হয়নি। ফলে মক্কা ও তার আশেপাশের সর্বত্র যুদ্ধভীতি ছড়িয়ে পড়ে। 

এসময়ই সারা নাম্নী এক গায়িকা মক্কা থেকে মদিনায় আগমন করল। সে এসে নবীজীর কাছে হাযির হলে তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি হিযরত করে মদিনায় এসেছ?’

সে বলল, ‘না।’
তখন তিনি বলেন, ‘তবে কি তুমি মুসলমান হয়ে এসেছ?’
সে এবারও বলল, ‘না।’
তখন তিনি বললেন, ‘তাহলে কি উদ্দেশ্য নিয়ে তুমি এসেছো?’
সে বলল, ‘আপনারা মক্কায় সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন। আপনাদের মধ্যে থেকে আমি জীবিকা নির্বাহ করতাম। কিন্তু আপনারা এখানে চলে এলেন, তারপর মক্কার বড় বড় সর্দাররা বদর যুদ্ধে নিহত হল, ফলে আমার জীবিকা নির্বাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। আমি ঘোর বিপদে পড়ে ও অভাবগ্রস্থ হয়ে এখানে আপনাদের কাছে এসেছি।’
নবীজী বললেন, ‘তুমি মক্কার পেশাদার গায়িকা। সেই যুবকেরা কোথায় গেল, যারা তোমার গানে মুগ্ধ হয়ে টাকা-পয়সা বৃষ্টির মত বর্ষণ করত?’
সে বলল, ‘বদর যুদ্ধের পর মক্কার উৎসবপর্ব ও গান-বাজনার জৌলুস খতম হয়ে গেছে। এ পর্যন্ত আমি কোন আমন্ত্রণ পাইনি।’
এসময় নবীজী আব্দুল মুত্তালিব বংশের লোকদেরকে তাকে সাহায্য করার জন্যে অনুরোধ করেন। তখন তারা তাকে নগত অর্থ, কাপড়-চোপড় ইত্যাদি দিয়ে বিদায় দিল।

মদিনাতে সর্বপ্রথম হিজরতকারীদের মধ্যে একজন ছিলেন হাতেব ইবনে আবী বালতায়া। তিনি ছিলেন ইয়েমেনী বংশোদ্ভূত, পরবর্তীতে মক্কায় এসে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু মক্কায় তার স্বগোত্রের কেউ ছিল না। তার পরিবার যখন মুসলমান হয়, তখন পরিবারের মধ্যে কেবল তিনিই মদিনায় হিযরত করেন এবং তার স্ত্রী ও সন্তানেরা মক্কায় রয়ে গিয়েছিল। 

নবীজীর হিযরতের পর পৌত্তলিক কুরাইশরা মক্কায় বসবাসকারী অবশিষ্ট মুসলমানদের নানাভাবে উত্যক্ত ও নির্যাতন করে চলেছিল। হিযরতকারীদের যাদের সন্তানেরা মক্কায় ছিল তারা তাদের আত্মীয়-স্বজনের কারণে কিছুটা নিরাপদ ছিল, কিন্তু হাতেব যখন দেখতে পেলেন তার সন্তান-সন্তুতিদের শত্রু নির্যাতন থেকে রক্ষা করার মত কেউ নেই, তখন তিনি ভাবলেন মক্কাবাসীদের প্রতি কিছুটা অনুগ্রহ প্রদর্শণ করলে হয়তঃ তার সন্তানদের প্রতি জুলুম বন্ধ হবে। আর এসময় গায়িকা সারার মক্কায় ফেরৎ যাত্রাকে তিনি একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করলেন।

হাতেব মুনাফেক ছিলেন না। তিনি নিশ্চিত বিশ্বাসী ছিলেন যে, নবী মুহম্মদকে আল্লাহ বিজয় দান করবেন। এই তথ্য ফাঁস হলে তার, কিম্বা ইসলামের কোন ক্ষতি হবে না। তাই তিনি যুদ্ধের তথ্য ফাঁস করে দিয়ে মক্কাবাসীদের নামে একটি পত্র লিখে তা গোপনে সারার হাতে সোপর্দ করলেন।

এদিকে ফেরেস্তা জিব্রাইল নবীজীকে ব্যাপারটি জানিয়ে দেন। নবীজী এটাও জানতে পারেন যে, ঐ মহিলাটি ঐ সময় ‘রওযায়ে খাক’ নামক স্থানে পৌঁছে গেছে। তখন তিনি আলী, আবু মুরসাদ ও যুবায়ের ইবনে আওয়ামকে তার পশ্চাৎধাবনের নির্দেশ দেন। এই দল তাকে নির্দিষ্ট স্থানে উটে সওয়ার অবস্থায় গমনরত দেখতে পেয়ে আঁটক করে। অতঃপর তাকে বলা হয়- ‘তোমার কাছে যে পত্র রয়েছে তা বের কর।’
সে বলল, ‘আমার কাছে কারও কোন পত্র নেই।’

আলীর দলটি তার উটকে বসিয়ে দিল। এরপর তার মালামাল তল্লাসী করল। কিন্তু কোন পত্র মিলল না। এই দলের প্রত্যেকে নিশ্চিত ছিল নবী মুহম্মদের দেয়া তথ্য কখনও ভ্রান্ত হতে পারে না। তাই তারা তাকে ভীতি প্রদর্শণ করে একথা বলল যে, ‘হয় পত্র বের করে দাও, নতুবা পত্রের খোঁজে আমরা হয়তঃ তোমাকে বিবস্ত্র করে ফেলব।’ তখন সে তার পাজামার ভিতর থেকে সেটি বের করে দিল।

আলীর দলটি পত্রসহ ঐ মহিলাকে নিয়ে মদিনায় ফিরে এল। পুরো ঘটনা জানতে পেরে ওমর ক্রোধে অগ্নিশর্মা হয়ে নবীজীকে বললেন, ‘এই ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর রসূল ও সকল মুসলমানের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। সুতরাং অনুমতি দিন আমি তার গর্দান উড়িয়ে দেই।’
নবীজী বললেন, ‘সে কি বদর যোদ্ধাদের একজন নয়? আল্লাহ বদর যোদ্ধাদেরকে ক্ষমা করার ও জান্নাতের ঘোষণা দিয়েছেন।’

সুতরাং হাতেবকে ডেকে আনা হল। নবীজী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওহে হাতেব, কিসে তোমাকে উদ্বুদ্ধ করল এ কাজ করতে?’
তিনি বললেন, ‘ইয়া রসূলুল্লাহ! আমি আমার সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই একাজ করেছি। আমি ছাড়া অন্য কোন মোজাহির নেই যার স্বগোত্রের লোক মক্কায় বিদ্যমান নেই। আমি ভেবেছিলাম মক্কাবাসীদের প্রতি একটু অনুগ্রহ করলে তারা হয়তঃ আমার সন্তান-সন্তুতিদের কোন ক্ষতি করবে না। তবে আমি এই কাজ ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্যে করিনি। আমার তখনও যেমন দৃঢ়বিশ্বাস ছিল এবং এখনও তেমনি আছে, বিজয় আপনার সুনিশ্চিত। মক্কাবাসীরা আমার দেয়া তথ্য জেনে গেলেও তাতে কোন ক্ষতি হবে না।’
সব শুনে নবীজী উপস্থিত সকলকে বললেন, ‘হাতেব সত্য বলেছে। অতএব তার ব্যাপারে তোমরা ভাল ছাড়া মন্দ বোলও না।’
ওমর বললেন, ‘আল্লাহ ও তাঁর রসূলই সত্য জানেন।’

অতঃপর হাতেব ও মুসলমানদের প্রতি উপদেশ সমম্বলিত কোরআনের এই আয়াতসমূহ নাযিল হল- ‘মুমিনেরা, তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুকে বন্ধুরূপে গ্রহণ কোরও না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তারা, যে সত্য তোমাদের কাছে আগমন করেছে, তা অস্বীকার করেছে। তারা রসূলকে ও তোমাদেরকে বহিস্কার করে এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরলপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়। তোমাদেরকে করতলগত করতে পারলে তারা তোমাদের শত্রু হয়ে যাবে এবং মন্দ উদ্দেশ্যে তোমাদের প্রতি বাহু ও রসনা প্রসারিত করবে এবং চাইবে যে, কোনরূপে তোমরাও কাফের হয়ে যাও। তোমাদের স্বজন- পরিজন ও সন্তান-সন্তুতি কেয়ামতের দিন কোন উপকারে আসবে না। তিনি তোমাদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। তোমরা যা কর, আল্লাহ তা দেখেন।’-(৬০ঃ১-৩)

এরপর নিম্নের আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছিল যাতে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছে যে, আজ যারা মুসলমানদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও মুসলমানদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আয়াতটি এই -‘যারা তোমাদের শত্রু আল্লাহ তাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সম্ভবতঃ বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে দেবেন। আল্লাহ সবই করতে পারেন এবং আল্লাহ ক্ষমাশীল করুণাময়। ধর্মের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি এবং তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচারণ ও ইনসাফ করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ইনসাফকারীদের ভালবাসেন। আল্লাহ কেবল তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে নিষেধ করেন, যারা ধর্মের ব্যাপারে তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে, তোমাদেরকে দেশ থেকে বহিস্কৃত করেছে এবং বহিস্কার কার্যে সহায়তা করেছে। যারা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করে তারাই যালেম।’-(৬০ঃ৭-৯)

৯২৯ সনের ১১ই ডিসেম্বর (৮ হিজরী ১৮ই রমজান)। পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে দশ সহস্র মুসলিম মুজাহিদ সঙ্গে নিয়ে নবী মুহম্মদ মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। এরূপে মূসার ভাববাণী পূর্ণ হল, ‘দশসহস্র ন্যায়নিষ্ট সহচরসহ তিনি এলেন।’ 

মক্কার উপকন্ঠে ‘মার উজ-জহরান’ নামক গিরি উপত্যকায় মুসলিম সেনাদের শিবির স্থাপিত হয়। অতঃপর নবীজী দূত মারফত কুরাইশদের কাছে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব পাঠান। 

- হয় তোমরা বনি খোজা গোত্রকে উপযুক্ত রক্তপণ দিয়ে এই অন্যায়ের প্রতিকার কর। অথবা,
- বনি বকর গোত্রের সাথে সকল সম্বন্ধ ছিন্ন কর। -অথবা,
- হুদাইবিয়ার সন্ধি বাতিল হয়েছে বলে ঘোষণা কর।

কুরাইশরা জানত না যে, মুসলমানরা প্রস্তুত হয়ে মক্কার উপকন্ঠে উপস্থিত হয়েছে। সুতরাং তারা উৎসাহের সাথে দূতকে জানিয়ে দেয়, ‘আমরা তৃতীয় শর্তটিই মেনে নিলাম।’

মুসলিম শিবিরে রাতের খাবার তৈরীর জন্যে আগুন জ্বালান হলে নিকটবর্তীতে ঐ আগুন দেখে কুরাইশরা অবাক হয়। সুতরাং তারা আবু সুফিয়ানকে প্রকৃত তথ্য জানতে প্রেরণ করে।

‘মুসলিম মুজাহিদরা এত কাছে এসে পড়েছে!’ -আবু সুফিয়ান বিষ্ময়ের আর শেষ রইল না। তিনি সংগোপনে মুসলিম বাহিনীর তাঁবুর চারিদিকে ঘুরেফিরে দেখতে লাগলেন। এসময় অগ্নিশিখার উজ্জ্বল আলোকে প্রহরীরা তাকে চিনে ফেলে নিরবে তার পিছু নেয় এবং সুযোগমত বন্দী করে নবীজীর কাছে নিয়ে আসে। নবীজী তাকে নিঃশর্ত ক্ষমা করে মুক্তি দিয়ে দেন। ক্ষমার এই মহত্ত্বে মুগ্ধ হয়ে আবু সুফিয়ান তখনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পরে মক্কায় ফিরে যান।

সুবেহ সাদেকের শুভপ্রভা পূর্ব গগণে প্রতিভাত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মরুর উপত্যাকার শিখর দেশ হতে বেলালের কন্ঠের আজানধ্বনি চারিদিকে মুখরিত হল। অতঃপর সকলে জামাতে সমবেত হয়ে ফজরের নামাজ সমাপন করে। নামাজ অন্তে বিভিন্ন গোত্রের বীররা পরিকল্পণা মত স্বতন্ত্রদলে বিভক্ত হয়ে মক্কার দিকে যাত্রা করতে আরম্ভ করে। 

মক্কা- পবিত্র এ নগরীটি Valley of Ibrahim-এ অবস্থিত, আর তাকে ঘিরে রয়েছে black rugged hills যা কোথাও কোথাও হাজার ফুট উচ্চতায় গিয়ে ঠেকেছে। There were four entry routes through passes in the hills. These were from the north-west, the south-west, the south, and the north-east. Muhammad divided the Muslim army into four columns: one to advance through each pass. The main column in which Muhammad was present was commanded by Abu Ubaidah ibn al-Jarrah. It was tasked to enter Mecca through the main Madina route, from the north-west near Azakhir. Muhammad's cousin Az Zubayr commanded the second column and it would enter Mecca from the south-west, through a pass west of Kuda hill. The column entering from the south through Kudai was under the leadership of Muhammad's cousin Ali. The last column under Khalid ibn al-Walid was tasked to enter from the north-east, through Khandama and Lait.-Wikipedia.


আবু সুফিয়ান, পিতৃব্য আব্বাসের সাথে উপত্যাকার একটা চূঁড়ায় বসে চকিত ও স্তম্ভিত দৃষ্টিতে মুসলমানদের আগমন দেখছিলেন। একসময় সেনাপতি সা‘দ ইবনে ওবায়দা পাশ দিয়ে যাত্রার সময় আবু সুফিয়ানকে লক্ষ্য করে বলে ওঠেন, ‘আজ ভীষণ সংঘর্ষের দিন, আজ মক্কার সম্ভ্রম নষ্ট হবার দিন।’

আবু সুফিয়ান দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বসে রইলেন। অবশেষে মোহাজিররা সম্মুখে উপস্থিত হন। নবী মুহম্মদ এই দলে ছিলেন। তাকে দেখেই আবু সুফিয়ান চিৎকার করে বলেন, ‘মুহম্মদ, তুমি কি তোমার স্বজনকে হত্যা করার আদেশ দিয়েছ?’
তিনি বলেন, ‘না।’
তখন আবু সুফিয়ান সাদের দর্পোক্তির কথা নিবেদন করে ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখপানে চেয়ে থাকেন। নবীজী বজ্রগম্ভীর স্বরে উত্তর দেন, ‘সা‘দের কথা সত্য নয়, আজ প্রেম ও করুণার দিন, আজ কা’বার সম্ভ্রম চির প্রতিষ্ঠিত হবার দিন।’

সঙ্গে সঙ্গে অশ্বসাদী হরকরা ছুটে গিয়ে সা‘দকে জানিয়ে দেন যে, এই প্রকার উক্তি করার জন্যে তাকে পদচ্যূত করা হয়েছে। তখুনি সা‘দ নীরবে নব নিয়োজিত সেনাপতির হস্তে পতাকা অর্পণ করে তার বশ্যতা স্বীকার করে নেন। 

নবীজী আবু সুফিয়ানকে বলেন, ‘আপনি মক্কাবাসীদের অভয় দেন, আজ তাদের প্রতি কোনই কঠোরতা হবে না। আমার পক্ষ হতে নগরময় ঘোষণা করে দেন-
-যে ব্যক্তি অস্ত্র ত্যাগ করবে -তাকে অভয় দেয়া হল।
-যে ব্যক্তি কা’বায় প্রবেশ করবে- সে অভয়প্রাপ্ত।
-যারা নিজেদের গৃহদ্বার বন্ধ করে রাখবে তাদের কোন ভয় নেই।
-যারা আবু সূফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে তারাও অভয়প্রাপ্ত। 

আর মক্কাবাসীর প্রতি 
নবীজীর দেয়া এ, অভয়বাণী মুসলিম বাহিনীর সমস্ত মুজাহিদকেও জানিয়ে দেয়া হল।

মুজাহিদের প্রতি যেমন আদেশ ছিল, তেমনিভাবে তারা বিভিন্ন পথে মক্কায় প্রবেশ করে। আবু জেহেল পুত্র ইকরামা ও উমাইয়ার পুত্র সাফওয়ান গোত্র প্রধান হিসেবে সামান্য প্রতিরোধ করেছিল, ফলে কিছু সংখ্যক মুসলমান নিহত হয়। তৎক্ষণাৎ সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদকে কৈফিয়ত দিতে তলব করা হয়। খালিদ নবীজীর নিকট উপস্থিত হয়ে নিবেদন করেন, ‘হে রসূলুল্লাহ! আমি আপনার আদেশ প্রতিপালনে যথেষ্ট সচেষ্টা ছিলাম, কিন্তু তারা কোনমতেই নিরস্ত্র হল না। তারা আমাদের আক্রমণ করে এবং দু‘জন মুসলমানকে হত্যা করে ফেলে। অগত্যা আমাকেও অস্ত্র চালনা করতে হয়। কিন্তু হে রহমাতুল-লিল-আল আমিন! আপনি তদন্ত করে দেখুন, যাতে এই সংঘর্ষে অধিক প্রাণহানি না হয়, সেজন্যে আমি সর্বদাই যৎপরোনাস্তি সংযত ও সঙ্কুচিত হয়ে সৈন্য চালনা করেছি।’ -এমন দু‘একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া প্রায় বিনা প্রতিরোধেই মক্কা বিজয় (Conquest of Mecca) সম্পন্ন হল।

অবশেষে বিজেতা হিসেবে মুহম্মদ মক্কায় প্রবেশ করলেন। যে মহানগরী একদিন তার প্রতি নির্মম আচরণ করেছিল, তাকে ও তার শিষ্যদের বিদেশ-বিভূয়ে তাড়িয়ে দিয়েছিল, যে শহর তার ও তার অনুসারীদের জীবন অতীষ্ঠ করে তুলেছিল- তা আজ তার পদতলে। যে বিক্রমশালী ও নিষ্ঠুর জুলুমকারীরা নির্মম অত্যাচার চালিয়ে মনুষ্যত্বের অপমান করেছিল তারা আজ সম্পূর্ণরূপে তার করুণার ভিখারী।

কিন্তু বিজয় মূহুর্তে নবী মুহম্মদ সব অনিষ্টের কথা, সব ব্যাথা ভুলে গেলেন, সব আঘাত ক্ষমা করে দিলেন, আর সমগ্র মক্কাবাসীর জন্যে সাধারণ ক্ষমা মঞ্জুর করলেন। আবু সুফিয়ানের স্ত্রী হিন্দা, আবু জেহেল পুত্র ইকরামাও আজ ক্ষমা পেল। শুধু জনাকয়েক (আব্দুল্লাহ বিন আবু খাতল, মেকইয়াছ বিন সুবাবার প্রমুখ) ন্যায়বিচারের তুলাদন্ডে পূর্বেই যারা মৃত্যুদন্ডাজ্ঞা প্রাপ্ত হয়েছিল, তাদেরকেই কেবল গ্রেফতার এবং অতঃপর দন্ডাজ্ঞা কার্যকর করা হয়। 

মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আব্দুল্লাহ বিন আবু খাতলের অপরাধ ছিল যে- সে মদিনায় গমণপূর্বক ইসলাম গ্রহণ করে সেখানে অবস্থান করছিল। ঐসময় নবীজী তাকে অপর দু‘জন মুসলমানের সাথে যাকাত আদায়ের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। কিন্তু যাকাত আদায় শেষে ফেরার পথে খাতল সুযোগমত একজনকে হত্যা করে যাকাতের অর্থ লুটে নিয়ে মক্কায় পলায়ন করে। অপরজন মক্কায় ফিরে এসে যখন এ সংবাদ দিয়েছিল, তখন স্বেচ্ছাহত্যা, বিশ্বাসঘাতকতা ও সরকারী তহবিল আত্মসাতের অপরাধে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদন্ডাদেশ ঘোষিত হয়।

আর মেকইয়াছ বিন সুবাবার অপরাধ ছিল- সে ও তার ভ্রাতা হিশাম ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় অবস্থান করছিল। অতঃপর এক সম্মুখ সমরে জনৈক আনসার ভ্রমবশতঃ হিশামকে হত্যা করে ফেলে। যথাসময়ে নবী মুহম্মদের দরবারে এই মোকদ্দমা উপস্থাপিত হয়।

এ সময় এই আয়াত নাযিল হল- মুসলমানের কাজ নয় যে, মুসলমানকে হত্যা করে, কিন্তু ভুলক্রমে। যে ব্যক্তি মুসলমানকে ভুলক্রমে হত্যা করে, সে একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং রক্ত বিনিময় সমর্পণ করবে তার স্বজনদেরকে; কিন্তু যদি তারা ক্ষমা করে দেয়। অতঃপর যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের শত্রু সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে এবং যদি সে তোমাদের সাথে চুক্তিবদ্ধ কোন সম্প্রদায়ের অন্তর্গত হয়, তবে রক্ত বিনিময় সমর্পণ করবে তার স্বজনদেরকে এবং একজন মুসলমান ক্রীতদাস মুক্ত করবে। অতঃপর যে ব্যক্তি না পায়, সে আল্লাহর কাছ থেকে গোনাহ মাফ করানোর জন্যে উপর্যুপরি দুইমাস রোজা রাখবে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী প্রজ্ঞাময়। -(৪ঃ৯২)

এই আয়াতের ভিত্তিতে নবীজী মেকইয়াছকে ক্ষতিপূরণ প্রদানের আদেশ দেন। যেহেতু হত্যাটি ছিল ভ্রমবশতঃ, যা প্রমাণিত হয়েছিল।

মেকইয়াছ ক্ষতিপূরণ গ্রহণ করে। কিন্তু তার মনে ছিল জিঘাংসা। সুতরাং সে সুযোগমত উক্ত আনসারকে হত্যা করে মক্কায় পলায়ন করে। তখনই স্বেচ্ছায় নরহত্যার অপরাধে তার মৃত্যুদন্ডাদেশ ঘোষিত হয়। কেননা, ইতিমধ্যে কোরআন স্বেচ্ছাহত্যা জঘণ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা ও তার জঘন্য শাস্তি নিরুপণ করেছিল- যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাক্রমে কোন মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম, তাতেই সে চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাকে অভিসম্পাৎ করেছেন এবং তার জন্যে ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।-(৪ঃ৯৩)

নবীজী শান্তভাবে ও শান্তির সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করলেন; কোন গৃহ লুন্ঠিত হল না কোন নারী লাঞ্ছিত হল না। বিজয় অভিযানের ইতিহাসে এ ছিল অনন্য।

কা‘বা- ইসলামের ধারক ও বাহক, বহু পয়গম্বরের স্মৃতি বিজড়িত প্রাচীন এই উপাসনালয়ের প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছিলেন নবী মুহম্মদ। And he ordered the gate of the Ka'bah to be opened. Then, placed both of his hands on the wooden frame of the gate and the people could see his sacred and luminous face, he addressed them thus: "Praised be Allah, Who has fulfilled His promise and helped His servant and routed the enemies"'.

The Almighty Allah had promised the Prophet through revelation that He would make him return to his birth-place: Allah who has commanded you to follow the guidance of the Qur'an will certainly return you victoriously to your place of birth. (Surah al-Qasas, 28:85). By saying, "Allah has fulfilled His promise" the Prophet made a mention of the correctness of that Divine promise and once again demonstrated his truthfulness.

একক উপাস্য আল্লাহর উপাসনার জন্যে প্রতিষ্ঠিত এই গৃহ এখন বহ উপাস্যওয়ালাদের দেবতাসমূহের আখড়ায় পরিণত। কুরাইশ পৌত্তলিকদের ৩৬০টি (চান্দ্র বৎসরের ৩৬০ দিনের প্রত্যেকদিনের জন্যে একটি) জাতীয় দেবমূর্ত্তি স্থাপিত রয়েছে কা‘বার অভ্যন্তরে- ও তার চারিপাশে। এসব দেবমূর্ত্তি বহমানুষকে বিপথগামী করেছে। সুতরাং আর কালক্ষেপণ নয়, নবীজী তখুনি নির্দেশ দিলেন সেগুলো ভেঙ্গে ফেলার।  

তৎক্ষণাৎ নির্দয়ভাবে ধূলিসাৎ করা হল মুর্ত্তিগুলো। কা’বার প্রাচীর গাত্রে ইব্রাহিম ও ইসমাইলের অঙ্কিত চিত্রও ধূয়ে মুছে ফেলা হল। যিশু কোলে মেরীর চিত্রও কা’বার একটা স্তম্ভে বিদ্যমান ছিল, এই চিত্রখানি জাফরানী পানি দিয়ে ঢেকে দেয়া হল। 

ভয়ে-বিস্ময়ে, ক্ষোভে-অভিমানে এবং অপমানে-অনুতাপে একেবারে অভিভূত হয়ে নিতান্ত দুঃখের সঙ্গে পৌত্তলিকরা চারিদিকে দাঁড়িয়ে তাদের উপাস্য দেবতাদের অধঃপতন নিরীক্ষণ করছিল। তাদের কাছে সত্য প্রতিভাত হল, তারা অভ্যস্ত কন্ঠের সেই পুরাতন ধ্বনি শুনতে পেল, যা তারা একদিন ব্যঙ্গ করত, যখন নবীজীর নির্দেশে ওমর মূর্ত্তিগুলি ভেঙ্গে ফেলছিলেন- ‘সত্য সমাগত, মিথ্যে অপসৃত, মিথ্যের বিনাশ অবশ্যম্ভাবী;-(১৭ঃ৮১) তাদের দেবদেবী কতই না শক্তিহীন!’

এসময় বেলাল যাকে নবীজী মুয়াজ্জিন নিযুক্ত করেছিলেন, তাকে দেখে মক্কার একজন কুরাইশ বলল, ‘আল্লাহকে ধন্যবাদ যে, আমার পিতা পূর্বেই মারা গেছেন। তাকে এ কূ-দিন দেখতে হয়নি।’
উপস্থিত হারেস ইবনে হেশাম বলল, ‘মুহম্মদ মসজিদে হারামে আযান দেবার জন্যে এক কাল কাক ব্যতিত অন্য কোন মানুষ খুঁজে পেল না?’
আবু সুফিয়ান বললেন, ‘আমি কিছুই বলব না; কারণ আমার আশঙ্কা হয় যে, আমি কিছু বললেই আকাশের মালিক তার কাছে তা পৌঁছিয়ে দেবেন।’ আবু সুফিয়ানকে হিশামের সাথে কথাবার্তা বলতে দেখে নবীজী তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি বলাবলি করছেন?’ অগত্যা তিনি সব স্বীকার করলেন। এসময় এই আয়াত নাযিল হল- নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সেই সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত যে সর্বাধিক পরহেযগার। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবকিছুর খবর রাখেন।-(৪৯ঃ১৩)

Complete silence prevailed over the precincts of the mosque and outside it. The people, holding their breath, were thinking different things. At this hour the people of Makkah were reminded of the cruelty, oppression and injustice which they had perpetrated and various other thoughts came to their minds.

These people, while mentioning the big crimes committed by them, were saying to one another: "He will certainly put us to the sword or will kill some of us and detain others and will make our women and children prisoners".

নবী মুহম্মদ কি বলেন বা করেন তা শোনার বা দেখার জন্যে কুরাইশদের ব্যাকুলতা ও চাঞ্চল্যের অবধি ছিল না। তথাপি কারো কারো মনে ভীতিকর ও শয়তানিক চিন্তাও ঘুরপাক খাচ্ছিল। এ সময় হঠাৎ নবীজী নিরবতা ভাঙ্গলেন। তিনি লোকদের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে তাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন-

-‘আল্লাহর শোকর যিনি নিজের ওয়াদা পূর্ণ করেছেন, যিনি নিজের দাসকে সাহায্য করেছেন এবং একাকী যিনি সংঘসমূহকে পরাভূত করেছেন। 
-অন্ধকার যুগের সমস্ত অহঙ্কার-তা অর্থগত হোক আর শোণিতগত হোক-সমস্তই আমার এই যুগল পদতলে দলিত, মথিত ও চিরকালের তরে রহিত হয়ে গেল।
-অতঃপর যদি কেউ কোন ব্যক্তিকে ইচ্ছেপূর্বক হত্যা করে, তাহলে এটা তার ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে এবং সেজন্যে তাকে প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা হবে। 

-হে কুরাইশ জাতি! মূর্খতা যুগের অহমিকা এবং কৌলিণ্যের গর্ব আল্লাহ তোমাদের কাছ  থেকে দূর করে দিয়েছেন।’ তিনি কোরআনের এই আয়াত আবৃতি করলেন- ‘হে মানব! আমি তোমাদের সকলকেই (একই উপকরণে) স্ত্রী-পুরুষ হতে সমুৎপন্ন করেছি-এবং তোমাদেরকে একমাত্র এ জন্যে বিভিন্ন শাখা ও বিভিন্ন গোত্রে (বিভক্ত) করেছি যে, এ দ্বারা তোমরা পরষ্পরের কাছে পরিচিত হতে পারবে (অহঙ্কার ও অত্যাচার করার জন্যে নয়)। নিশ্চয় জানিও যে, তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি অধিক সংযমশীল (পরহেজগার), আল্লাহর কাছে সে-ই অধিক মহৎ। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সর্বদর্শী।’-(৪৯ঃ১৩)

মক্কা বিজয় ও কাবার ৩৬০টি মূর্ত্তি ধ্বংস।
অতঃপর নবীজী সমবেত কুরাইশদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘হে কুরাইশগণ, আমি তোমাদের সঙ্গে কেমন আচরণ করব বলে তোমরা মনে কর?’ 

তারা উত্তর দিল, ‘হে দয়ালু ভ্রাতা ও ভ্রাতুষ্পুত্র, আমরা তোমার কাছ থেকে করুণা ও সহানুভূতি চাই।’ -এ কথা শুনে তার নয়নযুগল দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে নামল এবং তিনি বললেন, ‘ইউসূফ তার ভ্রাতাদের যেরূপ বলেছিলেন আমিও তোমাদের তেমনিভাবে বলব, ‘আমি আজ তোমাদের তিরস্কার করব না; আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। আল্লাহ সবচেয়ে দয়ালু ও সহানুভূতিশীল।’

নবীজীর অভয় ঘোষণার পরও যারা খালিদের সৈন্যদলকে আক্রমণ করে দু‘জনকে হত্যা করেছিল, তাদেরই একদল নবীজীকে অতর্কিতভাবে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হল। এদেরই একজন ছিল ফোজালা, ফোজালা ইবনে ওমের।

মক্কা বিজয়ের দ্বিতীয় দিবসে নবী যখন নিবিষ্ট মনে কা’বা তাওয়াফ করছিলেন, তখন ফোজালা অতি সন্তর্পণে হত্যার উদ্দেশ্যে তার দিকে অগ্রসর হতে থকে। হঠাৎ নবীজীর দৃষ্টি তার উপর পতিত হয়। তিনি জিজ্ঞেস করেন, ‘কে? ফোজালা না-কি?
সে বলল, ‘জ্বি- হ্যাঁ, আমি।’
তিনি বলেন, ‘কি মতলব আঁটছ?’
সে বলল, ‘জ্বি, কিছু না। এই আল্লাহ, আল্লাহ করছি।’
নবীজী হেসে বললেন, ‘বেশ কথা ফোজালা! সেই আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর।’

অতঃপর মদ ও বেশ্যা নারীতে আসক্ত ফোজালা যখন জীবন সাগরে স্নাত হয়ে পবিত্র দেহে ও শুদ্ধ-বুদ্ধ হৃদয়ে গৃহপানে ফিরে চলেছে, সেইসময় তার বড় আদরের ও বড় গৌরবের রক্ষিতা তার গৃহ থেকে গমনরত ফোজালার ভাবান্তর দর্শণে বিচলিত হয়ে চিৎকার করে বলল, ‘প্রাণেশ্বর! একবার এদিকে এসো, দু‘টো কথা শুনে যাও।’

ফোজালা লজ্জায় ও ঘৃণায় অধোবদনে তাকে বলল, ‘আল্লাহ ও ইসলাম আমাকে তোমা হতে বারিত করেছে।’ সে অতঃপর দ্রুতপদে সেখান থেকে চলে যেতে যেতে আরও বলে গেল, ‘একমাত্র আল্লাহই আমাদের সকলের প্রাণেশ্বর, তাঁকেই প্রেম কর, শান্তিলাভ করতে পারবে।’

মক্কা বিজয়ে পৃথিবীর ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায় রচিত হল। দলে দলে সবাই ইসলাম গ্রহণ করতে লাগল। এভাবে কোরআনের ভবিষ্যদ্বাণী পরিপূর্ণতা লাভ করল- 

‘যখন আসবে আল্লাহর সাহায্য ও বিজয়। আর তুমি মানুষকে দলে দলে আল্লাহর ধর্ম গ্রহণ করতে দেখবে, তখন তুমি তোমার প্রতিপালকের প্রশংসায় তার পবিত্র মহিমা ঘোষণা কর ও তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, নিশ্চয় তিনি তওবা মঞ্জুরকারী।’-(৩৫ঃ১-৩)

- এখন নবী মুহম্মদ দেখতে পেলেন যে, তিনি স্রষ্টার যে মহান পরিকল্পণা কার্যকর করার জন্যে প্রেরিত হয়েছেন তা বাস্তবায়ন লাভ করেছে।

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন