pytheya.blogspot.com Webutation

২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

Thief: বশির ইবনে উবায়রকের চুরির কাহিনী।


মদিনাতে আগত মুসলমানরা ছিল কপর্দকশুন্য। ফলে তাদেরকে দারিদ্রতার মাঝে, অনাহারে দিনাতিপাত করতে হত। মক্কাতে তাদের সাধারণ খাদ্য ছিল খেজুর, যবের বা গমের আটা। কিন্তু মদিনাতে আটা প্রায়ই পাওয়া যেত না। সিরিয়া থেকে চালান এলে কেউ কেউ মেহমানদের জন্যে কিম্বা বিশেষ পারিবারিক উৎসবের জন্যে ক্রয় করে রাখত। রেফাআহ নামক একজন মুসলমান এমনিভাবে কিছু গমের আটা ক্রয় করে একটি বস্তায় ভরে নিজের গৃহের একটি কক্ষে রেখে দিয়েছিলেন। তিনি এই আটার বস্তার মধ্যে কিছু অস্ত্র ও একাটি লৌহবর্ম লুকিয়ে রেখেছিলেন।

একদিন সকালে রেফাআহ দেখলেন ঘরে সিঁদ কেটে তার আটার বস্তাটি কে বা কারা চুরি করেছে। তিনি তখন তার ভ্রাতুষ্পুত্র কাতাদাহকে ডেকে ঘটনাটি বিবৃত করলেন। তারপর সবাই মিলে মহল্লায় খোঁজাখুঁজি শুরু করলেন। কয়েকজন বলল, ‘রাত্রে আমরা বনি উবায়রকের গৃহে আগুন জ্বলতে দেখেছি। মনে হয় খাদ্য পাকান হয়েছে।’

সংবাদ পেয়ে বনি উবায়রক নিজেই এসে হাযির হলেন এবং বললেন, ‘এটা নিশ্চয়ই লবীদ ইবনে সাহলের কাজ। আমরা তো তাকে খাঁটি মুসলমান বলেই জানতাম!’
একথা শুনে লবীদ কোষমুক্ত তরবারী হাতে করে ছুটে এলেন এবং বললেন, ‘তোমরা আমাকে চোর বলছ? শুনে রাখ, চুরির রহস্য উৎঘাটিত না হওয়া পর্যন্ত আমি এই তরবারী কোষবদ্ধ করব না।’
তখন বনি উবায়রক নরম সূরে বললেন, ‘আপনার দ্বারা একাজ হতে পারে না। আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন। আপনার নাম কেউ নেয়নি।’

এরপর বনি উবায়রক জনৈক ইহুদির বিরুদ্ধে চুরির অপবাদ আরোপ করলেন। এদিকে চোর (Thief) চুরি করার সময় আটার বস্তাটি হয়তঃ সামান্য ছিঁড়ে ফেলেছিল। আর এ সময় রেফাআহর গৃহ হতে ঐ ইহুদির গৃহ পর্যন্ত আটার লক্ষণও পাওয়া গেল। তারপর তদন্তের সময় চোরাই অস্ত্র-শস্ত্র তার গৃহ সন্নিকট হতে উদ্ধার করা হল। আর তার গৃহের অভ্যন্তরে পাওয়া গেল লৌহবর্মটি। ইহুদি কসম খেয়ে বলল, ‘বশির ইবনে উবায়রক আমাকে লৌহবর্মটি দিয়েছে।’

সকল ঘটনা পর্যবেক্ষণের পর কাতাদাহ ও রেফাআহের প্রবল ধারণা জন্মিল যে, এটি বনি উবায়রকের কীর্তি। কাতাদাহ মুহম্মদের কাছে উপস্থিত হয়ে চুরির ঘটনা এবং তার ধারণা সম্পর্কে তাকে অবহিত করলেন। বনি উবায়রক সংবাদ পেয়ে মুহম্মদের কাছে কাতাদাহ ও রেফাআহের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেন এবং বললেন, ‘হে রসুলুল্লাহ! তারা শরিয়ত সম্মত প্রমাণ ছাড়াই আমাদের নামে চুরির অপবাদ আরোপ করছে। অথচ চোরাই মাল ইহুদির গৃহ থেকে বের হয়েছে। আপনি তাদেরকে নিষেধ করুন তারা যেন আমাদেরকে দোষারোপ না করে এবং ইহুদির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।’

বাহ্যিক অবস্থা ও লক্ষণাদি দৃষ্টে মুহম্মদের ধারণা হল বনি উবায়রকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ঠিক নয়, কাজটি ইহুদির। তাই কাতাদাহ তার কাছে এলে তিনি বললেন, ‘হে কাতাদাহ! তুমি বিনা প্রমাণে একটি মুসলমান পরিবারের বিরুদ্ধে দোষারোপ করছ।’
এতে কাতাদাহ দুঃখিত হলেন এবং আফসোস করে বললেন, ‘হায়! আমার মাল গেলেও এই ব্যাপরে রসূলুল্লাহকে না বলাই ভাল ছিল।’
রেফাআহও দুঃখিত হয়ে বললেন, ‘এখন আমরা ধৈর্য্য ধরব। আল্লাহ আমাদের একমাত্র সহায়।’
খুব বেশী দিন অতিবাহিত হতে না হতে এ বিষয়ে কোরআনের আয়াত নাযিল হল এবং মুহম্মদের সামনে ঘটনার বাস্তবরূপ তুলে ধরা হল। আয়াতসমূহ এই-নিশ্চয় আমি তোমার প্রতি সত্য কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষের মধ্যে ফয়সালা কর, যা আল্লাহ তোমাকে হৃদয়ঙ্গম করান। তুমি বিশ্বাসঘাতকদের পক্ষ থেকে বিতর্ককারী হবে না এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল দয়ালু। যারা মনে বিশ্বাসঘাতকতা পোষণ করে তাদের পক্ষ থেকে বিতর্ক করবে না। আল্লাহ পছন্দ করেন না তাকে, যে বিশ্বাসঘাতক পাপী হয়। তারা মানুষের কাছে লজ্জিত হয় এবং আল্লাহর কাছে লজ্জিত হয় না। সে তাদের সাথে রয়েছে, যখন তারা রাত্রে এমন বিষয়ে পরামর্শ করে, যাতে আল্লাহ সম্মত নন। তারা যা কিছু করে, সবই আল্লাহর আয়ত্ত্বাধীন। 

শুনছ? তোমরা তাদের পক্ষ থেকে পার্থিব জীবনে বিবাদ করছ, অতঃপর কেয়ামতের দিনে তাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহর সাথে কে বিবাদ করবে অথবা কে তাদের কার্যনির্বাহী হবে। যে কেউ পাপ করে, সে নিজের পক্ষেই করে। আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। যে ব্যক্তি ভুল কিম্বা পাপ করে, অতঃপর কোন নিরাপরাধ ব্যক্তির উপর অপবাদ আরোপ করে সে নিজের মাথায় বহন করে জঘণ্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য পাপ। যদি তোমার প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা না হত, তবে তাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করার সংকল্প করেই ফেলেছিল। তারা পথভ্রান্ত করতে পারে না কিন্তু নিজেদেরই এবং তোমার কোন অনিষ্ট করতে পারে না। আল্লাহ তোমার প্রতি ঐশীগ্রন্থ ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং তোমাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা তুমি জানতে না। তোমার প্রতি আল্লাহর করুণা অসীম।(৪:১০৫-১১৩)

এভাবে কোরআন বনি উবায়রকের চুরি ফাঁস করে ইহুদিকে দোষমুক্ত করে দিল। এতে বনি উবায়রক বাধ্য হয়ে চোরাই মাল মুহম্মদের হাতে সমর্পণ করলেন। তিনি তা রেফাআহকে প্রত্যার্পণ করলেন। তখন রেফাআহ সমুদয় অস্ত্র জেহাদের জন্যে ওয়াকফ করে দিলেন। 

এদিকে বশীর ইবনে ওবায়রক মদিনা থেকে পালিয়ে মক্কায় চলে গেল। কিন্তু সে সেখানে শান্তিতে থাকতে পারেনি। যে মহিলার গৃহে সে আশ্রয় নিয়েছিল, ঐ মহিলা পূর্ণ ঘটনা জানতে পেরে তাকে বহিস্কার করে দিল। এমনিভাবে সে ঘুরতে ঘুরতে অবশেষে এক ব্যক্তির গৃহে সিঁদ কাটে এবং প্রাচীর চাপা পড়ে সেখানে নিহত হয়।

সমাপ্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন