pytheya.blogspot.com Webutation

২৯ ফেব্রুয়ারী, ২০১২

Moses: হত্যাকারী সনাক্তকরণে নিহতকেই জীবিত করে সাক্ষ্য গ্রহণ।


বনি-ইস্রায়েলী এক ধনী ব্যক্তির এক অনিন্দ্য সুন্দরী কন্যা ছিল। ঐ ব্যক্তির এক ভাতিজা ছিল। সে তার চাচার সম্পত্তি কুক্ষিগত করার মতলবে তার কন্যাকে বিবাহ করতে চাইল। কিন্তু উক্ত ব্যক্তি তার কন্যাকে ভাতিজার সঙ্গে বিবাহ দিতে সম্মত হল না। সুতরাং ভাতিজা দৈববাণীর (মন্দিরের নির্দিষ্ট স্থানে মনের কথা ব্যক্ত করলে দৈববাণী পাওয়া যেত) আশ্রয় নিল। 

দৈববাণীর ওরকল।
দৈববাণীর মাধ্যমে শয়তান ভাতিজাকে জানাল, ‘তোমার চাচার হায়াত অনেক, তাড়াতাড়ি মরবে বলে মনে হচ্ছে না। যদি তুমি তার সম্পত্তি কুক্ষিগত করতে চাও, তবে তাকে হত্যা করা ছাড়া আর কোন উপায় নেই।’ -কিভাবে হত্যা করতে হবে এবং হত্যা করে কিভাবে সে নিরাপরাধ সাব্যস্ত হবে এ ব্যাপারে শয়তান তাকে পূর্ণ পরামর্শ দিল।

আর ঐ পরামর্শ বাস্তবায়নের সুযোগও এসে গেল। বনি-ইস্রায়েলের এক গোত্রের লোকজন দ্রব্য-সামগ্রী দান করার জন্যে এল পার্শ্ববর্তী এক বস্তিতে। তখন ভাতিজা তার চাচাকে বলল, ‘হে চাচা! বনি-ইস্রায়েলী এক গোত্রের লোকেরা দ্রব্য-সামগ্রী দান করার জন্যে এসেছে। আপনি যদি আমার সাথে সেখানে যান, তবে আপনার প্রভাবে আমিও কিছু দান পেতে পারি।’ 

ভাতিজার প্রস্তাবে চাচা সম্মত হল। তারা উভয়ে রাতের অন্ধকারে চলল। যে বস্তিতে তারা বসবাস করত লোকজন দ্রব্যসামগ্রী নিয়ে সেই বস্তিতে নয়, অন্য বস্তিতে এসেছিল। যখন তারা নিজ বস্তি পার হয়ে উক্ত বস্তির কাছাকাছি পৌঁছিল, ভাতিজা চাচাকে আক্রমণ করল এবং হত্যা করে সেখানে ফেলে রেখে বাড়ীতে চলে এল। পরদিন সকালে সে চাচার খোঁজে বের হল, আর তথায় গিয়ে হাজির হল। সে দেখল কিছুলোক ঐস্থানে ভিড় করে আছে। সেখানে পৌঁছে সে চাচার মৃতদেহটা দেখল আর চাচার জন্যে উচ্চঃস্বরে ক্রন্দন ও বিলাপ করতে লাগল। অতঃপর ঐ বস্তির অধিবাসীদের দোষী সাব্যস্ত করে সে বলল, ‘তোমরা আমার চাচাকে হত্যা করেছ, তোমরা তার খুনের খেসারত দেবে।’ 
মৃত ব্যক্তির লাশ বস্তির কাছে পাওয়া গেছে এ কারণেই ভাতিজা ঐ বস্তির লোকদের কাছে তার চাচার খুনের খেসারত দাবী করে বসেছে। 

বস্তির লোকজন তো তার দাবী শুনে হতবাক। কারণ, ঐ ব্যক্তির নিহত হবার সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই। তারা কি করে খুনের খেসারত দিতে সম্মত হবে? তাই তারা বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি বা তার হত্যার সম্পর্কে আমরা কিছুই জানিনে। সকালে প্রধান ফটক খুলে বের হয়ে এসে আমরা এই অবস্থা দেখেছি। আর রাত্রে ফটক বন্ধ করার পর সকাল না হওয়া পর্যন্ত আমরা তা খুলিনে।’

কিন্তু ভাতিজা তা মেনে নিতে রাজি নয়। অতঃপর উভয়পক্ষের মধ্যে তুমুল বাক-বিতন্ডা শেষে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ময়দানে অবতীর্ণ হওয়ার উপক্রম হল। এসময় একজন বলল, ‘আমাদের মধ্যে আল্লাহর রসূল বিদ্যমান থাকা অবস্থায় আমরা পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করব, এ কেমন কথা? চল, আমরা তার কাছে যাই। নিশ্চয়ই তিনি কোন ফয়সালা দিতে পারবেন।’

উভয়পক্ষ মূসার কছে এল। নিহত ব্যক্তির ভাতিজা বলল, ‘আমি তাদের বস্তির কাছে আমার চাচাকে নিহত অবস্থায় পেয়েছি।’
ঐ বস্তিবাসী বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমরা তাকে হত্যা করিনি। আর কে হত্যা করেছে সে সম্পর্কেও বিন্দু-বিসর্গ অবগত নই।’

মূসা (Moses) ফয়সালার জন্যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলেন, কেননা তখন পর্যন্ত তাকে কোন কিতাব দেয়া হয়নি। আল্লাহ তাকে পথ নির্দেশনা দিলেন। অতঃপর মূসা লোকদেরকে বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে একটা গরু জবেহের নির্দেশ দিয়েছেন।’

গরু জবেহের কথা শুনে লোকেরা আশ্চর্য হল। অতঃপর তারা একে তামাশা মনে করে বিরক্তির স্বরে বলল, ‘হে মূসা! আমরা তোমার কাছে হত্যাকারী চিহ্নিত করার ফয়সালা চেয়েছি। আর তুমি বলছ, গরু জবেহের কথা। তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ?’ 
মূসা বললেন, ‘ঠাট্টা করে অজ্ঞ লোকেরা। আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি, আমি যেন অজ্ঞদের দলে না পড়ি।’ 

তারা গরু জবেহের জন্যে প্রস্তুত ছিল না। তাই তারা মূসাকে বিব্রত করতে এ বিষয়ে নানা রকম অবান্তর প্রশ্ন করতে লাগল। তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল, ঐ গরুটি কেমন হবে।’ 
তখন মূসা বললেন, ‘আল্লাহ বলেছেন এ এমন একটা গরু যা বুড়োও না, অল্পবয়েসীও না-মাঝবয়সী, অতএব তোমরা যে আদেশ পেয়েছ তা পালন কর।’
তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল ওর রঙ কি হবে।’ 
মূসা বললেন, ‘আল্লাহ বলেছেন সেটা হবে হলুদ রঙের বাছুর, তার উজ্জ্বল গাত্রবর্ণ যারাই দেখবে তারাই খুশী হবে।’
তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল গরুটা কি ধরণের। আমাদের কাছে গরু তো একইরকম। আর আল্লাহর ইচ্ছেয় নিশ্চয়ই আমরা পথ পাব।’ 
মূসা বললেন, ‘এ এমন একটি গরু যাকে জমি চাষে বা ক্ষেতে পানি সেচের কাজে লাগান হয়নি, সম্পূর্ণ নিখুঁত।’ 
তারা বলল, ‘এখন তুমি তথ্য ঠিক এনেছ।’ 

এভাবে ইস্রায়েলীরা গাভীর বিষয়ে প্রশ্ন করতে করতে তার রূপ গুণ অনেক জটিল করে ফেলেছিল। এখন এই ধরনের গাভী পাওয়া দুস্কর হয়ে পড়ল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক এতিমের কাছে ঐরূপ একটি গাভী পাওয়া গেল, যা এতিমের অভিভাবকরা বিক্রি করতে রাজী হল না। তখন ইস্রায়েলীরা একটা গাভীর বিনিময়ে উক্ত গাভীটি খরিদ করতে চাইল। কিন্তু তারা এতে রাজি হল না। অতঃপর দু‘টি গাভী দিতে চাইল। তারা এতেও সম্মত হল না। এভাবে তারা উক্ত গাভীর বদলে দশটি গাভী দিতে চাইল। কিন্তু তারা এতেও সম্মত হল না। তখন ইস্রায়েলীরা বলল, ‘আল্লাহর কসম! আমরা যে কোন মূল্যের বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে এটা খরিদ করে নেব।’ 

তারা এতিমের অভিভাবককে মূসার কাছে নিয়ে এল এবং বলল, ‘হে রসূলুল্লাহ! আমরা যে গরুর সন্ধান করছি তা এদের কাছে রয়েছে। আমরা তাদের কাছ থেকে তা মূল্যের বিনিময়ে খরিদ করতে চেয়েছি, কিন্তু তারা তা বিক্রি করতে অস্বীকার করছে।’ 
মূসা এতিমের অভিভাবককে বললেন, ‘গাভীটি বনি-ইস্রায়েলীদের কাছে বিক্রি কর।’ 
সে (অভিভাবক) বলল, ‘হে রসূলুল্লাহ! আমার মালের ব্যাপারে আমিই সর্বাপেক্ষা হকদার নই কি?
মূসা বললেন, ‘হ্যাঁ, তুমিই সর্বাপেক্ষা হকদার।’ 
সে বলল, ‘আমার গাভী আমি বিক্রি করতে প্রস্তুত নই।’
সে প্রস্থান করল।
মূসা বনি-ইস্রায়েলীদেরকে বললেন, ‘তোমরা গাভীর মালিককে যেভাবে পার, রাজি করাও।’ 

বনি-ইস্রায়েলীরা মূল্য হিসেবে গাভীর মালিককে গাভীর ওজনের সমপরিমান স্বর্ণ দিতে চাইল। কিন্তু তারা এতেও সম্মত হল না। অতঃপর তারা দ্বিগুণ ওজনের স্বর্ণ দিতে চাইল। এতেও তারা রাজি হল না। শেষ পর্যন্ত বনি-ইস্রায়েলীরা গাভীর ওজনের দশগুণ স্বর্ণ প্রদান করে গাভীটি খরিদ করে মূসার কাছে নিয়ে এল। 
মূসা গাভীটি জবেহের নির্দেশ দিলেন। 

যদিও ইস্রায়েলীরা এখনও গাভীটি জবেহ করতে আদৌ প্রস্তুত ছিল না, তবুও তারা সেটাকে জবেহ করল। আল্লাহ মূসাকে জানালেন, ‘বাছুরটির কোন অংশ দিয়ে মৃত লোকটিকে আঘাত কর।’ 

সুতরাং মূসা গাভীর স্কন্ধদ্বয়ের মধ্যে থেকে এক টুকরো মাংস নিয়ে মৃত ব্যক্তির গায়ে স্পর্শ করানোর নির্দেশ দিলেন। তারা নির্দেশ মত কাজ করার পর মৃতব্যক্তি জীবিত হয়ে উঠে বসল। তাকে তার হত্যাকারীর নাম জিজ্ঞেস করা হল, তখন সে তার ভাতিজার নাম বলে দিয়েই পুন:রায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। 

এদিকে প্রকৃত তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ায় ভাতিজাও নিজের অপরাধ স্বীকার করেছিল। তাই বনি-ইস্রায়েলীরা তাকে হত্যা করে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে বিন্দুমাত্র কুন্ঠিত হয়নি।

----এক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তির বর্ণনাকেই যথেষ্ট মনে করা হয়েছে। কারণ মূসা ওহীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন যে, নিহত ব্যক্তি সত্য বলবে। নতুবা শরিয়ত সম্মত স্বাক্ষী ছাড়া কোন জবানবন্দীই হত্যা প্রমাণের জন্যে যথেষ্ট না। 

এ সম্পর্কিত কোরআনের আয়াতসমূহ-‘যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে খুন করে একে অন্যের উপর দোষ চাপাচ্ছিলে, আল্লাহ তা প্রকাশ করতে চাইল যা তোমরা গোপন করছিলে। (২:৭২)‘আর যখন মূসা তার নিজের সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু জবেহের হুকুম দিয়েছেন।’ 
তারা বলেছিল, ‘তুমি কি আমাদের সাথে ঠাট্টা করছ?’ 
মূসা বলেছিল, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় চাচ্ছি, আমি যেন জাহেলদের দলে না পড়ি।’ 

তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল, ঐ গরুটি কেমন হবে।’ 
মূসা বলল, ‘আল্লাহ বলেছেন এ এমন একটা গরু যা বুড়োও না, অল্পবয়েসীও না-মাঝবয়সী, অতএব তোমরা যে আদেশ পেয়েছ তা পালন কর।’
তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল ওর রঙ কি হবে।’ 
মূসা বলল, ‘আল্লাহ বলেছেন সেটা হবে হলুদ রঙের বাছুর, তার উজ্জ্বল গায়ের রঙ যারাই দেখবে তারাই খুশী হবে।’

তারা বলল, ‘তোমার প্রতিপালককে আমাদের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে বল গরুটা কি ধরণের। আমাদের কাছে গরু তো একইরকম। আর আল্লাহর ইচ্ছেয় নিশ্চয়ই আমরা পথ পাব।’ 
মূসা বলল, ‘এ এমন একটি গরু যাকে জমি চাষে বা ক্ষেতে পানি সেচের কাজে লাগান হয়নি, সম্পূর্ণ নিখুঁত।’ 
তারা বলল, ‘এখন তুমি তথ্য ঠিক এনেছ।’ 
যদিও তারা জবেহ করতে প্রস্তুত ছিল না; তবুও তারা সেটাকে জবেহ করল।’(২:৬৭-৭১) 
তখন আমি বললাম, ‘এর (বাছুরটির) কোন অংশ দিয়ে একে (মৃতলোকটিকে) আঘাত কর।’ 

এভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন আর তোমাদেরকে তার নিদর্শণ দেখিয়ে থাকেন যেন তোমরা বুঝতে পার।’(২:৭২-৭৩) 

সমাপ্ত।
ছবি: Wikipedia.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন